প্রান্তিক চিকিৎসা ঘাটতি বাড়াচ্ছে শিশুদের মৃত্যু

একটি বাংলাদেশ ডেস্ক
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ১২ নভেম্বর, ২০২৫
  • ৩৬ বার
প্রান্তিক চিকিৎসা ঘাটতি বাড়াচ্ছে শিশুদের মৃত্যু

প্রকাশ: ১২ নভেম্বর ২০২৫। একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

দেশের গ্রামাঞ্চল থেকে শুরু করে শহরের বুকে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে নিউমোনিয়ার প্রভাব। শিশুদের মধ্যে এই মারাত্মক রোগে আক্রান্ত হওয়ার সংখ্যা বাড়ছে প্রতি বছর, তবে প্রান্তিক বা স্থানীয় পর্যায়ের চিকিৎসা ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা সমস্যার মাত্রা আরও বাড়াচ্ছে। শহরকেন্দ্রিক স্বাস্থ্যসেবা থাকায় আক্রান্ত শিশুরা প্রাথমিক পর্যায়ে সঠিক চিকিৎসা না পেয়ে ঢাকার মতো বড় শহরের হাসপাতালে আশ্রয় নিচ্ছে। কিন্তু পথিমধ্যে অথবা হাসপাতালে পৌঁছানোর পরও অনেক শিশুর জীবন রক্ষা সম্ভব হচ্ছে না।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এবং দেশের বিভিন্ন স্বাস্থ্য গবেষণা কেন্দ্রের তথ্য বলছে, দেশে প্রতি বছর লাখের বেশি শিশু নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়। শিশুদের ৫২ শতাংশ প্রাথমিকভাবে চিকিৎসার বাইরে থেকে যাচ্ছে, এবং ৫০ শতাংশ স্বাস্থ্যকেন্দ্রে অক্সিজেন কনসেনট্রেটরের অভাব রয়েছে। এক-তৃতীয়াংশ স্বাস্থ্যকেন্দ্রে অন্যান্য অক্সিজেনের উৎসও অনুপস্থিত। ফলে সঠিক সময়ে চিকিৎসা না পাওয়া শিশুদের মধ্যে প্রায় ৪৫ শতাংশের মৃত্যু ঘটে।

এই প্রেক্ষাপটে বুধবার বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও পালিত হলো ‘বিশ্ব নিউমোনিয়া দিবস’। এবারের প্রতিপাদ্য ছিল ‘সুস্থ সূচনা, আশার ভবিষ্যৎ’। এই দিবসের উদ্দেশ্য হলো জনগণকে সচেতন করা এবং শিশুদের জন্য প্রয়োজনীয় প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরা।

নুসরাত নামের দুই মাসের একটি শিশু তার পরিবারের সঙ্গে ভোলা সদর হাসপাতালে ভর্তি হন। হঠাৎ তীব্র জ্বর শুরু হলে পরীক্ষা-নিরীক্ষায় শিশুটির নিউমোনিয়া শনাক্ত হয়। কিন্তু স্থানীয় হাসপাতালে পর্যাপ্ত চিকিৎসা ও অক্সিজেনের অভাবে অবস্থা আরও খারাপ হয়। এরপর তাঁকে ঢাকার বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটে নেওয়া হয়। যদিও সেখানে চিকিৎসা দেওয়া হয়, তার অবস্থার অবনতি অব্যাহত থাকে এবং পরবর্তীতে বেসরকারি একটি হাসপাতালে নেওয়া হলেও জীবন রক্ষা সম্ভব হয়নি।

বাংলাদেশ হেলথ ফ্যাসিলিটির জরিপে দেখা গেছে, দেশের স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোতে শিশুদের জন্য যথাযথ অক্সিজেন সুবিধা না থাকা, প্রয়োজনীয় ভ্যাকসিনের সীমিত কাভারেজ এবং প্রাথমিক পর্যায়ের চিকিৎসা কেন্দ্রগুলোর অপর্যাপ্ত অবকাঠামো শিশুদের মৃত্যুর প্রধান কারণ। এছাড়াও অ্যান্টিবায়োটিক প্রয়োগে ভুল এবং ভাইরাল নিউমোনিয়ায় অযথা অ্যান্টিবায়োটিক দেওয়া সমস্যাকে আরও জটিল করে তুলছে।

রাজধানীর বাংলাদেশ শিশু হাসপাতালের পেডিয়াট্রিকস পালমনোলজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. কামরুজ্জামান (কামরুল) বলেন, “হাসপাতালে আসা শিশুদের বেশিরভাগই শহরের বাইরে থেকে আসা। তারা খারাপ অবস্থায় পৌঁছায়, ফলে সুস্থ হয়ে ফেরা কঠিন হয়ে যায়। প্রান্তিক পর্যায়ে আমাদের সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো শিশুদের হাইপক্সেমিয়া বা অক্সিজেনের ঘাটতি সঠিক সময়ে শনাক্ত ও প্রতিরোধের ব্যবস্থা না থাকা। শিশুদের অবস্থা সংকটাপন্ন হলে জেলা সদর হাসপাতাল থেকে ঢাকার বড় হাসপাতালে পাঠাতে হয়। তবে পরিবহন ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা এবং পথের দূরত্বে শিশুদের অবস্থা আরও খারাপ হয়।”

ডা. কামরুল আরও বলেন, “নিউমোনিয়ার ভ্যাকসিন চালু হওয়ার পর প্রথমে আক্রান্তের সংখ্যা কমেছিল। কিন্তু ভ্যাকসিন কাভারেজ কমে যাওয়ায় এবং বুস্টার ডোজ না দেয়ায় শিশুদের মধ্যে পুনরায় সংক্রমণ দেখা দিয়েছে। ফলে নিউমোনিয়ার সংক্রমণ আজও সাধারণ এবং মারাত্মক।”

আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র (আইসিডিডিআর,বি) জানিয়েছে, দেশে প্রতি হাজার জীবিত শিশুর মধ্যে প্রায় ৭.৪ জন নিউমোনিয়ায় প্রাণ হারাচ্ছে। মারাত্মক নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত শিশুদের প্রায় ৪২ শতাংশের রক্তে অক্সিজেনের ঘাটতি থাকে। জেলা-উপজেলা পর্যায়ে ৯৫ শতাংশ হাসপাতালে শিশুর নিউমোনিয়া চিকিৎসার সক্ষমতা নেই। ফলে ৫ বছরের কম বয়সি শিশুদের মধ্যে ৪২ শতাংশকে নিকটস্থ স্বাস্থ্যকেন্দ্রে আনা হয় এবং ৩৪ শতাংশকে অ্যান্টিবায়োটিক দিয়ে চিকিৎসা করা হয়।

আইসিডিডিআর,বি’র মাতৃ ও শিশু স্বাস্থ্য বিভাগের সহযোগী বিজ্ঞানী আহমেদ এহসানুর রহমান বলেন, “মধ্যম ও প্রান্তিক স্তরের স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোর অবকাঠামো উন্নত হলেও নিউমোনিয়ার সঙ্গে হাসপাতালে ভর্তি শিশুদের প্রায় ৪২ শতাংশ অক্সিজেন সংকটে ভোগে। এটি প্রাথমিক চিকিৎসার ঘাটতি এবং অক্সিজেনের অভাবের কারণে ঘটে।”

বাংলাদেশ পেডিয়াট্রিকস পালমনোলজি ফোরামের সভাপতি অধ্যাপক ডা. মো. আতিয়ার রহমান বলেন, “শিশুদের মধ্যে নিউমোনিয়ার মৃত্যুর বড় কারণ হলো অ্যান্টিবায়োটিকের অপব্যবহার। ভাইরাল নিউমোনিয়া হলেও অযথা অ্যান্টিবায়োটিক প্রয়োগ হচ্ছে, যার কারণে যথাসময়ে সঠিক চিকিৎসা দেওয়া হলেও ফলাফল ভালো আসে না।”

শিশু হাসপাতালের পরিচালক অধ্যাপক ডা. মাহবুবুল আলম বলেন, “নিউমোনিয়ায় এত মৃত্যু হওয়ার মূল কারণ হলো দেরিতে হাসপাতাল পৌঁছানো এবং দেরিতে চিকিৎসকের পরামর্শ গ্রহণ করা। অনেক অভিভাবক বুঝতে পারছেন না যে শিশু নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত। ঠান্ডা ও কাশির জন্য হাসপাতালে আনা শিশুদের মধ্যে ৩০ শতাংশই নিউমোনিয়ার কারণে গুরুতর অবস্থায় পৌঁছাচ্ছে।”

বিশেষজ্ঞদের মতে, স্থানীয় পর্যায়ে স্বাস্থ্যকেন্দ্র ও পল্লী চিকিৎসা ব্যবস্থার শক্তিশালীকরণ না হলে শিশুদের মৃত্যু রোধ করা সম্ভব হবে না। প্রাথমিক পর্যায়ের সঠিক চিকিৎসা, যথাযথ ভ্যাকসিনেশন, অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারের সঠিক গাইডলাইন এবং অক্সিজেন সরবরাহ নিশ্চিত করা না হলে শিশুর জীবন রক্ষার সম্ভাবনা ক্রমেই কমে যাবে।

বিশ্ব নিউমোনিয়া দিবস উপলক্ষে স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা সবাইকে সচেতন করার পাশাপাশি সরকারি ও বেসরকারি খাতে প্রান্তিক স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোর উন্নয়নের জন্য বিশেষ উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানাচ্ছেন। কারণ শিশুদের জীবন রক্ষা শুধুমাত্র শহরের বড় হাসপাতালে চিকিৎসা দিয়ে সম্ভব নয়, বরং গ্রাম-গঞ্জের প্রাথমিক চিকিৎসাকেন্দ্র ও স্বাস্থ্যকর্মীদের সক্ষমতা বৃদ্ধি করাই দীর্ঘমেয়াদে সবচেয়ে কার্যকর সমাধান।

নিউমোনিয়া এখন শুধু একটি রোগ নয়, এটি দেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার দুর্বলতার একটি আঙুলের চিহ্ন। শিশুরা প্রতিদিন ঝুঁকিতে রয়েছে, এবং স্থানীয় পর্যায়ের চিকিৎসা ব্যবস্থার ঘাটতি থাকায় প্রতিটি মৃত্যু অনভিপ্রেত ক্ষতির হিসাব হয়ে দাঁড়াচ্ছে। এই সংকট মোকাবিলায় সরকারের সঙ্গে স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ, স্থানীয় প্রশাসন এবং কমিউনিটি সচেতনতা একত্রে কাজ করার বিকল্প নেই।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত