প্রকাশ: ১৯ নভেম্বর ২০২৫। একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
সৌদি আরবের উত্তর-পশ্চিমে অবস্থিত আল-উলার নিকটবর্তী হেগরা বা আল-হিজর অঞ্চল প্রাচীন সভ্যতা সামুদের আবাসস্থল হিসেবে পরিচিত। ইতিহাস ও ধর্মীয় সূত্র মতে, এটি নবী সালেহ (আ.)-এর জাতি সামুদের কেন্দ্রবিন্দু ছিল, যারা প্রাচীনকালীন এক শক্তিশালী ও বীরত্বপূর্ণ সম্প্রদায় হিসেবে পরিচিত ছিল। তাদের স্থাপত্য ও পাথর খোদাই করা বসতি আজও গবেষক এবং পর্যটকদের কাছে বিস্ময় ও রহস্যের কেন্দ্রবিন্দু। ইউনেস্কোর বিশ্ব ঐতিহ্য হিসেবে স্বীকৃত এই স্থানটি সৌন্দর্য, ইতিহাস এবং ধর্মীয় শিক্ষার মিলনস্থল।
পুরাতত্ত্ববিদরা বলেন, পাহাড় খোদাই করে ঘরবাড়ি নির্মাণের প্রক্রিয়া সাধারণ মানুষের পক্ষে সম্ভব ছিল না। এই নান্দনিক ও স্থায়ী স্থাপত্যশৈলী থেকে বোঝা যায়, সামুদ জাতির সদস্যরা প্রযুক্তিগত ও শারীরিকভাবে অত্যন্ত দক্ষ ছিলেন। কোরআন ও হাদিসে বর্ণিত গল্প অনুযায়ী, সামুদরা একসময়ে অত্যন্ত সমৃদ্ধশালী এবং উর্বর জমিতে বসবাস করতেন। তাদের ফসলি জমি এবং প্রাকৃতিক সম্পদ অনেক ছিল, কিন্তু সেই প্রাচুর্য তাদের মধ্যে অহংকার, নির্মমতা এবং শিরক সৃষ্টি করেছিল।
কুরআনের বর্ণনায় দেখা যায়, আল্লাহ তাদেরকে হেদায়েতের জন্য নবী সালেহ (আ.) প্রেরণ করেন। তিনি তাদের মূর্তিপূজা পরিত্যাগ করে এক আল্লাহর ইবাদতের দিকে আহ্বান জানাতেন। নবী সালেহ (আ.) সামুদের সামনে উটনীর দৃষ্টান্ত উপস্থাপন করেন, যা আল্লাহর কুদরতে পাহাড়ের ভেতর থেকে বের হয়েছিল। তিনি সম্প্রদায়কে সতর্ক করেছিলেন যে, এই উটনীর প্রতি শ্রদ্ধাশীল হওয়া এবং কোনো ক্ষতি না করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিছু লোক ঈমান আনলেও বেশিরভাগই অবিশ্বাসী রইল। শেষ পর্যন্ত নিরপরাধ উটনীকে হত্যা করার পর আল্লাহ তাদের ওপর কঠিন শাস্তি প্রেরণ করেন।
ধ্বংসপ্রাপ্ত সামুদ জাতি ভূমিকম্পের মাধ্যমে সম্পূর্ণভাবে নিশ্চিহ্ন হয়। কোরআনের ভাষায় বলা হয়েছে, তাদের ঘরবাড়ি উপুড় হয়ে পড়ে এবং কেউ বেঁচে থাকেনি। হাদিসে উল্লেখ আছে, নবীজি সরাসরি এই অঞ্চলে যাওয়া থেকে নিষেধ করেছিলেন, যাতে মানুষের অন্তরে আল্লাহর নাফরমানির ভীতি সৃষ্টি হয় এবং তারা শাস্তির গুরুত্ব উপলব্ধি করে। ইসলামী শিক্ষায় এই স্থানকে সতর্কবার্তা হিসেবে তুলে ধরা হয়।
সৌদি আরবের সাম্প্রতিক উদ্যোগে আল-উলার নিকটবর্তী এই প্রাচীন স্থানকে বৈশ্বিক পর্যটন গন্তব্যে রূপান্তর করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। রাজ্যের উদ্দেশ্য হলো বিশ্ববাসীর কাছে নিজেদের উন্মুক্ত করা এবং তেলের বাইরে অর্থনৈতিক সম্ভাবনা বৈচিত্র্যময় করা। ফলে হেগরা বা আল-হিজর একটি জীবন্ত যাদুঘরে পরিণত হচ্ছে। দেশটি এই ধ্বংসপ্রাপ্ত স্থাপত্য ও নান্দনিক সৌন্দর্যকে সংরক্ষণ এবং প্রদর্শনের মাধ্যমে পর্যটকদের আকৃষ্ট করছে।
এই অঞ্চলের প্রতিটি পাথরে খোদাই করা নিদর্শন সামুদদের প্রাচীন শক্তি, বীরত্ব ও দক্ষতার সাক্ষ্য বহন করছে। গবেষকরা মনে করেন, এই নিদর্শনগুলো কেবল প্রাচীন ইতিহাস নয়, বরং ধর্মীয় শিক্ষারও গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এটি মানবসভ্যতার শিক্ষা দেয় যে অহংকার ও অন্যায় কখনো দীর্ঘস্থায়ী নয়।
ধর্মীয় ইতিহাসের পাশাপাশি সামুদের গল্প মানবিক শিক্ষারও অংশ। নবী সালেহ (আ.)-এর হেদায়েত, তাদের অবিশ্বাস এবং আল্লাহর শাস্তি মানুষের নৈতিক দায়িত্ব ও ধার্মিকতার গুরুত্ব তুলে ধরে। এই শিক্ষাগুলি আজও মানসিক, সামাজিক এবং নৈতিক নির্দেশনার জন্য প্রাসঙ্গিক।
সৌদি আরবের পরিকল্পনা অনুযায়ী, হেগরা পর্যটকদের জন্য তথ্যকেন্দ্র, গাইডেড ট্যুর এবং সাংস্কৃতিক প্রদর্শনীতে পরিণত হবে। এতে শুধু পর্যটন নয়, প্রাচীন স্থাপত্য ও ইসলামী ঐতিহ্য সংরক্ষণের পাশাপাশি শিক্ষামূলক কার্যক্রমও পরিচালিত হবে। এই উদ্যোগ বিশ্বকে দেখাবে, প্রাচীন সভ্যতার ইতিহাস ও ধর্মীয় শিক্ষা আজকের সমাজের জন্য কতটা গুরুত্বপূর্ণ।
হেগরার এই উদ্যোগ ভবিষ্যতে বৈশ্বিক পর্যটকদের জন্য শিক্ষণীয় ও অনুপ্রেরণাদায়ক অভিজ্ঞতা হয়ে উঠবে। স্থানটি প্রাচীন ইতিহাস, ধর্ম, নৈতিকতা এবং মানুষের শিক্ষার মিলনস্থল হিসেবে পরিচিত হয়ে বিশ্বমঞ্চে সমাদৃত হবে। আল-হিজর বা মাদায়েন সালেহ অঞ্চলের প্রতি সৌদি আরবের এই দৃষ্টিভঙ্গি প্রমাণ করে, কেবল অর্থনৈতিক উন্নয়ন নয়, ইতিহাস ও ধর্মীয় শিক্ষার সংরক্ষণও আজকের সময়ের অতি গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য।
এভাবে, নবীজি যাত্রা নিষিদ্ধ রাখার কারণ, সামুদের ধ্বংস এবং স্থানটির প্রাচীন গুরুত্ব বিশ্ববাসীর সামনে পুনরায় উন্মুক্ত হচ্ছে। এটি মানবসভ্যতার ইতিহাস ও ধর্মীয় শিক্ষার মিলনস্থল হিসেবে আজও বিশ্বের দৃষ্টিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান।