প্রকাশ: ১৭ ডিসেম্বর ২০২৫ | নিজস্ব সংবাদদাতা | একটি বাংলাদেশ অনলাইন
শুটিং করতে গিয়ে আহত জিৎ—এই খবর ছড়িয়ে পড়তেই উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়েছে ওপার বাংলার চলচ্চিত্রাঙ্গনে ও তার অসংখ্য ভক্তদের মধ্যে। কলকাতার জনপ্রিয় ও বাণিজ্যিকভাবে সফল অভিনেতা জিৎ নতুন একটি ঐতিহাসিক সিনেমার শুটিং করতে গিয়ে দুর্ঘটনার শিকার হয়েছেন। পরিচালক পথিকৃৎ বসুর নির্মাণাধীন সিনেমা ‘কেউ বলে বিপ্লবী, কেউ বলে ডাকাত’-এর শুটিং চলাকালেই এই অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটে। ঘটনার পরপরই সিনেমাটির শুটিং সাময়িকভাবে স্থগিত করা হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, সিনেমাটির একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃশ্যের শুটিং চলাকালেই জিৎ আহত হন। পুরো সপ্তাহজুড়ে শুটিংয়ের নির্ধারিত শিডিউল থাকলেও অভিনেতার শারীরিক অবস্থার কথা বিবেচনা করে আপাতত সব কাজ বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। জিৎ কীভাবে আহত হয়েছেন, তা নিয়ে এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে বিস্তারিত কিছু জানানো হয়নি। তবে শুটিং সেটে উপস্থিত একাধিক সূত্র জানিয়েছে, দৃশ্যটি ছিল শারীরিকভাবে ঝুঁকিপূর্ণ এবং অ্যাকশননির্ভর, যেখানে সামান্য অসাবধানতাই বড় দুর্ঘটনার কারণ হতে পারে।
পরিচালক পথিকৃৎ বসু গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, আপাতত শুটিং পুনরায় শুরু করার কোনো নির্দিষ্ট দিনক্ষণ তিনি জানাতে পারছেন না। তার ভাষায়, অভিনেতার সুস্থতা সবার আগে। জিৎ পুরোপুরি সুস্থ না হওয়া পর্যন্ত শুটিং শুরু করা হবে না। পরিচালক আরও জানান, ছবিটি একটি ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে নির্মিত এবং এতে শারীরিক প্রস্তুতি ও মানসিক মনোযোগ—দুটিই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই কোনো ঝুঁকি নিতে চান না তিনি।
এই সিনেমায় জিৎ অভিনয় করছেন ঐতিহাসিক চরিত্র অনন্ত সিংহের ভূমিকায়। চরিত্রটি বাংলা ইতিহাসের এক বর্ণাঢ্য, সাহসী এবং একই সঙ্গে বিতর্কিত অধ্যায়ের প্রতিনিধি। সিনেমাটির গল্প আবর্তিত হবে ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের উত্তাল সময়কে কেন্দ্র করে। অ্যাকশন ও ইতিহাসনির্ভর এই ছবিতে বিপ্লবী কর্মকাণ্ড, গোপন অভিযান, ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ এবং সেই সময়কার রাজনৈতিক টানাপোড়েন ফুটে উঠবে বলে জানা গেছে।
অনন্ত সিংহ ১৯০৩ সালে চট্টগ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ছিলেন মাস্টারদা সূর্য সেনের অন্যতম ঘনিষ্ঠ সহযোগী এবং চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুণ্ঠনের সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে যুক্ত এক সাহসী বিপ্লবী। ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে সশস্ত্র আন্দোলনে তার ভূমিকা ইতিহাসে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। পরবর্তী জীবনে তিনি নকশালপন্থী রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হন, যা তার জীবনকে আরও বিতর্কিত করে তোলে।
ইতিহাস থেকে জানা যায়, ১৯৬০ সালে কলকাতায় ধারাবাহিক ব্যাংক ডাকাতির অভিযোগে তাকে ঝাড়খণ্ডের জদুগড় এলাকা থেকে গ্রেফতার করা হয়। এরপর তাকে আবার দীর্ঘ আট বছর কারাবরণ করতে হয়। প্রচলিত ধারণা অনুযায়ী, এসব ডাকাতি থেকে পাওয়া অর্থ তিনি বাংলার অসহায় ও দরিদ্র মানুষের সহায়তায় ব্যয় করতেন। এই মানবিক দিকটিই তাকে সাধারণ মানুষের চোখে এক ভিন্ন মাত্রার নায়ক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে। দীর্ঘ সংগ্রামী জীবনের পর হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে ১৯৭৯ সালের ২৫ জানুয়ারি অনন্ত সিংহ মৃত্যুবরণ করেন।
এই জটিল, সাহসী ও দ্বন্দ্বপূর্ণ চরিত্রটিকে পর্দায় জীবন্ত করে তুলতে গিয়ে স্বাভাবিকভাবেই জিতের ওপর ছিল বাড়তি শারীরিক ও মানসিক চাপ। চরিত্রটির জন্য তাকে বিশেষ প্রশিক্ষণ, ফিটনেস প্রস্তুতি এবং অ্যাকশন দৃশ্যে নিজেকে সম্পৃক্ত করতে হয়েছে বলে জানা গেছে। চলচ্চিত্র সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, এই অতিরিক্ত প্রস্তুতি ও ঝুঁকিপূর্ণ দৃশ্যই দুর্ঘটনার সম্ভাবনা বাড়িয়ে দিয়েছিল।
জিৎ দীর্ঘদিন ধরেই টালিগঞ্জের অন্যতম শীর্ষ তারকা। বাণিজ্যিক সিনেমার পাশাপাশি সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তিনি বিষয়নির্ভর ও চরিত্রপ্রধান সিনেমাতেও আগ্রহ দেখাচ্ছেন। অনন্ত সিংহের চরিত্রে অভিনয় করাকে তিনি নিজের ক্যারিয়ারের অন্যতম চ্যালেঞ্জিং কাজ হিসেবে দেখছিলেন। তাই শুটিং চলাকালে এই দুর্ঘটনা তাকে যেমন শারীরিকভাবে আঘাত করেছে, তেমনি মানসিকভাবেও কিছুটা ধাক্কা দিয়েছে বলে মনে করছেন অনেকে।
বর্তমানে জিতের শারীরিক অবস্থার বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করা না হলেও ঘনিষ্ঠ সূত্রে জানা গেছে, তিনি চিকিৎসকদের পর্যবেক্ষণে রয়েছেন এবং আপাতত বিশ্রামে আছেন। তার সুস্থতার খবর জানার জন্য ভক্তরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে উদ্বেগ ও শুভকামনা জানাচ্ছেন। টালিগঞ্জের অনেক তারকাও তার দ্রুত আরোগ্য কামনা করেছেন।
সিনেমাটি কবে মুক্তি পাবে, তা এখনো নিশ্চিত নয়। কারণ ২০২৬ সাল থেকে নির্দিষ্ট ক্যালেন্ডার অনুযায়ী ছবি মুক্তির পরিকল্পনা করা হয়েছে। শুটিং স্থগিত থাকায় মুক্তির তারিখেও পরিবর্তন আসতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে নির্মাতা ও প্রযোজক পক্ষ আশা করছেন, জিৎ দ্রুত সুস্থ হয়ে আবার শুটিং সেটে ফিরবেন এবং দর্শকরা একটি শক্তিশালী ঐতিহাসিক সিনেমা উপহার পাবেন।