“গেমস আর গ্যাজেটের ঘেরাটোপে শিশুরা: হারিয়ে যাচ্ছে টিনটিন, চার গুইঁদা আর ফেলুদার প্রজন্ম”

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ২১ অক্টোবর, ২০২৫
  • ৯৩ বার
“গেমস আর গ্যাজেটের ঘেরাটোপে শিশুরা: হারিয়ে যাচ্ছে টিনটিন, চার গুইঁদা আর ফেলুদার প্রজন্ম”

প্রকাশ: ২১ অক্টোবর ২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন

সময় বদলেছে, বদলে গেছে শিশুদের বিনোদন আর বেড়ে ওঠার ধরণও। একসময় বিকেলের সময় মানেই ছিল মাঠে দৌড়ঝাঁপ, টিনটিন কিংবা চার গুইঁন্দার বই হাতে নিয়ে অভিযান কল্পনার জগতে হারিয়ে যাওয়া। ফেলুদা, মাসুদ রানা, কিংবা এনিড ব্লাইটনের চরিত্রগুলো শিশুদের কল্পনাশক্তিকে যেমন উজ্জীবিত করত, তেমনি তাদের চিন্তা, পর্যবেক্ষণ ও সৃজনশীলতাকে শাণিত করত। কিন্তু সেই জায়গা দখল করেছে মোবাইল ফোন, ট্যাব আর অনলাইন গেমের ঝলমলে দুনিয়া। আজকের শিশুরা আর কল্পনায় বিশ্ব ঘুরে বেড়ায় না, বরং ভার্চুয়াল স্ক্রিনের মধ্যে আটকে পড়েছে তাদের মন ও মেধা।

এক সময় টিনটিনের সাহসিকতা বা চার গুইঁন্দার রহস্যভেদী বুদ্ধিমত্তা শিশুমনকে উদ্বুদ্ধ করত। শিশুদের পড়ার টেবিলে বইয়ের গন্ধ থাকত, গল্পের নায়ক হয়ে ওঠার স্বপ্ন থাকত। কিন্তু এখন বেশিরভাগ শিশুই সময় কাটায় মোবাইলের পর্দায়, যেখানে ‘পাবজি’, ‘ফ্রি ফায়ার’ কিংবা ‘রোবলক্স’ নামের গেমগুলো তাদের মানসিক জগত দখল করে নিয়েছে। অল্প বয়সেই তারা রক্তপাত, যুদ্ধ, হিংসা ও প্রতিযোগিতার কৃত্রিম দুনিয়ায় মগ্ন হয়ে পড়ছে।

মনোবিজ্ঞানীরা বলছেন, অতিরিক্ত গেম খেলা বা স্ক্রিনে সময় ব্যয় শিশুদের মস্তিষ্কে একধরনের কৃত্রিম উত্তেজনা সৃষ্টি করে, যা ধীরে ধীরে তাদের মনোযোগের ক্ষমতা কমিয়ে দেয়। বাস্তব জীবনের সঙ্গে সম্পর্ক দুর্বল হয়ে যায়, তারা ধীরে ধীরে আত্মমগ্ন, একাকী ও মানসিকভাবে অস্থির হয়ে ওঠে। এই প্রজন্মের অনেক শিশুই দীর্ঘক্ষণ গেম খেলায় অভ্যস্ত হয়ে ঘুমের সমস্যা, চোখের ক্লান্তি, শারীরিক স্থবিরতা এমনকি আচরণগত পরিবর্তনের শিকার হচ্ছে।

তবে অভিভাবকরাও এ দায় এড়াতে পারেন না। আধুনিক জীবনযাত্রার চাপে অনেকে সন্তানকে ব্যস্ত রাখার সহজ উপায় হিসেবে মোবাইল ফোন তুলে দেন হাতে। কিন্তু সেই সহজ সমাধানই হয়ে উঠছে ভবিষ্যতের বিপর্যয়। শিশুরা এখন বাস্তব জগতের বন্ধুত্ব বা খেলাধুলার জায়গায় ভার্চুয়াল বন্ধুত্বে বিশ্বাস করে, যেখানে নেই প্রকৃত মানবিক সম্পর্কের উষ্ণতা।

শিক্ষাবিদরা মনে করেন, শিশুদের মনোযোগ ফিরিয়ে আনতে হলে পরিবার ও সমাজ উভয়কেই উদ্যোগ নিতে হবে। অভিভাবকদের প্রথম কাজ হবে শিশুদের সঙ্গে সময় কাটানো—তাদের অনুভূতি, আগ্রহ ও মানসিক অবস্থাকে বোঝা। বই পড়ার অভ্যাস ফেরাতে হবে, গল্প বলার পরিবেশ সৃষ্টি করতে হবে। যদি পরিবারে প্রতিদিন কিছু সময় গেম বা মোবাইল থেকে দূরে থেকে একসঙ্গে বই পড়া, গল্প শোনা কিংবা আলোচনা করার নিয়ম তৈরি হয়, তবে শিশুরা আবার ধীরে ধীরে বাস্তব জীবনের প্রতি আগ্রহী হয়ে উঠবে।

এছাড়া শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতেও ডিজিটাল যুগের এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় পাঠ্যবহির্ভূত কার্যক্রম বাড়াতে হবে। কুইজ, নাটক, বিজ্ঞান মেলা বা পাঠচক্রের মতো কার্যক্রম শিশুদের মেধা বিকাশে ভূমিকা রাখে। বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা চাইলে শিশুদের বই পড়া বা সৃজনশীল চিন্তায় উদ্বুদ্ধ করতে নানা প্রতিযোগিতা আয়োজন করতে পারেন।

ধর্মীয় বা নৈতিক শিক্ষার দিকেও গুরুত্ব দিতে হবে। ইসলাম, খ্রিষ্টান, হিন্দু বা অন্য যেকোনো ধর্মই মানুষকে শৃঙ্খলা, সংযম ও দায়িত্বশীলতার শিক্ষা দেয়। যখন শিশুরা এই শিক্ষায় বড় হয়, তারা প্রযুক্তিকে নিয়ন্ত্রণ করতে শেখে, প্রযুক্তি তাদের নিয়ন্ত্রণ করে না।

বিশেষজ্ঞরা আরও বলছেন, মোবাইল ও প্রযুক্তি নিষিদ্ধ করা সমাধান নয়; বরং এর ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ করাই বুদ্ধিমানের কাজ। যেমন—নির্দিষ্ট সময়ের বেশি মোবাইল ব্যবহার না করা, পড়াশোনা বা কাজ শেষের পর নির্দিষ্ট সময় গেম খেলা, অথবা শিক্ষামূলক অ্যাপ ব্যবহারের অভ্যাস গড়ে তোলা।

প্রযুক্তি যেমন আধুনিকতার প্রতীক, তেমনি তার অপব্যবহার ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে অন্ধকারে ঠেলে দিতে পারে। আমাদের সন্তানদের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে আমরা আজ কীভাবে তাদের দিকনির্দেশনা দিই তার ওপর। টিনটিন, চার গুইঁন্দা বা ফেলুদা হয়তো কেবল গল্পের নাম, কিন্তু তাদের মধ্য দিয়ে যে কল্পনা, জ্ঞান আর মানবিক বোধের শিক্ষা পাওয়া যায়, তা-ই একদিন আবার ফিরিয়ে আনতে পারে শিশুমনের সেই সোনালি দিনগুলো।

একজন অভিভাবকের সবচেয়ে বড় দায়িত্ব হলো সন্তানকে প্রযুক্তির ব্যবহার শেখানো, কিন্তু প্রযুক্তির দাস বানানো নয়। সময় এসেছে আমরা আবার বই, গল্প আর বাস্তব জীবনের অভিজ্ঞতায় ফিরি—যেখানে শিশুরা শুধু স্ক্রিনের আলোয় নয়, নিজের চিন্তা ও কল্পনার আলোয় বেড়ে উঠবে।

সেই প্রত্যাশায় বলা যায়, এখনই সময়—আমাদের সন্তানদের ভবিষ্যৎ রক্ষায় অভিভাবক, শিক্ষক ও সমাজ সবাইকে একসাথে ভাবতে হবে, যেন তারা টিনটিনের মতো সাহসী, ফেলুদার মতো বুদ্ধিমান, আর চার গুইঁন্দার মতো অনুসন্ধিৎসু হতে পারে, গেমের পর্দায় বন্দি নয়।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত

Theme Dwonload From ThemesBazar.Com