প্রকাশ: ২০ নভেম্বর ২০২৫। একটি বাংলাদেশ ডেস্ক। একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
মানবজীবনের প্রতিটি সম্পর্কেই তিনি ছিলেন আলোকশিখা, আর আচরণে ছিলেন পরম কোমল ও মহৎ—তিনি আমাদের প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। পৃথিবীর ইতিহাসে যার ব্যক্তিত্ব সর্বোচ্চ পরিমাণে পূর্ণতা লাভ করেছে, তিনি নিজের ঘর ও পরিবারেও রেখে গেছেন অতুলনীয় উদাহরণ। একজন স্বামী হিসেবে তাঁর চরিত্র ছিল এতটাই স্নেহময়, ভারসাম্যপূর্ণ ও দায়িত্বশীল যে মানুষের কাছে তা আজও অনুকরণীয়, চিরকাল অনুসরণযোগ্য।
বর্তমান সময়ে যখন দাম্পত্য জীবনে বিরূপ আচরণ, রাগ, অবহেলা, অপমান, এমনকি নির্যাতনও বেড়ে যাচ্ছে, তখন নবীজির অনন্য দাম্পত্য জীবন আমাদের সামনে এক স্বচ্ছ আয়না হয়ে দাঁড়ায়। তাঁর জীবন আমাদের শেখায়—একটি পরিবার টিকে থাকে ভালোবাসা, ধৈর্য, সহযোগিতা এবং পরস্পরের প্রতি গভীর সম্মানের ওপর।
নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম স্ত্রীদের প্রতি আচরণে ছিলেন অত্যন্ত কোমল ও বিনয়ী। তিনি কখনো কঠিন ভাষা ব্যবহার করতেন না, রাগ দেখাতেন না, কিংবা কারও ওপর জুলুম করতেন না। সেই যুগেও তিনি সম্পর্ককে টিকিয়ে রাখতে সংলাপ, হাসি-আনন্দ ও পারস্পরিক সহযোগিতাকে গুরুত্ব দিয়েছেন। তাঁর আচরণে ছিল অপরিসীম সৌজন্য, যা আজকের সমাজে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হলেও অনেকে তা ভুলে গেছেন।
আয়েশা রাযিয়াল্লাহু আনহু বর্ণনা করেন, নবীজি ঘরের ভেতরে নিজের কাজ নিজেই করতেন। তিনি নিজের পোশাক সেলাই করতেন, জুতা মেরামত করতেন, এমনকি বকরীর দুধ দোহন পর্যন্ত করতেন। বাড়ির ভেতরে কোনোরকম অহংকার বা কর্তৃত্বপরায়ণতা তাঁর মধ্যে ছিল না। তিনি সবসময়ই সাম্য ও সহযোগিতার দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। এতে স্পষ্ট হয়, ঘরের কাজে সহায়তা করাকে তিনি কখনো পুরুষত্বের সঙ্গে সাংঘর্ষিক বলে বিবেচনা করেননি, বরং এটিকে তিনি স্বাভাবিক দায়িত্ব হিসেবে দেখতেন।
আজকের অনেক স্বামী মনে করেন ঘরের কাজে সাহায্য করা তাদের মর্যাদা কমিয়ে দেয়। কিন্তু নবীজির জীবন প্রমাণ করে—যে স্বামী ঘরের কাজে সহযোগিতা করে, তিনিই প্রকৃত অর্থে বড় মানুষ।
দাম্পত্য সম্পর্ককে তিনি সবসময় প্রাণবন্ত ও সুখময় রাখতেন। স্ত্রীদের সঙ্গে দৌড়ে প্রতিযোগিতা করেছেন, তাদের সঙ্গে মজা করেছেন, গল্প শুনিয়েছেন এবং একসঙ্গে খাবার খেয়েছেন। তিনি সম্পর্ককে জীবন্ত ও আনন্দময় রাখার জন্য সচেষ্ট ছিলেন। একবার তিনি স্ত্রীদের খুরাফা নামের এক ব্যক্তির গল্প শুনিয়েছিলেন, ঠিক যেভাবে একজন স্বামী তার স্ত্রীকে হৃদয় থেকে ভালোবেসে গল্প শোনায়। এতে বোঝা যায়—তিনি শুধু ধর্মীয় নেতা নন, তিনি পরিবারে ছিলেন একজন হাস্যোজ্জ্বল, নম্র ও রসিক স্বামী।
কাউকে কষ্ট দিলে তিনি তাৎক্ষণিকভাবে সান্ত্বনা দিতেন। একদিন মাফিয়া রাযিয়াল্লাহু আনহুকে কেউ ইহুদির মেয়ে বলে অপমান করলে তিনি কান্নায় ভেঙে পড়েন। নবীজি তাকে নিজের কাছে টেনে নেন এবং গভীর স্নেহে বোঝান যে অন্যের গালমন্দ তাকে ছোট করতে পারে না। এই ঘটনা প্রমাণ করে—তিনি সম্পর্কের মানসিক দিকটি কতটা গুরুত্ব দিতেন।
খাবারকে কেন্দ্র করে নবীজির আচরণও শিক্ষা দেয়। কখনো খাবারে ভুল খুঁজে কাউকে বিব্রত করেননি। যদি ভালো লাগত খেতেন, না হলে চুপচাপ রেখে দিতেন। আধুনিক সমাজে যেখানে অনেক স্বামী সামান্য বিষয়েও ভুল খুঁজে পরিবারে অশান্তি তৈরি করেন, সেখানে এই শিক্ষা গভীরভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়—নবীজি কখনো স্ত্রীদের ওপর হাত তুলেননি। তিনি বলেছেন, যে স্বামী দিনে মারধর করে রাতে আবার একই স্ত্রীর কাছে ফিরে আসে, সে নিকৃষ্ট আচরণ করে। তিনি শিখিয়েছেন, নারীরা আল্লাহর অমানত। তাদের সম্মান রক্ষা করা স্বামীর প্রধান দায়িত্ব।
দুঃখজনক হলেও সত্য, বর্তমান সমাজে অনেক স্বামী সামান্য কারণেই রাগ করেন, অপমান করেন এবং এটিকে স্বাভাবিক আচরণ বলে মনে করেন। অথচ নবীজি শেখালেন, একটি সম্পর্ক টিকে থাকে রাগ কমিয়ে, কোমলতা বাড়িয়ে, দায়িত্ববোধকে গুরুত্ব দিয়ে।
তাই আজকের সমাজে তাঁর শিক্ষা আরও প্রাসঙ্গিক। মানুষ যদি নবীজির দাম্পত্য জীবনের আদর্শগুলো অনুসরণ করে, তবে বহু পরিবার ভাঙন থেকে রক্ষা পাবে, সম্পর্কগুলো আরও দৃঢ় হবে, এবং সমাজে সুখী পরিবারের সংখ্যা বাড়বে। নবীজি আমাদের দেখিয়েছেন, একটি সফল দাম্পত্য সম্পর্কের ভিত্তি ক্ষমতা বা কর্তৃত্ব নয়, বরং ভালোবাসা, ধৈর্য, ক্ষমাশীলতা ও মানবিকতা।
তিনি ছিলেন পরিবারের অভিভাবক, সাথী, শিক্ষক এবং এক অসাধারণ আদর্শ ব্যক্তি। তাঁর পথ অনুসরণ করলে আজকের সমাজও শান্তি, ভালোবাসা ও সাম্যের পথে ফিরতে পারে।
শেষ পর্যন্ত এটাই সত্য—প্রিয় নবীজির দাম্পত্য জীবন শুধু একটি গল্প নয়, এটি প্রতিটি দাম্পত্য সম্পর্কের জন্য দিশা, শিক্ষা ও আলোর মশাল। আল্লাহ আমাদের সকলকে সেই আদর্শ বুঝে বাস্তব জীবনে প্রয়োগের তৌফিক দান করুন। আমিন।