চট্টগ্রামে জুলাই যোদ্ধাদের দাবি: হাসিনার সর্বোচ্চ শাস্তি ফাঁসি চান

একটি বাংলাদেশ ডেস্ক
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ১৭ নভেম্বর, ২০২৫
  • ১১৮ বার
চট্টগ্রামে জুলাই যোদ্ধাদের দাবি: হাসিনার সর্বোচ্চ শাস্তি ফাঁসি চান

প্রকাশ: ১৭ নভেম্বর ২০২৫। একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

বন্দরনগরী চট্টগ্রামে সোমবার সকাল থেকে জাতীয় ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তের প্রত্যাশায় উচ্ছ্বাস দেখা গেছে। জুলাই গণঅভ্যুত্থানে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে ভারতে পলাতক ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের রায় ঘোষণা হতে যাচ্ছে। এই রায়কে কেন্দ্র করে চট্টগ্রামের বিভিন্ন মোড়ে মোড়ে জড়ো হয়েছেন শহীদ পরিবার, জুলাই যোদ্ধা এবং সাধারণ নাগরিকরা। তারা সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ডের দাবি জানিয়েছেন। তাদের বক্তব্যে প্রতিটি শব্দে রয়েছে ব্যথা, ক্ষোভ এবং দীর্ঘদিনের অধৈর্যের প্রকাশ।

চট্টগ্রামের কোটবাজার, ষোলশহর, বহদ্দারহাট, নিউ মার্কেট, কাজির দেউরি মোড় ও টাইগারপাস এলাকায় সকাল থেকেই জনস্রোত লক্ষ্য করা গেছে। এই ভিড়ে ছিলেন নানা বয়সের মানুষ—কেউ নিজে শাহাদতবরণ করা পরিবার সদস্যদের স্মরণে, কেউ জুলাই আন্দোলনে আহত বা ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে জীবনের দগদগে চিহ্ন বহন করছেন। স্থানীয় পুলিশ ও র‌্যাবের নজরদারি মোড়ে মোড়ে দেখা গেছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী যানবাহন তল্লাশি করছেন, কেউ সন্দেহজনক আচরণ করলে সতর্কভাবে যাচাই করছেন।

জুলাই শহীদ মাহবুবুর রহমানের ভাই মনজুরুর হাসান সংবাদকর্মীদের বলেন, “আজ আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে খুনী হাসিনার রায় ঘোষণা হচ্ছে। আমরা জানি না ট্রাইব্যুনাল ঠিক কী সিদ্ধান্ত নেবে, তবে আমরা বিশ্বাস করি তার ফাঁসির রায় আসবে। এটাই তার প্রতি ইনসাফ। আমাদের পরিবারের জন্য দীর্ঘদিনের অপেক্ষার পর এটি একটি আশা জাগানো মুহূর্ত। আমার ভাই মাহবুবুর রহমান ২০২৪ সালের জুলাই বিপ্লবে ফেনীর মহিপালে নিজাম হাজারীর ক্যাডার বাহিনীর গুলিতে শহীদ হন। তার আত্মা হয়তো আজ একটু হলেও শান্তি পাবে, মা হয়তো কিছুটা স্বস্তি অনুভব করবেন।”

চট্টগ্রাম মহানগরের জুলাই যোদ্ধা সংগঠন আপন বাংলাদেশ-এর সদস্য সচিব মশিউর রহমান মাহি বলেন, “আজ আমরা ২৪-এর গণহত্যার মূল আসামি হাসিনার বহুল কাঙ্খিত রায় প্রত্যাশা করছি। আমরা চাই, তিনি মৃত্যুদণ্ড পান এবং দেশের ফিরিয়ে এনে ফাঁসিতে ঝুলানো হয়। এই রায় শুধু আমাদের পরিবারের জন্য নয়, এটি পুরো জাতির জন্য একটি ইতিহাসের অংশ হয়ে থাকবে। আমরা চাই, রায়ের মাধ্যমে সকল ক্ষতিগ্রস্ত পরিবার কিছুটা শান্তি ও ন্যায়ের স্বাদ পায়।”

জুলাই আন্দোলনের আরেক যোদ্ধা আজহারুল ইসলাম বলেন, “আমরা চাই হাসিনার সর্বোচ্চ সাজা, অর্থাৎ মৃত্যুদণ্ড। তার অপরাধে আজ হাজারো মায়ের বুক খালি, শত শত ভাই পঙ্গু হয়েছেন। এই ক্ষত এখনও তাজা, আঘাতের চিহ্ন মানুষের মনে দগদগে আছে। আমরা চাই প্রতিটি অপরাধের প্রতিফলন পাওয়া যায়।”

জুলাই আন্দোলনের শহীদ পরিবার ও যোদ্ধাদের চোখে চোখ রেখে কথা বললে বোঝা যায়, তাদের প্রত্যেকের হৃদয়ে এক দীর্ঘ দিনের ব্যথা জড়িয়ে আছে। তারা স্মরণ করছেন ২০২৪ সালের জুলাই বিপ্লবের দিনগুলো, যখন দেশ জুড়ে ছাত্র-জনতা, সাধারণ মানুষ এবং প্রতিবাদী নাগরিকরা নিরীহভাবে হামলার শিকার হন। তাঁদের পক্ষে বলতে গেলে, এই দীর্ঘদিনের প্রতীক্ষা এখন রূপ নিতে যাচ্ছে রায় হিসেবে।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীও সতর্ক রয়েছে। চট্টগ্রাম নগরের প্রধান মোড়ে মোড়ে চেকপোস্ট বসানো হয়েছে। র‌্যাব ও পুলিশ মোতায়েন রয়েছে যাতে কোনো ধরনের বিশৃঙ্খলা, নাশকতা বা সহিংসতা সংঘটিত না হয়। বিশেষ নজর রাখা হচ্ছে এমন সব এলাকায় যেখানে ভিড়ের ঘনত্ব বেশি। যদিও সকালের দিকে এলাকায় শান্তি বিরাজ করছে, তবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী দিনের শুরু থেকেই প্রস্তুত রয়েছে। তাদের মতে, রায়ের পর পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য পূর্বপ্রস্তুতি অপরিহার্য।

চট্টগ্রামের ভিড়ে অনেকে বলেন, শুধু জুলাই গণঅভ্যুত্থান নয়, হাসিনা গত ১৭ বছর ধরে অসংখ্য মানবতাবিরোধী অপরাধের সঙ্গে যুক্ত। তাদের বক্তব্য অনুযায়ী, এই দীর্ঘ সময়ের অপরাধের প্রতিফলনও এই রায়ে দেখতে হবে। রাসেল আহমেদ নামে এক শিক্ষার্থী বলেন, “তার ১০ বার ফাঁসি হলেও কম হবে। তিনি যে ধরনের অপরাধ করেছেন, তার জন্য সর্বোচ্চ শাস্তি ছাড়া আর কোনো বিকল্প নেই।”

জুলাই শহীদদের পরিবারও রায়ের প্রতিক্ষায় আবেগপ্রবণ। তারা মনে করেন, এই রায় তাদের দীর্ঘদিনের ক্ষোভ ও দুঃখকে কিছুটা হলেও শিথিল করবে। চট্টগ্রামের এক মা বলেন, “আমার ছেলে শহীদ হয়েছে, আর আজ আমি আশা করি তার আত্মা শান্তি পাবে। বিচার না হলে আমাদের ক্ষত কখনো ভরে উঠবে না। আমরা চাই দোষীদের সর্বোচ্চ শাস্তি হোক।”

আইনশৃঙ্খলা বাহিনী জানিয়েছে, রায়ের দিন নানা ধরনের নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। মোড়ে মোড়ে চেকপোস্ট, সন্দেহজনক যানবাহন তল্লাশি, সাদা পোশাকে গোয়েন্দা নজরদারি—সবই আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখার জন্য। কিছু দিনের আগেই কিছু নাশকতার চেষ্টা ধরা পড়েছিল, তবে রায়ের দিন সেগুলো প্রতিরোধ করা হয়েছে।

চট্টগ্রামে উপস্থিত অনেকেই মনে করাচ্ছেন যে, এই রায় শুধু একটি বিচারপ্রক্রিয়ার অংশ নয়। এটি দীর্ঘদিনের ইতিহাসের সঙ্গে জড়িত। তাদের চোখে চোখ রাখলে বোঝা যায়, রায়ের অর্থ শুধুই আইনি নয়; এটি ন্যায়ের, ক্ষত সারানোর এবং ভবিষ্যতের সতর্কতার প্রতীক। যোদ্ধারা বলছেন, এই রায় দেশে শান্তি প্রতিষ্ঠা এবং মানবতাবিরোধী অপরাধের পুনরাবৃত্তি রোধ করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

অন্যদিকে সাধারণ জনতা, বিশেষ করে সেই সব মানুষ যারা এই আন্দোলন ও গণহত্যার শিকার হয়েছেন, তারা বিশ্বাস করছেন, রায়ের মাধ্যমে তাদের ক্ষত কিছুটা হলেও সান্ত্বনা পাবে। শহীদ পরিবাররা মনে করছেন, রায় যদি কাঙ্ক্ষিত হয় তবে এটি ইতিহাসে ন্যায়ের এক প্রতীক হিসেবে চিহ্নিত হবে।

চট্টগ্রামের মোড়ে মোড়ে ছড়িয়ে থাকা গ্রুপগুলো দাবি জানাচ্ছে, শুধু রায় ঘোষণা নয়, প্রধানমন্ত্রী হাসিনাকে দেশে ফিরিয়ে এনে কার্যকরভাবে সাজা নিশ্চিত করা হোক। তারা মনে করছেন, শুধুমাত্র রায়ের ঘোষণাই যথেষ্ট নয়, তা বাস্তবায়নও প্রয়োজন। আর তা ছাড়া, দেশের মানুষ ও শহীদ পরিবারদের মনে ন্যায়ের পূর্ণ প্রতিফলন আসবে না।

প্রত্যেকটি ভিড়, প্রত্যেকটি চোখে চোখে দেখা, প্রত্যেকটি বক্তব্যে আজকের দিনটি এক গভীর ইতিহাসের অধ্যায় হিসেবে স্থান পেয়েছে। রায়ের দিনটি শুধু আইনগত বিচার নয়, দেশের হাজারো পরিবারের দীর্ঘদিনের আশা ও অধৈর্যের প্রকাশ। মানুষ চাচ্ছে, মানবতাবিরোধী অপরাধের সঙ্গে যুক্তদের যথাযথ শাস্তি দেওয়া হোক।

চট্টগ্রাম নগরের মোড়ে মোড়ে যখন জনতা জড়ো হয়েছে, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী নজরদারি চালাচ্ছে, সেখানে স্পষ্ট যে, ইতিহাসের এই মুহূর্তের গুরুত্ব কেবল আদালতের রায়ে সীমাবদ্ধ নয়। এটি দেশের সামাজিক, রাজনৈতিক এবং নৈতিক ইতিহাসের সঙ্গে জড়িত। মানুষের চোখে প্রতিটি মুহূর্তে সতর্কতা, প্রত্যাশা এবং ক্ষোভের সংমিশ্রণ দেখা যাচ্ছে।

এভাবে, রায়ের আগে চট্টগ্রামের জুলাই যোদ্ধা ও শহীদ পরিবারের সংযুক্ত কণ্ঠে উঠেছে তাদের দাবি—শেখ হাসিনার সর্বোচ্চ শাস্তি, মৃত্যুদণ্ড এবং দেশের ফিরিয়ে এনে কার্যকর শাস্তি নিশ্চিত করা। তাদের এই দাবিতে মানবিক যন্ত্রণা, ক্ষোভ ও ন্যায়ের আকাঙ্ক্ষা স্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত

Theme Dwonload From ThemesBazar.Com