শীতের মুগ্ধতায় সেন্টমার্টিনে পর্যটকের ঢল

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ৩ ডিসেম্বর, ২০২৫
  • ৩১ বার
শীতের মুগ্ধতায় সেন্টমার্টিনে পর্যটকের ঢল

প্রকাশ: ০৩ ডিসেম্বর ২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

বাংলাদেশের একমাত্র প্রবালদ্বীপ সেন্টমার্টিন আবারও জেগে উঠেছে শীতের আগমনী বার্তায়। বহুদিন প্রশাসনিক নিষেধাজ্ঞা ও রাতযাপনে সীমাবদ্ধতা থাকার পর ডিসেম্বরের প্রথম দিন থেকে পর্যটকবাহী জাহাজ ভিড়তে শুরু করলে নতুন প্রাণ ফিরে পায় দ্বীপটি। সমুদ্রের নীলাভ জলরাশি, শীতের কোমল বাতাস, সাদা বালুর সৈকত আর অপরূপ প্রকৃতির টানে পর্যটকদের পদচারণায় মুখর হয়ে উঠেছে পুরো দ্বীপ। দীর্ঘ সময় পর্যটকের কোলাহলহীন থাকা সেন্টমার্টিন যেন নতুন রূপে জেগে উঠেছে শীতের আবহে।

কক্সবাজার থেকে প্রায় ছয় ঘণ্টার জাহাজযাত্রা শেষে যেই মুহূর্তে পর্যটকরা দ্বীপে পা রাখছেন, ঠিক তখনই ক্লান্তি ভুলে বিস্ময়ে থমকে যাচ্ছেন তারা। সমুদ্রের স্বচ্ছ নীল পানি, দূর-দূরান্তে বালুকাবেলা, নারিকেলবাগান আর মৃদুমন্দ ঢেউয়ের রঙিন ছটা—সব মিলিয়ে এক মনোমুগ্ধকর পরিবেশ তাদের অভিভূত করছে। পর্যটক রেহানা আক্তার জানান, প্রথমবার সেন্টমার্টিনে এসে তিনি অভিভূত। জাহাজ থেকে নামার পরই সমুদ্রের মনোমুগ্ধকর জলরাশি তার দৃষ্টি কেড়ে নেয়। তিনি বলেন, এত সুন্দর সেন্টমার্টিন এর আগে তিনি কল্পনাও করেননি।

একইভাবে পর্যটক রায়হান কাদেরী জানান, এবার দ্বীপে এসে তিনি ভিন্ন অভিজ্ঞতা পেয়েছেন। তার ভাষায়, আগের চেয়ে দ্বীপ এখন অনেক বেশি পরিচ্ছন্ন, সমুদ্রের পানি স্বচ্ছ নীল এবং চারপাশে কোনো ধরনের ময়লা-আবর্জনার চিহ্ন নেই। তার মতে, সেন্টমার্টিনের এমন পরিস্কার-পরিচ্ছন্নতা পর্যটকদের কাছে আরও আকর্ষণীয় করে তুলেছে দ্বীপটিকে।

দ্বীপের স্থানীয় ব্যবসায়ীরা পর্যটকের আগমনকে স্বাগত জানিয়ে নতুন মৌসুমের আশা খুঁজে পাচ্ছেন। রেস্তোরাঁ শ্রমিক আব্দুর রহিম বলেন, পর্যটকদের উপস্থিতিতে তাদের মুখে আবার হাসি ফুটেছে। দীর্ঘ দশ মাস পর্যটক না থাকায় তাদের আয়ে ধস নামে। এখন মৌসুম শুরু হওয়ায় ব্যবসা ফের ঘুরে দাঁড়াবে বলে তিনি আশাবাদী। দ্বীপের প্রায় দশ হাজার স্থানীয় মানুষের প্রধান জীবিকা পর্যটন। তাই পর্যটক আসা মানেই তাদের জীবনে নতুন স্বস্তির বার্তা।

প্রশাসনের আরোপিত বিধিনিষেধের কারণে দুই মাসের বেশি সময় সেন্টমার্টিনে রাতযাপন নিষিদ্ধ ছিল। পরিবেশ রক্ষার যুক্তিতে এই নিষেধাজ্ঞা অব্যাহত থাকলেও স্থানীয় বাসিন্দা ও ব্যবসায়ীদের মতে, এটি তাদের জীবিকাকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। তারা মনে করেন, পর্যটন বন্ধ করে পরিবেশ রক্ষা করা সম্ভব নয়; বরং সঠিক ব্যবস্থাপনা, সচেতনতা এবং পর্যটকদের দায়িত্বশীল আচরণই প্রকৃত সমাধান।

ই-ট্যুরিজম অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ইটাব) সাধারণ সম্পাদক দ্বীন ইসলাম রাজ বলেন, পৃথিবীর অন্য কোথাও পরিবেশের অজুহাতে পর্যটন বন্ধ করে দেওয়া হয় না। বরং পরিবেশ সংরক্ষণের পাশাপাশি পর্যটনও চলতে থাকে সুশৃঙ্খলভাবে। সরকারের প্রতি তার অনুরোধ—সেন্টমার্টিনকে অন্তত চার মাস পর্যটকদের জন্য উন্মুক্ত রাখা হোক। তার মতে, এত অল্প সময় পর্যটন মৌসুম চালু থাকলে দ্বীপের ব্যবসায়ীরা বাঁচতে পারবেন না।

দ্বীপের হোটেল-মোটেল-রিসোর্ট মালিক সমিতির সভাপতি এম এ আবদুর রহিম জিহাদীও একই দাবি জানান। তিনি বলেন, গত দশ মাস পর্যটন বন্ধ থাকার ক্ষতি মাত্র দুই মাসে পুষিয়ে নেওয়া কোনোভাবেই সম্ভব নয়। দ্বীপবাসী ও ব্যবসায়ীদের বাঁচাতে পর্যটকদের জন্য খোলার সময়সীমা অন্তত চার মাস করা জরুরি। কারণ পর্যটন মৌসুমই তাদের পরিবার চালানোর প্রধান ভরসা।

দ্বীপে পর্যটক আগমনে পরিবেশ রক্ষার বিষয়ে ইতিমধ্যে প্রশাসনের জারি করা বারোটি নির্দেশনা কার্যকর করা হচ্ছে। স্থানীয় বাসিন্দা, ব্যবসায়ী এবং ট্যুর অপারেটররা এতে সহযোগিতা করছেন। তারা পর্যটকদের সচেতন করছেন প্লাস্টিক ব্যবহার না করা, সমুদ্রতটে ময়লা না ফেলা, প্রবাল ক্ষতি না করা এবং বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল সংরক্ষণের বিষয়ে। দ্বীপের পরিবেশ যাতে নষ্ট না হয়, সে জন্য দায়িত্বশীল পর্যটনকে সামনে রেখে নানা উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

শীতের হাওয়া শুরু হতেই উপকূলীয় সৌন্দর্যের অনন্য প্রতীক সেন্টমার্টিন যেন নতুন প্রাণ ফিরে পেয়েছে। সমুদ্রের ভাঁজে ভাঁজে শীতের নোনাজলের ঝাপটা, ঢেউয়ের শব্দ আর সুবাতাসের স্নিগ্ধতায় দ্বীপটিতে এখন উৎসবমুখর পরিবেশ। পর্যটক, স্থানীয় মানুষ, ব্যবসায়ী—সবাই আশা করছেন, এই মৌসুমটি হবে সমৃদ্ধ ও আনন্দময়। সঠিক ব্যবস্থাপনা থাকলে সেন্টমার্টিন হতে পারে দেশের অন্যতম টেকসই পর্যটন অবলম্বন।

পর্যটন বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, সেন্টমার্টিনকে দীর্ঘমেয়াদে টিকিয়ে রাখতে হলে প্রয়োজন পরিকল্পিত উন্নয়ন এবং পরিবেশ রক্ষার সমন্বয়। পর্যটন মৌসুম বাড়ানো হলে স্থানীয়দের আয় বাড়বে, তেমনি পর্যটকরাও প্রকৃতির অপার সৌন্দর্য উপভোগের আরও সুযোগ পাবেন। শীতের আগমনী বার্তায় দ্বীপের রূপ যেমন পরিবর্তন হয়েছে, তেমনি নতুন করে আশায় বুক বাঁধছে দ্বীপবাসী।

সেন্টমার্টিনের বালুকাবেলায় ঢেউয়ের সুরের মতোই শীতের এই মৌসুমে পর্যটকদের মুগ্ধতা ছড়িয়ে পড়ছে চারদিকে। প্রকৃতি, মানুষ আর পর্যটনের সমন্বয়ে এই দ্বীপ হয়ে উঠছে ভ্রমণপ্রেমীদের স্বপ্নলোক—যেখানে প্রতিটি ভ্রমণ যেন এক নতুন অভিজ্ঞতার গল্প লিখে যায়।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত