প্রকাশ: ০৯ ডিসেম্বর ২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
ভারতের বৃহত্তম এয়ারলাইন ইন্ডিগোর ফ্লাইট বাতিলের ঘটনায় দেশের বেসামরিক বিমান পরিবহন খাতের ভঙ্গুরতা একবারে চোখে পড়েছে। অন্তত দুই হাজার ফ্লাইট বাতিল হওয়ায় ভ্রমণকারীদের ছুটি, পারিবারিক অনুষ্ঠান, ব্যবসায়িক যাত্রাসহ নানা যাত্রা বিপর্যস্ত হয়েছে। বিভিন্ন বিমানবন্দরে লাগেজের জট সৃষ্টি হয়েছে এবং যাত্রীরা দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে বাধ্য হয়েছেন।
ইন্ডিগোর দেশীয় বাজারে ৬৫ শতাংশের বেশি অংশীদারিত্ব থাকার কারণে ভারতের বিমান খাতের ওপর এই একক এয়ারলাইনের ওপর নির্ভরতা অত্যন্ত বেশি। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি পর্যন্ত এয়ারলাইনের কম খরচে ভ্রমণ সুবিধাকে স্বীকৃতি দিয়েছেন। তবে পাইলটের ঘাটতি, নতুন কাজের সময়সীমা সম্পর্কিত বিধি মানাতে ব্যর্থতা এবং পরিচালনাগত অসঙ্গতি এই বিপর্যয়ের মূল কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হচ্ছে।
ইন্ডিগোর সমস্যা এমন সময়ে সামনে এসেছে যখন প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী এয়ার ইন্ডিয়া ২৭ শতাংশ বাজার অংশীদারিত্ব নিয়ে দুর্বল সেবা এবং সাম্প্রতিক দুর্ঘটনার কারণে সরকার ও নিয়ন্ত্রক সংস্থার কড়াকড়ি নজরদারির মধ্যে রয়েছে। ফলে ভারতের বেসামরিক বিমান খাতের ওপর চাপ আরও বেড়েছে।
সরকার পাইলট ফ্যাটিগ ম্যানেজমেন্ট সংক্রান্ত বিধি শিথিল করেছে, যা কিছুটা স্বস্তি দিয়েছে। তবে ইন্ডিগো পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার চেষ্টা করলেও ক্ষতির পরিমাণ এখনও স্পষ্ট নয়। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন যে, এককভাবে এত বড় এয়ারলাইনের ওপর নির্ভরতা পুরো শিল্প খাতের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ।
স্টারএয়ার কনসালটিংয়ের চেয়ারম্যান হর্ষ বর্ধন বলেন, “ইন্ডিগোর আকার এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে এর অপারেশনাল ব্যর্থতা পুরো ব্যবস্থার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। ইন্ডিগো এবং এয়ার ইন্ডিয়া মিলিয়ে ভারতের অভ্যন্তরীণ বাজারের প্রায় ৯২ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ করছে, যা কার্যত ডুয়োপলির মতো পরিস্থিতি তৈরি করেছে। এই ধরনের একক আধিপত্য পুরো খাতের স্থিতিশীলতার জন্য হুমকি।”
ইন্ডিগোর সম্প্রসারণ গত দশকে উল্লেখযোগ্য। বর্তমানে এরা ৪০০টির বেশি এয়ারক্রাফট পরিচালনা করছে এবং দৈনিক দুই হাজার ফ্লাইটে প্রায় ৩.৮ লাখ যাত্রী পরিবহন করছে। তবে অন-টাইম পারফর্ম্যান্স মাত্র ৩.৭ শতাংশে নেমে যাওয়ায় ব্র্যান্ড ইমেজে ক্ষতি হয়েছে এবং রিফান্ড খাতে ইতিমধ্যেই ৬৮ মিলিয়ন ডলার ক্ষতির খবর পাওয়া গেছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ইন্ডিগোর সমস্যা শুধুমাত্র একটি এয়ারলাইনের বিষয় নয়। এটি ভারতের বেসামরিক বিমান খাতের ভঙ্গুর কাঠামোর প্রতিফলন। শিল্পে প্রতিযোগিতা সীমিত এবং প্রায় নির্ভরতা একক এয়ারলাইনের ওপর, যা সামান্য ব্যর্থতাকেও সারা খাতের জন্য সংকট সৃষ্টি করতে পারে।
যাত্রী ও ব্যবসায়ীরা ইতিমধ্যেই এই পরিস্থিতিতে হতাশা প্রকাশ করছেন। দেশজুড়ে বিমানবন্দরগুলোতে দীর্ঘ লাইনে দাঁড়াতে হচ্ছে এবং যাত্রীরা যাত্রা পুনঃনির্ধারণে চাপের মুখে পড়ছেন। বিশেষ করে ছুটি, বিয়ের অনুষ্ঠান, ব্যবসায়িক সফর এবং জরুরি যাত্রা প্রায়শই প্রভাবিত হয়েছে।
সরকার এবং শিল্প বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন যে, ভারতের বিমান খাতের নিরাপত্তা ও সেবা মান নিশ্চিত করতে একক এয়ারলাইনের ওপর এত বেশি নির্ভরতা ঝুঁকিপূর্ণ। এ কারণে অন্যান্য এয়ারলাইনের সক্ষমতা বৃদ্ধি, প্রশিক্ষিত পাইলট ও পরিচালনাগত সংস্কার জরুরি।
উল্লেখযোগ্য হলো, ইন্ডিগোর ফ্লাইট বাতিলের ঘটনায় দেশের বিমান খাতের শৃঙ্খলা ও যাত্রী সন্তুষ্টি কমে গেছে। দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব হিসেবে যাত্রীদের মধ্যে আস্থা কমতে পারে, যা এয়ারলাইনের ব্র্যান্ড এবং সেবা মানকে প্রভাবিত করতে পারে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভারতের বেসামরিক বিমান খাতের দীর্ঘমেয়াদী স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে নতুন নিয়ন্ত্রক নীতি, নিরাপত্তা সংস্কার এবং প্রতিযোগিতামূলক বাজারের বিকাশ অপরিহার্য।
বর্তমানে ইন্ডিগো পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার চেষ্টা করছে। ফ্লাইট পুনঃনির্ধারণ, অতিরিক্ত ক্রু নিয়োগ এবং অপারেশনাল ব্যবস্থার শক্তিশালীকরণে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তবে ক্ষতির পরিমাণ এবং যাত্রীদের আস্থা পুনরুদ্ধার কত দ্রুত সম্ভব হবে, তা সময়ের অপেক্ষা।
ভারতের বিমান খাতের বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ইন্ডিগোর সমস্যার সমাধান শুধু সংস্থার অভ্যন্তরীণ পরিচালনার ওপর নির্ভর করছে না। পুরো শিল্প খাতের কাঠামোতে সংস্কার, নতুন এয়ারলাইনের বাজারে প্রবেশ এবং নিরাপদ, নির্ভরযোগ্য ভ্রমণ ব্যবস্থার উন্নয়ন জরুরি। তারা সতর্ক করেছেন যে, একক এয়ারলাইনের ব্যর্থতা যদি পুরো খাতকে অস্থির করে, তবে অর্থনৈতিক ক্ষতির পাশাপাশি সামাজিক ও যাত্রীর ক্ষতির মাত্রাও বৃদ্ধি পাবে।