আমলনামা ও তাকদিরে বাঁধা মানুষের জীবনের কোরআনিক দায়িত্ব

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ১৫ জানুয়ারী, ২০২৬
  • ১৬ বার
আমলনামা ও তাকদিরে বাঁধা মানুষের জীবনের কোরআনিক দায়িত্ব

প্রকাশ: ১৫  জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

মানুষের জীবন, কর্ম ও পরিণতি—এই তিনটি বিষয়ের গভীর সম্পর্ক কোরআনুল কারিমে বারবার স্পষ্টভাবে তুলে ধরা হয়েছে। মানুষের জন্ম, জীবনযাপন, সিদ্ধান্ত, সৎকর্ম ও অসৎকর্ম—সবকিছুই আল্লাহ তায়ালার সর্বজ্ঞতা ও নির্ধারিত ব্যবস্থার অন্তর্ভুক্ত। একই সঙ্গে মানুষকে দেওয়া হয়েছে দায়িত্ববোধ, স্বাধীন ইচ্ছাশক্তি ও নৈতিক জবাবদিহি। এই সূক্ষ্ম ভারসাম্যের চিত্র ফুটে উঠেছে সুরা বনি ইসরাঈলের ১৩ নম্বর আয়াতে, যেখানে আল্লাহ তায়ালা মানুষের আমলনামা ও তাকদির সম্পর্কে গভীর সত্য তুলে ধরেছেন।

আল্লাহ তায়ালা বলেন, “প্রত্যেক মানুষের কৃতকর্ম আমি তার গ্রীবালগ্ন করেছি এবং কিয়ামতের দিন আমি তার জন্য বের করব এক কিতাব, যা সে উন্মুক্ত পাবে।” এই আয়াতটি মানুষের জীবনের এমন এক বাস্তবতা তুলে ধরে, যা অস্বীকার করার কোনো সুযোগ নেই। মানুষ পৃথিবীতে যেখানেই থাকুক, যে অবস্থাতেই থাকুক, তার প্রতিটি কাজ তার সঙ্গেই যুক্ত থাকে। কোনো কাজই হারিয়ে যায় না, কোনো কাজই আল্লাহর দৃষ্টির বাইরে নয়।

এই আয়াতে ব্যবহৃত আরবি শব্দ ‘তায়ির’ (طائر) সাধারণভাবে পাখি অর্থে পরিচিত হলেও এখানে তা রূপক অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। তাফসিরকারদের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, এই শব্দের অর্থ দুইভাবে বোঝানো হয়েছে—একটি হলো মানুষের তাকদির বা পূর্বনির্ধারিত ভাগ্য, অন্যটি হলো তার কৃতকর্ম বা আমলনামা। এই দুই অর্থ মিলেই মানুষের জীবনচিত্র সম্পূর্ণ হয়।

প্রথম অর্থ অনুযায়ী, তায়ির দ্বারা বোঝানো হয়েছে মানুষের তাকদির। আল্লাহ তায়ালা প্রতিটি মানুষের জন্য তার জীবনপথ, সুযোগ, পরীক্ষা ও পরিণতি পূর্ব থেকেই নির্ধারণ করে রেখেছেন। মানুষ দুনিয়াতে যা কিছু করে, তা আল্লাহর ইলম ও সিদ্ধান্তের বাইরে নয়। তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—মানুষ জানে না তার তাকদিরে কী লেখা আছে। এই অজ্ঞতাই মানুষের জন্য পরীক্ষার মূল ক্ষেত্র। মানুষ যদি তাকদিরের অজুহাতে ভালো কাজ ছেড়ে দেয়, তবে সে নিজের দায়িত্ব থেকে পালিয়ে যায়। বরং আল্লাহ মানুষকে নির্দেশ দিয়েছেন চেষ্টা করতে, সৎকর্মে অগ্রসর হতে এবং নৈতিকতার পথে অবিচল থাকতে।

ইসলামের দৃষ্টিতে তাকদির বিশ্বাস মানে নিষ্ক্রিয়তা নয়। বরং তাকদিরে বিশ্বাস মানুষকে আরও দায়িত্বশীল করে তোলে। কারণ, আল্লাহ যাকে যে পথে পরিচালিত করতে চান, তার জন্য সেই পথ সহজ করে দেন। যে ব্যক্তি সৎকর্মের জন্য নিজেকে প্রস্তুত রাখে, আল্লাহ তার অন্তরে ভালো কাজের আগ্রহ সৃষ্টি করেন এবং তা বাস্তবায়নের শক্তিও দেন। আর যে ব্যক্তি পাপ ও অন্যায়ের দিকে ঝুঁকে পড়ে, তার জন্য সেই পথও ধীরে ধীরে সহজ হয়ে যায়। এই বাস্তবতাই মানুষের জন্য বড় সতর্কবার্তা।

দুঃখজনকভাবে অনেক মানুষ তাকদিরের নামে অলসতা, গাফিলতি ও পাপকে বৈধতা দেওয়ার চেষ্টা করে। তারা ভালো কাজ করার পরিবর্তে বলে, ‘তাকদিরে যা আছে তাই হবে’। অথচ কোরআনের এই আয়াত স্পষ্ট করে দেয়, মানুষের প্রতিটি কাজ তার নিজের সঙ্গেই যুক্ত। ভালো কাজ করলে তার সুফলও তার সঙ্গেই থাকবে, আর মন্দ কাজের দায়ও তাকেই বহন করতে হবে।

এই আয়াতের দ্বিতীয় অর্থ অনুযায়ী, তায়ির দ্বারা বোঝানো হয়েছে মানুষের আমলনামা। অর্থাৎ মানুষের প্রতিটি কাজ, কথা, চিন্তা ও নিয়ত আল্লাহর নির্দেশে লিপিবদ্ধ হচ্ছে। ফেরেশতারা মানুষের ডান ও বাম পাশে অবস্থান করে তার ভালো ও মন্দ কাজ লিখে রাখছেন। মানুষ যেখানে যায়, যে অবস্থায় থাকে, তার আমলনামা তার সঙ্গেই থাকে। মৃত্যু পর্যন্ত এই লেখা চলতে থাকে। মৃত্যুর পর সেই আমলনামা বন্ধ করে সংরক্ষণ করা হয়।

কিয়ামতের দিন সেই আমলনামাই মানুষের সামনে খুলে দেওয়া হবে। আল্লাহ তায়ালা বলেন, সেদিন মানুষ তার আমলনামা উন্মুক্ত অবস্থায় পাবে। অন্য কারও কাছে নয়, বরং নিজের হাতেই তুলে দেওয়া হবে সেই কিতাব। মানুষ নিজেই তা পড়ে দেখবে এবং নিজের কর্মের বিচার নিজেই উপলব্ধি করবে। সেদিন কোনো অজুহাত থাকবে না, কোনো অস্বীকারের সুযোগ থাকবে না। মানুষ নিজেই বুঝে নেবে সে পুরস্কারের যোগ্য, না শাস্তির।

এই বাস্তবতা মানুষের জীবনে গভীর নৈতিক শিক্ষা দেয়। মানুষ যদি প্রতিদিন মনে রাখে যে তার প্রতিটি কাজ লিখিত হচ্ছে এবং একদিন তাকেই তা পড়তে হবে, তাহলে তার আচরণ, সিদ্ধান্ত ও জীবনযাপন অনেকটাই বদলে যেতে পারে। অন্যায় করার আগে সে ভাববে, এই কাজটি কি আমি কিয়ামতের দিন নিজের আমলনামায় দেখতে চাই? এই আত্মজিজ্ঞাসাই একজন মানুষকে গুনাহ থেকে দূরে রাখার সবচেয়ে শক্তিশালী মাধ্যম।

হাদিসে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এই বিষয়টি আরও স্পষ্ট করে তুলে ধরেছেন। তিনি বলেছেন, আল্লাহ তায়ালা বান্দার প্রতিদিনের সুনির্দিষ্ট কাজের ওপরই তার শেষ পরিণতি নির্ধারণ করেন। যদি কোনো বান্দা নিয়মিত ভালো কাজ করে এবং পরে অসুস্থতা বা অক্ষমতার কারণে তা করতে না পারে, তবে আল্লাহ তার জন্য আগের মতোই সওয়াব লিখে দেন। এই হাদিস মানুষের জন্য আশার বার্তা। আল্লাহ শুধু কাজ নয়, নিয়তকেও গুরুত্ব দেন।

এ থেকে বোঝা যায়, আল্লাহর বিচারব্যবস্থা অত্যন্ত ন্যায়ভিত্তিক ও করুণাময়। মানুষ যদি আন্তরিকভাবে ভালো কাজ করতে চায়, তবে কোনো কারণে তা বাস্তবায়ন করতে না পারলেও সে বঞ্চিত হয় না। আবার কেউ যদি সুযোগ থাকা সত্ত্বেও ভালো কাজ থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়, তবে তার দায়ভার তাকেই বহন করতে হবে।

সুরা বনি ইসরাঈলের এই আয়াত আমাদের মনে করিয়ে দেয়, দুনিয়ার জীবন কোনো খেলাচ্ছল নয়। এটি একটি পরীক্ষাক্ষেত্র, যেখানে প্রতিটি মুহূর্ত মূল্যবান। মানুষ তার কাজের মাধ্যমেই নিজের ভবিষ্যৎ নির্মাণ করে—এই দুনিয়াতে এবং আখিরাতে। তাকদিরে বিশ্বাস রেখে দায়িত্ব এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। বরং তাকদিরে বিশ্বাস মানুষকে সাহসী করে, কারণ সে জানে—চেষ্টা করা তার দায়িত্ব, ফল আল্লাহর হাতে।

আজকের ব্যস্ত ও অস্থির জীবনে এই আয়াত আমাদের জন্য গভীর দিকনির্দেশনা। ক্ষমতা, সম্পদ, খ্যাতি—সবই ক্ষণস্থায়ী। কিন্তু আমলনামায় লেখা কাজ চিরস্থায়ী। একদিন সেই কিতাব খুলবে, যেখানে কোনো সম্পাদনা বা সংশোধনের সুযোগ থাকবে না। সেই দিনের জন্য প্রস্তুতিই হলো প্রকৃত বুদ্ধিমত্তা।

কোরআনের এই বাণী তাই শুধু ধর্মীয় শিক্ষা নয়, বরং মানবজীবনের জন্য এক চিরন্তন নৈতিক ঘোষণা—মানুষ তার কর্মের দায় এড়াতে পারে না, আবার আল্লাহর দয়ার দরজাও তার জন্য সবসময় খোলা থাকে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত