শরীয়তপুরে পল্লী চিকিৎসককে পুড়িয়ে হত্যার নেপথ্যে ছিনতাই পরিকল্পনা

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ৫ জানুয়ারী, ২০২৬
  • ৬৮ বার
শরীয়তপুরে পল্লী চিকিৎসককে পুড়িয়ে হত্যার ঘটনায় তিনজন গ্রেপ্তার

প্রকাশ: ০৫ জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

শরীয়তপুরের ডামুড্যা উপজেলায় পল্লী চিকিৎসক ও ওষুধ ব্যবসায়ী খোকন দাসকে নির্মমভাবে পুড়িয়ে হত্যার ঘটনায় অবশেষে ঘটনার নেপথ্যের ভয়াবহ চিত্র সামনে এসেছে। দীর্ঘ অনুসন্ধান, তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তা এবং ধারাবাহিক অভিযানের পর র‌্যাব তিনজনকে গ্রেপ্তার করেছে। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে গ্রেপ্তারকৃতরা হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেছে বলে জানিয়েছে র‌্যাব। স্থানীয়ভাবে আলোচিত এই ঘটনাটি শুধু একটি হত্যাকাণ্ড নয়, বরং গ্রামবাংলার নিরাপত্তা, নৈতিক অবক্ষয় এবং অপরাধ প্রবণতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে।

র‌্যাব-৮-এর অধিনায়ক কমান্ডার শাহাদাত হোসেন রোববার সন্ধ্যায় মাদারীপুর র‌্যাব-৮ ক্যাম্পে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে ঘটনার বিস্তারিত তুলে ধরেন। তিনি জানান, অর্থ ছিনিয়ে নেওয়ার উদ্দেশ্যেই পরিকল্পিতভাবে খোকন দাসকে আক্রমণ করা হয়। ভুক্তভোগী হামলাকারীদের চিনে ফেলায় অপরাধের সাক্ষ্য মুছে ফেলতে তাকে আগুন দিয়ে পুড়িয়ে হত্যার চেষ্টা চালানো হয়, যা শেষ পর্যন্ত নির্মম হত্যাকাণ্ডে রূপ নেয়।

গ্রেপ্তার হওয়া তিনজন হলেন শরীয়তপুরের ডামুড্যা উপজেলার কনেশ্বর এলাকার বাবুল খানের ছেলে সোহাগ খান (২৭), একই এলাকার সামসুদ্দিন মোল্লার ছেলে রাব্বি মোল্লা (২১) এবং শহীদ সরদারের ছেলে পলাশ সরদার (২৫)। শনিবার গভীর রাতে কিশোরগঞ্জ জেলার পূর্ব পৈলানপুরের বাজিতপুর এলাকা থেকে তাদের গ্রেপ্তার করা হয়। ঘটনার পর থেকেই তারা আত্মগোপনে ছিল এবং এলাকা পরিবর্তন করে পুলিশের চোখ এড়িয়ে চলার চেষ্টা করছিল বলে জানায় র‌্যাব।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, খোকন দাস ছিলেন কনেশ্বর ইউনিয়নের তিলই এলাকার একজন পরিচিত মুখ। পল্লী চিকিৎসার পাশাপাশি তিনি একটি ওষুধের দোকান পরিচালনা করতেন এবং মোবাইল ব্যাংকিং সেবার বিকাশ এজেন্ট হিসেবেও কাজ করতেন। গ্রামের সাধারণ মানুষের কাছে তিনি ছিলেন ভরসার নাম। রাত-বিরাতে অসুস্থ রোগী দেখাও তার কাছে নতুন কিছু ছিল না। এই নির্ভরতার সুযোগকেই অপরাধীরা কাজে লাগিয়েছে বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।

র‌্যাবের দেওয়া তথ্যমতে, বুধবার রাতে দোকান বন্ধ করে বাড়ি ফেরার পথে আগে থেকেই ওত পেতে থাকা অভিযুক্তরা তাকে ছুরিকাঘাত করে। গুরুতর আহত অবস্থায় তিনি যখন হামলাকারীদের চিনে ফেলেন এবং প্রতিরোধের চেষ্টা করেন, তখনই তারা ভয়াবহ সিদ্ধান্ত নেয়। শরীর ও মুখে পেট্রোল ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয় তাকে। পথচারীদের চিৎকার ও স্থানীয়দের ছুটে আসার আগেই অভিযুক্তরা পালিয়ে যায়। পরে গুরুতর দগ্ধ অবস্থায় তাকে উদ্ধার করে প্রথমে স্থানীয় হাসপাতালে এবং পরে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।

ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে কয়েকদিন মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করে শনিবার সকালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন খোকন দাস। তার মৃত্যুর খবরে পুরো ডামুড্যা উপজেলা জুড়ে শোকের ছায়া নেমে আসে। পরিবার, আত্মীয়স্বজন ও স্থানীয় বাসিন্দাদের কান্না আর ক্ষোভে ভারী হয়ে ওঠে পরিবেশ। একজন নিরীহ পল্লী চিকিৎসকের এমন মর্মান্তিক মৃত্যু সাধারণ মানুষের মনে তীব্র নিরাপত্তাহীনতার অনুভূতি তৈরি করেছে।

এ ঘটনায় নিহতের বাবা পরেশ চন্দ্র দাস বৃহস্পতিবার রাতে ডামুড্যা থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। মামলায় সোহাগ খান, রাব্বি মোল্লা ও পলাশ সরদারের নাম উল্লেখ করা হয়। ঘটনার পরপরই তারা আত্মগোপনে চলে যায়। পরে তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় তাদের অবস্থান শনাক্ত করে র‌্যাব অভিযান পরিচালনা করে। অভিযানের সময় হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত একটি ছুরি উদ্ধার করা হয়েছে বলে সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়।

র‌্যাব-৮-এর অধিনায়ক শাহাদাত হোসেন বলেন, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে গ্রেপ্তারকৃতরা হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেছে। তারা টাকা ছিনিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা করেছিল এবং খোকন দাসের কাছে মোবাইল ব্যাংকিং লেনদেনের কারণে নগদ অর্থ থাকার ধারণা থেকেই এই হামলা চালানো হয়। তিনি আরও জানান, মামলার তদন্ত চলমান রয়েছে এবং প্রয়োজনে আরও আসামি গ্রেপ্তার করা হবে।

এই হত্যাকাণ্ড ঘিরে স্থানীয়দের মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। অনেকেই বলছেন, গ্রামাঞ্চলে এমন নৃশংস অপরাধ আগে খুব একটা দেখা যেত না। পল্লী চিকিৎসক খোকন দাস ছিলেন এলাকার মানুষের সেবায় নিবেদিত একজন ব্যক্তি। তার ওপর এমন বর্বর হামলা শুধু একটি পরিবার নয়, পুরো সমাজকেই আহত করেছে। দ্রুত বিচার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।

মানবাধিকারকর্মীরা মনে করছেন, এই ঘটনা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ। গ্রামাঞ্চলে অপরাধের ধরন বদলাচ্ছে এবং অপরাধীরা আগের চেয়ে আরও সহিংস হয়ে উঠছে। তাই শুধু অপরাধের পর গ্রেপ্তার নয়, আগাম প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থাও জোরদার করা প্রয়োজন বলে তারা মত দিয়েছেন।

একটি বাংলাদেশ অনলাইন-এর পক্ষ থেকে প্রাপ্ত তথ্য যাচাই করে দেখা গেছে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া নানা তথ্যের সঙ্গে র‌্যাব ও স্থানীয় প্রশাসনের বক্তব্যের মিল রয়েছে। আন্তর্জাতিক ও দেশের বিভিন্ন গণমাধ্যমেও এই হত্যাকাণ্ড নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। বিশেষ করে একজন পল্লী চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যসেবায় যুক্ত ব্যক্তিকে লক্ষ্য করে এমন অপরাধকে সমাজের জন্য অশনিসংকেত হিসেবে দেখা হচ্ছে।

খোকন দাসের মৃত্যু শুধু একটি পরিসংখ্যান নয়, এটি একটি মানবিক ট্র্যাজেডি। তার পরিবারের স্বপ্ন ভেঙে গেছে, গ্রাম হারিয়েছে একজন সেবককে। এই ঘটনা আবারও স্মরণ করিয়ে দেয়, নিরাপত্তা ও আইনের শাসন নিশ্চিত করা কতটা জরুরি। অপরাধীদের দ্রুত বিচার এবং দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি না হলে এমন ঘটনা ভবিষ্যতে আরও বাড়তে পারে—এমন আশঙ্কাই এখন সবার মুখে মুখে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত