প্রকাশ: ২১ অক্টোবর ২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন
বাংলাদেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের এক অনন্য জনপদ সিলেট—যা শুধু পাহাড়-নদী, চা-বাগান ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের জন্যই বিখ্যাত নয়, বরং ইসলামি আধ্যাত্মিকতার অন্যতম কেন্দ্র হিসেবেও সমাদৃত। এই অঞ্চলকে ‘৩৬০ আউলিয়ার দেশ’ বলা হয়, যা শুধু একটি নাম নয়; বরং এক দীর্ঘ ইতিহাস, ঐতিহ্য ও আত্মিক সাধনার প্রতীক। শত শত বছর আগে এই পুণ্যভূমিতে আগমন ঘটে বহু সুফি-সন্ত, দরবেশ ও আল্লাহভক্ত আউলিয়ার, যাঁরা ইসলামের বাণী ও মানবতার শিক্ষা ছড়িয়ে দেন সমগ্র পূর্ববাংলায়।
সিলেটের ইসলামিক ইতিহাসের সূচনা ঘটে মূলত হযরত শাহজালাল (রহ.)-এর আগমনের মাধ্যমে। তিনি ছিলেন ইয়েমেনের হাদরামাউতের একজন মহাপুরুষ, যিনি তাঁর ৩৬০ জন শিষ্যসহ ১৩০৩ খ্রিস্টাব্দে (বাংলা ৭১০ সাল) সিলেটে আগমন করেন। তৎকালীন সময়ে সিলেট ছিল হিন্দু রাজা গৌর গোবিন্দের শাসিত রাজ্য, যেখানে ইসলাম প্রচারের জন্য পরিবেশ ছিল প্রতিকূল। ঐতিহাসিক দলিল অনুযায়ী, ইসলাম প্রচারের উদ্দেশ্যে এক মুসলমানের সন্তান circumcision বা খৎনা করা হয়েছিল বলে রাজার সৈন্যরা মুসলমানদের ওপর অত্যাচার চালায়। এই প্রেক্ষাপটে শাহজালাল (রহ.) তাঁর মুর্শিদ হযরত শাহজামাল (রহ.)-এর অনুমতি নিয়ে ইয়েমেন থেকে ভারতবর্ষের পথে যাত্রা করেন এবং অবশেষে সিলেটে এসে মুসলমানদের নেতৃত্ব দেন।
শাহজালাল (রহ.) ও তাঁর সহচর আউলিয়ারা শুধু যুদ্ধজয়ী যোদ্ধা ছিলেন না; তাঁরা ছিলেন গভীর আধ্যাত্মিক সাধক ও মানবতার শিক্ষক। তাঁদের মূল লক্ষ্য ছিল মানুষের হৃদয়ে আল্লাহভীতি, ন্যায়পরায়ণতা ও সেবার চেতনা জাগ্রত করা। তাঁরা মানুষের সঙ্গে এমনভাবে মিশে গিয়েছিলেন যে, স্থানীয় জনগণ তাদের শিক্ষা, আচরণ ও দৃষ্টান্ত দেখে ইসলাম গ্রহণে উদ্বুদ্ধ হন।
‘৩৬০ আউলিয়া’ ধারণাটি মূলত সেই সব সুফি ও দরবেশদের প্রতীক, যারা শাহজালাল (রহ.)-এর সঙ্গে সিলেটে এসেছিলেন এবং পরবর্তীকালে উপমহাদেশের বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে পড়ে ইসলামের আলো ছড়ান। কেউ মসজিদ প্রতিষ্ঠা করেন, কেউ দরগাহ স্থাপন করেন, আবার কেউ শিক্ষা ও ধর্মচর্চার মাধ্যমে সমাজে নৈতিকতা ও দয়া প্রতিষ্ঠা করেন। তাঁদের প্রত্যেকের জীবনই ছিল সেবা, ত্যাগ ও ধৈর্যের দৃষ্টান্ত।
সিলেটের আনাচে-কানাচে ছড়িয়ে আছে এই আউলিয়াদের স্মৃতিবিজড়িত দরগাহ, মসজিদ ও খানকা। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হযরত শাহজালাল (রহ.) ও হযরত শাহপরান (রহ.)-এর দরগাহ, যা আজও লক্ষ লক্ষ ভক্ত-অনুরাগীর তীর্থস্থান। শুধু বাংলাদেশ থেকেই নয়, বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে মুসলমানরা এই দরগাহে আসেন দোয়া, মানত ও আধ্যাত্মিক শান্তি লাভের আশায়।
আধ্যাত্মিক দিক থেকে সিলেট আজও বাংলাদেশের অন্যতম কেন্দ্র হিসেবে বিবেচিত হয়। প্রতি বছর এখানে অনুষ্ঠিত হয় ওরস ও মিলাদ মাহফিল, যেখানে ইসলামী চিন্তাবিদ, পীর-মাশায়েখ ও সাধারণ মানুষ একত্র হয়ে আল্লাহর স্মরণে মগ্ন হন। স্থানীয় সংস্কৃতির সঙ্গেও ইসলামি ঐতিহ্যের এক গভীর সংযোগ গড়ে উঠেছে, যা সিলেটের জীবনযাত্রাকে করেছে এক বিশেষভাবে পবিত্র ও শান্তিময়।
‘৩৬০ আউলিয়া’ কেবল একটি সংখ্যা নয়, বরং এটি এক প্রতীক—যা সিলেটের ধর্মীয় ইতিহাসে আধ্যাত্মিক আলোর বিস্তৃতি নির্দেশ করে। তাঁদের ত্যাগ, জ্ঞান ও প্রেমের বার্তা আজও মানুষের অন্তরে প্রেরণা জোগায়। তাঁদের শিক্ষা ছিল একটাই—আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য মানবসেবা ও ন্যায়ের পথে চলা।
সিলেটের প্রতিটি মসজিদ, মাজার ও দরগাহ যেন সাক্ষ্য দেয় শতাব্দীপ্রাচীন ইসলামি ঐতিহ্যের, যা এখনও জীবন্ত। এই পবিত্র ভূমি আজও মানুষকে মনে করিয়ে দেয়—সত্যিকারের ধর্মচর্চা কেবল আচার-অনুষ্ঠানে নয়, বরং হৃদয়ের ভেতরে প্রেম, সহমর্মিতা ও নৈতিকতার বিকাশে নিহিত।
সেই কারণেই, সিলেটকে আজও বলা হয়—‘৩৬০ আউলিয়ার দেশ’, যেখানে ইসলাম শুধু ইতিহাস নয়, বরং জীবনের প্রতিটি শ্বাসে প্রবাহিত এক অনন্ত আধ্যাত্মিক শক্তি।