প্রকাশ: ০৬ জানুয়ারী ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
শহীদ শরীফ ওসমান হাদি হত্যার বিচারসহ চার দফা দাবি আদায়ের লক্ষ্যে রাজধানীতে ‘মার্চ ফর ইনসাফ’ কর্মসূচি শুরু করেছে ইনকিলাব মঞ্চ। মঙ্গলবার বেলা সাড়ে ১১টায় শাহবাগের হাদি চত্বর থেকে শুরু হওয়া এই পদযাত্রা রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ সড়ক ও জনবহুল এলাকাগুলো অতিক্রম করে পুনরায় শাহবাগে এসে শেষ হওয়ার কথা রয়েছে। দীর্ঘ এই কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে রাজধানীর রাজপথে তৈরি হয়েছে প্রতিবাদের নতুন দৃশ্য, যেখানে ন্যায়বিচারের দাবি আর ক্ষোভের ভাষা এক হয়ে উচ্চারিত হয়েছে।
শাহবাগের হাদি চত্বরে সকাল থেকেই জড়ো হতে থাকেন ইনকিলাব মঞ্চের কেন্দ্রীয় নেতারা এবং বিভিন্ন ইউনিটের নেতাকর্মীরা। ব্যানার, ফেস্টুন ও প্ল্যাকার্ড হাতে নিয়ে তারা শহীদ হাদির হত্যার বিচার এবং সব ধরনের অন্যায়ের বিরুদ্ধে অবস্থান জানান। পদযাত্রা শুরু হতেই স্লোগানে স্লোগানে মুখর হয়ে ওঠে আশপাশের এলাকা। ‘হাদির ভাইয়ের রক্ত বৃথা যেতে দেবো না’, ‘আমার ভাই কবরে, খুনি কেন বাহিরে’ কিংবা ‘রক্তের বন্যায়, ভেসে যাবে অন্যায়’—এমন প্রতিবাদী স্লোগানে আন্দোলনকারীরা তাদের ক্ষোভ ও দাবি প্রকাশ করেন।
ইনকিলাব মঞ্চের ঘোষিত কর্মসূচি অনুযায়ী, এই ‘মার্চ ফর ইনসাফ’ শাহবাগ থেকে সায়েন্সল্যাব ও সিটি কলেজ এলাকা অতিক্রম করে মোহাম্মদপুরের তিন রাস্তার মোড়, রায়েরবাজার বধ্যভূমি, মিরপুর-১০, উত্তরা, বসুন্ধরা, বাড্ডা, রামপুরা ও যাত্রাবাড়ী ঘুরে সন্ধ্যায় আবার শাহবাগের হাদি চত্বরে এসে শেষ হবে। আয়োজকদের ভাষ্য অনুযায়ী, রাজধানীর বিভিন্ন প্রান্তে গিয়ে সাধারণ মানুষের সঙ্গে কথা বলা, তাদের মধ্যে সচেতনতা তৈরি করা এবং দাবিগুলো জনসম্মুখে তুলে ধরাই এই দীর্ঘ পদযাত্রার মূল লক্ষ্য।
পথযাত্রায় প্রায় ১০টি পিক-আপ ব্যবহার করা হচ্ছে, যেখানে নেতাকর্মীরা দাঁড়িয়ে বক্তব্য দিচ্ছেন এবং স্লোগান দিচ্ছেন। কোথাও কোথাও পথচারী ও সাধারণ মানুষ থেমে আন্দোলনকারীদের কথা শুনছেন, আবার অনেকেই মোবাইল ফোনে এই দৃশ্য ধারণ করছেন। আয়োজকদের মতে, এই কর্মসূচির মাধ্যমে শুধু একটি হত্যাকাণ্ডের বিচার দাবি নয়, বরং ন্যায়বিচারহীনতার বিরুদ্ধে সামগ্রিক প্রতিবাদ জানানো হচ্ছে।
ইনকিলাব মঞ্চের নেতৃবৃন্দ জানান, শহীদ শরীফ ওসমান হাদি হত্যার বিচার দীর্ঘদিন ধরে ঝুলে থাকায় জনমনে যে ক্ষোভ তৈরি হয়েছে, তারই বহিঃপ্রকাশ এই ‘মার্চ ফর ইনসাফ’। তাদের বক্তব্য, একটি হত্যাকাণ্ডের বিচার বিলম্বিত হওয়া মানে রাষ্ট্র ও সমাজের জন্য একটি ভয়ংকর বার্তা। এতে অপরাধীরা উৎসাহিত হয় এবং সাধারণ মানুষের আস্থা ক্ষুণ্ন হয়। তাই তারা শুধু সরাসরি হত্যাকারীদের নয়, বরং হত্যার পরিকল্পনাকারী, সহযোগী এবং আশ্রয়দাতাদেরও বিচারের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন।
নেতারা বলেন, তাদের ঘোষিত চার দফা দাবি কোনো আবেগী স্লোগান নয়, বরং ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ। তারা স্পষ্ট করে জানিয়েছেন, খুনি ও সংশ্লিষ্ট পুরো চক্রের বিচার একটি নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে সম্পন্ন করতে হবে, যাতে বিচারপ্রক্রিয়া নিয়ে কোনো ধোঁয়াশা না থাকে। একই সঙ্গে তারা দেশের সার্বভৌমত্ব ও নিরাপত্তার প্রশ্নে কঠোর অবস্থানের কথা তুলে ধরেছেন।
পদযাত্রায় অংশ নেওয়া নেতাকর্মীদের বক্তব্যে উঠে আসে, বাংলাদেশে অবস্থানরত বিদেশি নাগরিকদের কাজের অনুমতি, সীমান্তবর্তী অপরাধ ও আন্তর্জাতিক আইনের বিষয়গুলোও এই আন্দোলনের অংশ। তারা মনে করেন, অপরাধীরা যদি দেশের বাইরে আশ্রয় পায় এবং তাদের ফেরত আনার উদ্যোগ না নেওয়া হয়, তবে বিচারপ্রক্রিয়া অর্থহীন হয়ে পড়ে। এ কারণে আন্তর্জাতিক আইনি পদক্ষেপের দাবিও তারা আন্দোলনের অংশ হিসেবে সামনে এনেছেন।
ইনকিলাব মঞ্চের একাধিক নেতা বলেন, এই কর্মসূচি শান্তিপূর্ণ হলেও এর বার্তা অত্যন্ত দৃঢ়। তারা দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন। প্রয়োজনে আরও কঠোর কর্মসূচির কথাও জানিয়েছেন, তবে সবকিছুই শান্তিপূর্ণ ও গণতান্ত্রিক উপায়ে হবে বলে তারা আশ্বস্ত করেছেন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ‘মার্চ ফর ইনসাফ’ শুধু একটি সংগঠনের কর্মসূচি নয়, বরং সাম্প্রতিক সময়ে বিচারহীনতার বিরুদ্ধে গড়ে ওঠা সামাজিক ক্ষোভের প্রতিফলন। রাজধানীর কেন্দ্রস্থল শাহবাগ থেকে শুরু করে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ এলাকা ঘুরে আবার সেখানে ফিরে আসার কর্মসূচি প্রতীকী অর্থ বহন করে। এটি যেন রাষ্ট্রের কেন্দ্রেই ন্যায়বিচারের দাবি পৌঁছে দেওয়ার একটি প্রচেষ্টা।
মানবাধিকারকর্মীদের কেউ কেউ মনে করছেন, এ ধরনের কর্মসূচি রাষ্ট্রের জন্য একটি বার্তা বহন করে—বিচার বিলম্বিত হলে জনআস্থা নড়বড়ে হয়ে যায়। তারা বলেন, যেকোনো হত্যাকাণ্ডের সুষ্ঠু ও দ্রুত বিচার শুধু ভুক্তভোগী পরিবারের জন্য নয়, পুরো সমাজের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
পদযাত্রা চলাকালে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে সতর্ক অবস্থানে দেখা গেছে। গুরুত্বপূর্ণ মোড়গুলোতে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়, যাতে কোনো অপ্রীতিকর পরিস্থিতি সৃষ্টি না হয়। এখন পর্যন্ত কর্মসূচি শান্তিপূর্ণভাবেই এগোচ্ছে বলে জানা গেছে।
সন্ধ্যার দিকে শাহবাগের হাদি চত্বরে এসে পদযাত্রা শেষ হলে সেখানে সংক্ষিপ্ত সমাবেশ হওয়ার কথা রয়েছে। ওই সমাবেশে ইনকিলাব মঞ্চের শীর্ষ নেতারা আবারও তাদের দাবিগুলো তুলে ধরবেন এবং ভবিষ্যৎ কর্মসূচির ইঙ্গিত দিতে পারেন বলে আয়োজক সূত্রে জানা গেছে।
সব মিলিয়ে, রাজধানীজুড়ে এই ‘মার্চ ফর ইনসাফ’ কর্মসূচি ন্যায়বিচারের প্রশ্নকে নতুন করে আলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে এসেছে। শহীদ হাদি হত্যার বিচার দাবিতে শুরু হওয়া এই পদযাত্রা এখন একটি বৃহত্তর প্রতিবাদের রূপ নিয়েছে, যেখানে মানুষের আকাঙ্ক্ষা—অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো এবং ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা—স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হচ্ছে।