প্রকাশ: ১৫ জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
ভারতের কর্নাটক রাজ্যের ম্যাঙ্গালুরু শহরে ‘বাংলাদেশি’ সন্দেহে এক মুসলিম যুবককে প্রকাশ্যে মারধরের ঘটনা ঘটেছে। হামলার শিকার ব্যক্তির নাম দিলজানি আনসারি। তিনি ঝাড়খণ্ডের বাসিন্দা এবং গত প্রায় ১৫ বছর ধরে প্রতিবছর কিছু মাস শ্রমিকের কাজের জন্য ম্যাঙ্গালুরুতে আসেন। স্থানীয় কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, আনসারি সাধারণত প্রতি বছর চার থেকে ছয় মাস এই শহরে থাকেন এবং কাজের সুযোগ অনুযায়ী বিভিন্ন নির্মাণ ও শ্রম সংক্রান্ত কাজে নিয়োজিত থাকেন।
রোববার সকালে কুলুর এলাকায় আনসারি নিজে পথে যাচ্ছিলেন, তখন চার যুবক তাকে বাধা দেয়। তারা তার পরিচয়পত্র দেখতে চাইলে এবং তাকে ‘বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারী’ বলে অভিযুক্ত করে। দিলজানি তার পরিচয় ভারতের নাগরিক হিসেবে জানানোর চেষ্টা করেন, কিন্তু ওই যুবকরা তার দাবি প্রত্যাখ্যান করে। অভিযোগ, যুবকরা তার মাথায় থাকা কোনো বস্তুর মাধ্যমে আঘাত করলে তিনি গুরুতর আহত হন। হামলার পর স্থানীয় একজন নারী তাকে উদ্ধার করেন। আহত অবস্থায় আতঙ্কিত হয়ে তিনি থানায় অভিযোগ দায়ের না করে বাড়ি ফিরে যান। তবে স্থানীয় নেতাদের মাধ্যমে পরে পুলিশকে বিষয়টি জানানো হয়।
পুলিশ তদন্তে নিশ্চিত হয়েছে যে, দিলজানি আনসারি প্রকৃতপক্ষে ভারতীয় নাগরিক। অভিযুক্তদের নাম সাগর, দানুশ, লালু রথিশ ও মোহন। তারা স্থানীয় এক ডানপন্থি সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত বলে জানা গেছে। চার অভিযুক্তের বিরুদ্ধে হত্যাচেষ্টা এবং অপরাধমূলক ভয় দেখানোর অভিযোগ আনা হয়েছে। পুলিশ জানিয়েছে, এরা এখনো পলাতক।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভারতের হিন্দুত্ববাদী রাজ্যগুলোতে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে মুসলিমদের ওপর নিপীড়ন ও বৈষম্যের মাত্রা ক্রমেই বেড়েছে। কাজের সন্ধানে মুসলিম যুবকরা অন্য রাজ্যে গেলে নানা অজুহাতে তাদের লক্ষ্য করা হচ্ছে। সামাজিক, রাজনৈতিক ও ধর্মীয় কারণে এ ধরনের নির্যাতনের ঘটনা বৃদ্ধি পাওয়ায় ক্ষোভ এবং মানবাধিকারের লঙ্ঘন নিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকগোষ্ঠী উদ্বিগ্ন।
ম্যাঙ্গালুরুতে ঘটেছে এমন হামলা কেবল নিগ্রহ নয়, বরং সামাজিক ভয় ও বিভাজনের প্রতিফলন। স্থানীয় মুসলিম সম্প্রদায়ের কাছে নিরাপত্তাহীনতা বাড়ছে। অনেকেই জানান, কাজ বা শিক্ষা সংক্রান্ত প্রয়োজনে বাইরে গেলে তারা প্রায়ই এ ধরনের শোষণ ও হুমকির মুখোমুখি হন। স্থানীয় ও সামাজিক নেতারা বলছেন, সম্প্রদায়ের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ও নিরাপত্তা এখন ঝুঁকির মধ্যে পড়েছে।
এই ঘটনার প্রেক্ষাপটে স্থানীয় প্রশাসনও সতর্ক হয়েছে। পুলিশ ঘটনাস্থলে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করেছে এবং সন্দেহভাজনদের খুঁজে বের করার চেষ্টা চালাচ্ছে। তবে স্থানীয়রা অভিযোগ করছেন, পুলিশের পদক্ষেপ ততটা কার্যকর হচ্ছে না, কারণ এই ধরনের হামলা ও হুমকির ক্ষেত্রে সামাজিক ও রাজনৈতিক চাপও রয়েছে।
একাধিক মানবাধিকার সংগঠন মনে করাচ্ছে, ধর্ম বা জাতীয়তা অনুযায়ী মানুষকে হেনস্থা করা অত্যন্ত উদ্বেগজনক এবং এর বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। তারা বলছে, শুধু পুলিশি পদক্ষেপ যথেষ্ট নয়, বরং সমাজে সচেতনতা ও শিক্ষা প্রচারও জরুরি। স্থানীয় মুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষদের নিরাপত্তা ও মৌলিক অধিকার রক্ষা করা ভারতের সংবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রের দায়িত্ব।
দিলজানি আনসারির ঘটনায় প্রকাশ্যে যে সহিংসতা দেখা গেছে, তা কেবল ব্যক্তিগত হামলা নয়, বরং সাম্প্রদায়িক দমননীতির অংশ হিসেবে দেখা যাচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, বর্তমান রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিবেশে বাংলাদেশি বা অন্য দেশের নাগরিক বলে সন্দেহ করা মুসলিমদের ওপর হামলার প্রবণতা আরও বেড়ে যেতে পারে। তারা সতর্ক করছেন, এ ধরনের ঘটনা নতুন উদ্দীপনা তৈরি করতে পারে এবং সাম্প্রদায়িক সহিংসতার মাত্রা বৃদ্ধি করতে পারে।
মানবিক দিক থেকে এ ধরনের ঘটনা সামাজিক স্থিতিশীলতার জন্যও হুমকি স্বরূপ। পরিবার, শ্রমজীবী ও স্থানীয় সমাজের নিরাপত্তা প্রভাবিত হচ্ছে। স্থানীয় শিক্ষার্থী ও যুবকরা এসব সহিংস ঘটনার কারণে মানসিক চাপের মধ্যে পড়ছেন। স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরা উদ্বিগ্ন, কারণ এ ধরনের হামলা রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক কাঠামোর দুর্বলতা তুলে ধরে।
এই ঘটনায় স্পষ্ট হয়ে গেছে, শ্রমিক, শিক্ষার্থী ও সাধারণ মুসলিম নাগরিকদের জন্য ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে চলমান সামাজিক নিরাপত্তার অভাব দীর্ঘমেয়াদে প্রভাব ফেলতে পারে। মানবাধিকার সংস্থা ও সামাজিক নেতারা এই ধরনের হামলা প্রতিরোধে শক্তিশালী পদক্ষেপ এবং সচেতনতা বৃদ্ধির আহ্বান জানিয়েছেন।
এ ঘটনায় ভারতের সংবিধান অনুযায়ী মৌলিক অধিকার রক্ষা, সামাজিক সহনশীলতা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা কতটা জরুরি তা আবারও浮রেছে। স্থানীয় ও জাতীয় পর্যায়ের প্রশাসনকে অবিলম্বে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। অন্যথায়, সাধারণ নাগরিকদের ওপর ধর্মীয় ও জাতীয়তাভিত্তিক নিপীড়ন অব্যাহত থাকবে এবং তা সামাজিক অস্থিরতা বৃদ্ধি করবে।