প্রকাশ: ১৪ জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
শীত এলেই অনেক মানুষের জীবনে নেমে আসে এক ধরনের নীরব ভোগান্তি। হালকা সর্দি-কাশি দিয়ে শুরু হলেও ধীরে ধীরে তা রূপ নেয় মাথাব্যথা, নাক বন্ধ থাকা, মুখমণ্ডলে চাপ অনুভূত হওয়া ও চোখের আশপাশে যন্ত্রণায়। বিশেষ করে যাদের সাইনাসের সমস্যা রয়েছে, তাদের জন্য শীতকাল যেন সবচেয়ে কষ্টকর সময়। আবহাওয়ার পরিবর্তন, ঠান্ডা বাতাস, ধুলাবালি এবং সংক্রমণের ঝুঁকি বেড়ে যাওয়ার কারণে সাইনাসের প্রদাহ বা ইনফেকশন এই সময় বেশি দেখা যায়। ফলে দৈনন্দিন কাজকর্ম, ঘুম এমনকি মনোযোগ ধরে রাখাও হয়ে ওঠে কঠিন।
অনেকেই এই সমস্যা থেকে মুক্তি পেতে নিয়মিত ওষুধ সেবন করেন। তবে দীর্ঘদিন ওষুধের ওপর নির্ভরশীল না হয়ে কিছু ঘরোয়া ও সহজ পদ্ধতি অনুসরণ করলে উপকার পাওয়া যেতে পারে। চিকিৎসকদের মতে, হালকা থেকে মাঝারি মাত্রার সাইনাস সমস্যায় জীবনযাপনের ধরন ও খাদ্যাভ্যাসে সামান্য পরিবর্তনও উল্লেখযোগ্য স্বস্তি দিতে পারে। শীতকালে সাইনাসের ব্যথা ও অস্বস্তি কমাতে এমনই কয়েকটি ঘরোয়া উপায় রয়েছে, যা নিয়মিত মেনে চললে অনেকেই উপকার পেয়ে থাকেন।
শীতে সাইনাসের সমস্যায় সবচেয়ে উপকারী খাবারের মধ্যে স্যুপ অন্যতম। সবজি কিংবা মুরগির মাংস দিয়ে তৈরি গরম স্যুপ শরীরকে ভেতর থেকে উষ্ণ রাখে। স্যুপে থাকা তরল উপাদান নাক ও সাইনাসের ভেতরের জমে থাকা শ্লেষ্মা পাতলা করতে সাহায্য করে, ফলে নাক বন্ধভাব কিছুটা কমে। পাশাপাশি সবজি ও মাংসের পুষ্টিগুণ শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে সহায়ক ভূমিকা রাখে। অনেকেই লক্ষ্য করেন, দিনে কয়েকবার অল্প অল্প করে গরম স্যুপ খেলে মাথার ভারী ভাব ও ক্লান্তি ধীরে ধীরে কমে আসে এবং কাজে মনোযোগ ফেরানো সহজ হয়।
ভেষজ চাও শীতকালীন সাইনাস সমস্যায় স্বস্তি দেওয়ার একটি পরিচিত উপায়। আদা, তুলসি, দারুচিনি বা লবঙ্গ দিয়ে তৈরি ভেষজ চা শরীরকে উষ্ণ রাখার পাশাপাশি জীবাণুর বিরুদ্ধে কাজ করতে পারে। এসব উপাদানের মধ্যে থাকা প্রাকৃতিক অ্যান্টি-ব্যাকটেরিয়াল ও অ্যান্টি-ফাঙ্গাল গুণ সর্দি-কাশি কমাতে সহায়তা করে বলে মনে করা হয়। নিয়মিত ভেষজ চা পান করলে গলা ব্যথা ও নাক বন্ধভাব কিছুটা হালকা হয়, যা সাইনাসের চাপ কমাতে সাহায্য করে। শীতের সকালে বা সন্ধ্যায় এক কাপ গরম ভেষজ চা অনেকের কাছেই আরামদায়ক অনুভূতি এনে দেয়।
সাইনাস সমস্যায় বহুল প্রচলিত আরেকটি ঘরোয়া উপায় হলো হলুদ দুধ। দুধের সঙ্গে অল্প পরিমাণ হলুদ মিশিয়ে গরম করে পান করলে শরীর উষ্ণ থাকে এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা শক্তিশালী হতে পারে। হলুদে থাকা প্রাকৃতিক উপাদান প্রদাহ কমাতে সহায়ক বলে আয়ুর্বেদ ও লোকজ চিকিৎসায় বিশ্বাস করা হয়। শীতকালে নিয়মিত রাতে হলুদ দুধ পান করলে অনেকের ক্ষেত্রে সাইনাসের ব্যথা ও সর্দিজনিত অস্বস্তি ধীরে ধীরে কমে আসে। একই সঙ্গে এটি ভালো ঘুমের সহায়ক হিসেবেও কাজ করতে পারে, যা অসুস্থতার সময় শরীরের জন্য খুব প্রয়োজনীয়।
গরম পানির গুরুত্ব অনেক সময় আমরা অবহেলা করি, অথচ সাইনাস সমস্যায় এটি হতে পারে সবচেয়ে সহজ ও কার্যকর উপাদান। পর্যাপ্ত গরম পানি পান করলে শরীর হাইড্রেট থাকে এবং নাকের ভেতরের শ্লেষ্মা পাতলা হতে সাহায্য করে। কেউ কেউ গরম পানির সঙ্গে সামান্য হলুদ বা গোলমরিচ গুঁড়ো মিশিয়ে পান করেন, যা শরীর গরম রাখতে ও সর্দি কমাতে সহায়ক হতে পারে। নিয়মিত গরম পানি পান করলে মাথাব্যথা ও নাক বন্ধভাব কিছুটা প্রশমিত হয় বলে অনেকের অভিজ্ঞতা। শীতকালে ঠান্ডা পানি এড়িয়ে চলা এবং কুসুম গরম পানি পান করার অভ্যাস গড়ে তোলাও সাইনাস রোগীদের জন্য উপকারী।
খাদ্যাভ্যাসে কিছু নিয়ন্ত্রণ সাইনাস সমস্যায় বড় ভূমিকা রাখতে পারে। অনেকেরই দই বা ঠান্ডা জাতীয় খাবার খুব প্রিয় হলেও সাইনাসের সমস্যা থাকলে এসব খাবার এড়িয়ে চলার পরামর্শ দেন বিশেষজ্ঞরা। ঠান্ডা খাবার শরীরে শ্লেষ্মা উৎপাদন বাড়াতে পারে, ফলে নাক বন্ধভাব ও মাথার চাপ বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। বিশেষ করে শীতকালে আইসক্রিম, ঠান্ডা পানীয় বা অতিরিক্ত ঠান্ডা দই সাইনাসের উপসর্গ আরও বাড়িয়ে দিতে পারে। তাই এই সময় উষ্ণ ও সহজপাচ্য খাবার বেছে নেওয়াই ভালো।
চিকিৎসকরা বলেন, ঘরোয়া এসব উপায় মূলত সাইনাসের হালকা উপসর্গে স্বস্তি দিতে পারে। তবে দীর্ঘদিন ধরে যদি মাথাব্যথা, জ্বর, ঘন হলুদ বা সবুজ রঙের সর্দি, চোখের আশপাশে তীব্র ব্যথা বা শ্বাসকষ্ট দেখা দেয়, তাহলে অবশ্যই চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়া প্রয়োজন। কারণ এসব লক্ষণ সংক্রমণজনিত সাইনাসাইটিসের ইঙ্গিত হতে পারে, যার জন্য ওষুধ বা বিশেষ চিকিৎসা দরকার হয়।
শীতকালে সাইনাসের সমস্যা এড়াতে ঘরোয়া উপায়ের পাশাপাশি কিছু সাধারণ সতর্কতা মেনে চলাও জরুরি। ঠান্ডা বাতাস থেকে নিজেকে বাঁচানো, ধুলাবালি এড়িয়ে চলা, পর্যাপ্ত ঘুম এবং নিয়মিত হাত ধোয়ার অভ্যাস সংক্রমণের ঝুঁকি কমাতে সাহায্য করে। একই সঙ্গে মানসিক চাপ কমানো ও সুস্থ জীবনযাপন সাইনাসসহ বিভিন্ন শারীরিক সমস্যার প্রতিরোধে ইতিবাচক ভূমিকা রাখে।
সব মিলিয়ে বলা যায়, শীতকাল মানেই সাইনাসের যন্ত্রণায় ভোগার নিয়তি নয়। সচেতনতা, সঠিক খাদ্যাভ্যাস ও কিছু সহজ ঘরোয়া উপায় মেনে চললে এই কষ্ট অনেকটাই কমানো সম্ভব। নিজের শরীরের সংকেত বুঝে সময়মতো যত্ন নিলে শীতের দিনগুলোও কাটতে পারে অনেক বেশি স্বস্তিতে।