প্রকাশ: ০৮ ডিসেম্বর ২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
দেশের ব্যাংকিং খাত দীর্ঘদিন ধরেই নানা ধরণের অনিয়ম, দুর্বল তদারকি ও রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে ঝুঁকির মুখে রয়েছে। তবে সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংকের বিশেষ প্রতিবেদনে উঠে আসা তথ্য প্রমাণ করেছে যে ঝুঁকির পরিস্থিতি অতীতের যেকোনো সময়ের তুলনায় আরও গভীর ও বিপজ্জনক। কারণ পুরো ব্যাংকিং খাতের বিশাল অঙ্কের ঋণ এখন কয়েকটি শীর্ষ ব্যবসায়িক গ্রুপের মধ্যেই অস্বাভাবিকভাবে কেন্দ্রীভূত হয়ে আছে। এর ফলে ব্যাংকগুলো আমানতকারীদের অর্থ ফেরত দেওয়ার ক্ষমতা হারানোর ঝুঁকিতে পড়ছে, আর সামগ্রিক আর্থিক ব্যবস্থা অস্থিতিশীল হয়ে উঠছে।
প্রতিবেদনে দেখা গেছে, দেশের ব্যাংকিং খাতে বিতরণ করা মোট ১৬ দশমিক ৮০ লাখ কোটি টাকার ঋণের মধ্যে প্রায় ১০ দশমিক ৫২ লাখ কোটি টাকাই দেওয়া হয়েছে বড় ঋণগ্রহীতা গ্রুপ বা প্রতিষ্ঠানের অনুকূলে। অর্থাৎ ব্যাংকগুলোর প্রতি ১০০ টাকা ঋণের মধ্যে প্রায় ৬৩ টাকাই গেছে মাত্র হাতেগোনা কয়েকটি বড় প্রতিষ্ঠানের কাছে। এর মধ্যে শীর্ষ ৫০ গ্রুপের কাছে রয়েছে তিন লাখ ৬৩ হাজার কোটি টাকার ঋণ, যা ব্যাংক খাতের মোট বিতরণকৃত ঋণের প্রায় ২২ শতাংশ। বড় ঋণের এই অস্বাভাবিক কেন্দ্রীভবন আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী একটি বড় ধরনের ঝুঁকি বলে বিবেচিত হয়।
আরও উদ্বেগজনক বিষয় হলো, এই বিপুল অঙ্কের ঋণ বিতরণের সময় যথাযথ জামানত গ্রহণে বড় ধরনের অবহেলা করা হয়েছে। শীর্ষ ৫০ গ্রুপের নেওয়া ঋণের বিপরীতে জামানত রয়েছে মাত্র ৯০ হাজার কোটি টাকা। অর্থাৎ মোট ঋণের প্রায় তিন-চতুর্থাংশই কার্যকর জামানত ছাড়া বিতরণ করা হয়েছে, যা ব্যাংকিং নীতিমালার সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ এবং অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। ঋণ পরিশোধ না হলে এই অর্থ ফেরত পাওয়ার সুযোগ প্রায় নেই বললেই চলে।
প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়েছে যে এই শীর্ষ গ্রুপগুলোর ইকুইটি বা মূলধন প্রায় ২ দশমিক ৬৪ লাখ কোটি টাকা, যার বিপরীতে তাদের দায়—অর্থাৎ ঋণ—দাঁড়িয়েছে প্রায় ১ দশমিক ৩৮ গুণ। অর্থাৎ নিজেদের মূলধনের তুলনায় অত্যধিক পরিমাণ ঋণের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে প্রতিষ্ঠানগুলো। এই পরিস্থিতি কোনো বড় গ্রুপ বা প্রতিষ্ঠানের ব্যর্থতা পুরো ব্যাংকিং খাতকে একযোগে বিপর্যস্ত করে দিতে পারে।
শুধু ঋণের কেন্দ্রীভবনেই সীমাবদ্ধ নয়, এসব বৃহৎ ঋণের খেলাপি হওয়ার হারও আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। দেশের মোট খেলাপি ঋণের হার যেখানে ২৪ দশমিক ৮২ শতাংশ, সেখানে শুধু বড় ঋণের খেলাপি হার দাঁড়িয়েছে ১৯ শতাংশেরও বেশি। অর্থাৎ ব্যাংক খাতের মোট খেলাপি ঋণের ৭৬ শতাংশের বেশি দায়ই এই বৃহৎ ঋণগ্রহীতা গ্রুপগুলোর। খেলাপি ঋণের এমন অস্বাভাবিক বৃদ্ধি ব্যাংকিং ব্যবস্থার সার্বিক স্থিতিশীলতার জন্য বড় হুমকি।
বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনে দেখা গেছে, বড় ঋণের বিপরীতে সবচেয়ে বেশি পুনঃতফসিল ও পুনর্গঠন সুবিধা দেওয়া হয়েছে। প্রায় ১ দশমিক ১৪ লাখ কোটি টাকা ঋণ পুনঃতফসিল বা পুনর্গঠন করা হয়েছে, যা বৃহৎ ঋণের মোট অঙ্কের প্রায় ১১ শতাংশ। বিশেষজ্ঞদের মতে, বছরের পর বছর খেলাপি ঋণ লুকাতে এবং কৃত্রিমভাবে ঋণকে ভাল অবস্থায় দেখাতে পুনঃতফসিলের এই কৌশল ব্যবহার করা হচ্ছে। এর ফলে ব্যাংকের খাতায় খেলাপি ঋণ কম দেখালেও মূলত ঋণ পুনরুদ্ধারের সম্ভাবনা কোনোভাবেই বাড়েনি।
এ ধরনের পরিস্থিতিতে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দীর্ঘ সময় ধরে রাজনৈতিক প্রভাবশালী ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর অনুকূলে বিনা জবাবদিহি ও দুর্বল তদারকির মধ্য দিয়ে বিতরণ করা ঋণ আজ পুরো ব্যাংকিং ব্যবস্থা অস্থিতিশীল করে তুলেছে। তারা মনে করেন, যদি বড় ঋণ পুনর্মূল্যায়ন, সম্পদের সুষ্ঠু যাচাই, দায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা এবং স্বচ্ছতা নিশ্চিত না করা হয়, তবে দেশের আর্থিক খাত এক মারাত্মক বিপর্যয়ের মুখোমুখি হতে পারে। ব্যাংকিং খাতে আস্থা হারালে আমানতকারীরা অর্থ তুলে নেওয়ার প্রবণতা বাড়াতে পারে, যা একধরনের ‘ব্যাংক রান’ পরিস্থিতি হতে সৃষ্টি পারে।
বাংলাদেশ ব্যাংকও স্বীকার করেছে যে ব্যাংকিং খাত বর্তমানে গুরুতর ‘কনসেন্ট্রেশন রিস্ক’-এর মুখে। মাত্র কয়েকটি গ্রুপের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা এমন এক বাস্তবতা তৈরি করেছে যে কোনো একটি প্রতিষ্ঠানের ঋণ ব্যর্থ হলেই একাধিক ব্যাংক একযোগে সংকটে পড়তে পারে। এতে পুরো ফাইন্যান্সিয়াল সিস্টেমে ডোমিনো ইফেক্ট দেখা দেওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। একই সঙ্গে ব্যাংকগুলো যদি অকার্যকর ঋণ উদ্ধার করতে ব্যর্থ হয়, তাহলে তাদের মূলধন ঘাটতি আরও বাড়বে, যা বিদেশি ঋণ, আমদানি ব্যয় বা আন্তর্জাতিক লেনদেনের ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, আর্থিক খাতকে রক্ষায় এখনই জরুরি ভিত্তিতে কাঠামোগত সংস্কার প্রয়োজন। বড় ঋণের ওপর কঠোর নিয়ম প্রয়োগ, ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ তদারকি শক্তিশালী করা, দায়িত্বপ্রাপ্তদের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তি এবং ঋণগ্রহীতাদের আর্থিক সক্ষমতা যাচাইকে বাধ্যতামূলক করার দাবি উঠেছে। একই সঙ্গে পুনঃতফসিল বা পুনর্গঠনের নামে খেলাপি ঋণকে আড়াল করার প্রবণতা বন্ধ না করলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হতে পারে।
দেশের অর্থনীতি বর্তমানে নানা চাপে রয়েছে—মুদ্রাস্ফীতি, ডলার সংকট, বাজেট ঘাটতি, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ হ্রাস—এসবের মধ্যে ব্যাংকিং খাতের অস্থিরতা সংকটকে আরও গভীর করবে। তাই ব্যাংকখাতকে নিরাপদ ও আস্থাশীল রাখতে এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া না হলে বৃহৎ ঋণের বর্তমান সংকট ভবিষ্যতে দেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য একটি সবচেয়ে বড় হুমকিতে পরিণত হতে পারে।