প্রকাশ: ১২ নভেম্বর ২০২৫ বুধবার । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
কোষ্ঠকাঠিন্য আজকের ব্যস্ত জীবনযাপনের এক সাধারণ সমস্যা। দীর্ঘ সময় ধরে বসে থাকা, কম পানি পান, সঠিক খাদ্যাভ্যাস না থাকা এবং মানসিক চাপ—সব মিলিয়ে এটি নানাভাবে শরীরকে প্রভাবিত করতে পারে। কোষ্ঠকাঠিন্যের সমস্যা শুধু অস্বস্তিকর নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদে হজমের সমস্যার সঙ্গে জড়িত অন্যান্য জটিলতাকেও বাড়িয়ে দিতে পারে। তবে ওষুধের বিকল্প হিসেবে কিছু প্রাকৃতিক পানীয় আমাদের সাহায্য করতে পারে এই সমস্যার সমাধানে।
প্রথমেই আসে অ্যালোভেরা জুস। অ্যালোভেরা পাতার ভেতরের পাল্প থেকে তৈরি এই জুসে থাকে প্রাকৃতিক ল্যাক্সেটিভ উপাদান, যা মলকে নরম করে সহজে বের হতে সাহায্য করে। এছাড়া এতে রয়েছে পলিস্যাকারাইড, অ্যামিনো অ্যাসিড, ভিটামিন এবং গুরুত্বপূর্ণ এনজাইম, যা হজম প্রক্রিয়াকে সহজ করে। ২০২৪ সালে প্রকাশিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, দীর্ঘমেয়াদী কোষ্ঠকাঠিন্য নিয়ন্ত্রণে অ্যালোভেরা জুসের প্রভাব বেশ কার্যকর। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাজারে বিক্রি হওয়া প্রস্তুত জুসের তুলনায় বাড়িতে তৈরি জুস বেশি কার্যকর এবং শরীরের জন্য উপকারী।
এরপর আছে গুড়ের পানি। শুধু পানি পান করলেই হজমের জন্য সহায়ক হতে পারে, কিন্তু সামান্য গুড় মিশালে তার কার্যকারিতা আরও বেড়ে যায়। গুড় একটি প্রাকৃতিক মিষ্টি, যা শরীর থেকে বিষাক্ত পদার্থ বের করতে সাহায্য করে এবং মলত্যাগকে সহজ করে। ২০২৩ সালের এক প্রতিবেদন অনুসারে, গুড় অন্ত্রের গতিশীলতা বাড়িয়ে কোষ্ঠকাঠিন্য প্রতিরোধে কার্যকর। সকালে বা রাতে এক গ্লাস গরম গুড়ের পানি কোষ্ঠকাঠিন্যের জন্য বিশেষ উপকারী।
কফি, বিশেষ করে নাস্তার পর খাওয়া কফি, অনেক সময় হজমকে ত্বরান্বিত করে। কফি গ্যাস্ট্রোকোলিক রিফ্লেক্সকে সক্রিয় করে, যা মলকে কোলনের মধ্যে থেকে দ্রুত বের হতে সাহায্য করে। ২০২৪ সালের একটি গবেষণায় দেখা গেছে, নিয়মিত কফি পান করলে কোষ্ঠকাঠিন্য নিয়ন্ত্রণে থাকে। তবে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলছেন, অতিরিক্ত কফি বা কালো কফি হজমের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে। তাই নিয়মিত, সীমিত পরিমাণেই কফি পান করার পরামর্শ দেওয়া হয়।
ইসবগুলের ভুষি দিয়ে তৈরি পানিও কোষ্ঠকাঠিন্যের জন্য খুব কার্যকর। ভারতীয় প্ল্যান্টাগো ওভাটা গাছ থেকে প্রাপ্ত এই ফাইবার অন্ত্রে পানি ধরে রাখে এবং মলকে নরম করে সহজে বের হতে সাহায্য করে। ২০২০ সালে প্রকাশিত এক গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে, ইসবগুলের ভুষি নিয়মিত খেলে অন্ত্রের হজমে সহায়ক ব্যাকটেরিয়ার বৃদ্ধি ঘটে। এতে কোষ্ঠকাঠিন্যের সমস্যা প্রাকৃতিকভাবে কমে এবং পেট সুস্থ থাকে।
ফলমূলের জুসও কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে প্রুন বা শুকনো বরই জুস। এতে থাকে পেকটিন নামের আঁশ, যা মলকে নরম করে এবং সহজে বের হতে সাহায্য করে। এছাড়া জুসে থাকা ‘সর্বিটল’ প্রাকৃতিক চিনি কোলনে পানি টেনে আনে, ফলে মলত্যাগ স্বাভাবিক হয়। ২০২২ সালে আমেরিকান জার্নাল অফ গ্যাস্ট্রোএন্টারোলজি-এ প্রকাশিত গবেষণায় দেখা গেছে, নিয়মিত প্রুন জুস পান করলে শক্ত ও দলাদলি মল নরম হয় এবং কোষ্ঠকাঠিন্য নিয়ন্ত্রণে থাকে।
এই পানীয়গুলো নিয়মিতভাবে খাদ্যাভ্যাসে অন্তর্ভুক্ত করলে শুধু কোষ্ঠকাঠিন্যই কমে না, পেট ফাঁপা, গ্যাস এবং অ্যাসিডিটির মতো অন্যান্য সমস্যা থেকেও মুক্তি মেলে। এছাড়াও, প্রাকৃতিক উপায়ে কোষ্ঠকাঠিন্য কমানো মানে দীর্ঘমেয়াদে ওষুধের ওপর নির্ভরতা কমানো, যা শরীরের জন্য আরও স্বাস্থ্যকর। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রতিদিন পর্যাপ্ত পানি পান, ফলমূল ও ফাইবারসমৃদ্ধ খাদ্য গ্রহণ এবং প্রয়োজনীয় শারীরিক ব্যায়াম করলে কোষ্ঠকাঠিন্য প্রাকৃতিকভাবেই নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব।
অতএব, যদি আপনি ওষুধের পরিবর্তে প্রাকৃতিক উপায়ে কোষ্ঠকাঠিন্য কমাতে চান, তবে এই পাঁচটি পানীয়—অ্যালোভেরা জুস, গুড়ের পানি, কফি, ইসবগুলের ভুষি মিশানো পানি এবং প্রুন জুস—আপনার খাদ্য তালিকায় রাখার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। এগুলো নিয়মিত পান করলে কোষ্ঠকাঠিন্যের সমস্যা দ্রুত কমে এবং হজম প্রক্রিয়ার স্বাভাবিকতা বজায় থাকে।
কোথাও অতিরিক্ত ওষুধ বা হজমজনিত কেমিক্যাল ছাড়াই, প্রাকৃতিক উপায়েই সুস্থতার দিকে এগিয়ে যাওয়া সম্ভব। তাই প্রতিদিনের খাদ্যাভ্যাসে এই পানীয়গুলো অন্তর্ভুক্ত করা এবং পর্যাপ্ত পানি পান করা একদিকে যেমন কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করবে, অন্যদিকে সার্বিকভাবে স্বাস্থ্য রক্ষায়ও সহায়ক হবে।