মদ ও মাদক: ইসলাম ও মানবতার কঠোর সতর্কতা

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ১৫ জানুয়ারী, ২০২৬
  • ১০ বার
মদ ও মাদক: ইসলাম ও মানবতার কঠোর সতর্কতা

প্রকাশ: ১৫ জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

বাংলাদেশে মদ ও মাদকবিরোধী পরিস্থিতি এক ভয়াবহ সামাজিক সংকটে পরিণত হয়েছে। প্রতিদিন সংবাদমাধ্যমে বিষাক্ত মদ পানে মৃত্যুর ঘটনা, পারিবারিক ভাঙন, অপরাধ প্রবণতা এবং যুবসমাজের নৈতিক ও মানসিক বিপর্যয়ের সংবাদ প্রকাশিত হচ্ছে। এই বাস্তবতায় দেখা যাচ্ছে যে, মদ ও মাদক কেবল ব্যক্তিগত দোষ নয়, বরং সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার জন্যও মারাত্মক হুমকি। ইসলাম দীর্ঘকাল ধরে এই বিষয়গুলোকে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করেছে। কিন্তু কেন ইসলাম মদ ও মাদককে এত শক্তভাবে তিরস্কার করেছে? এ প্রশ্নের উত্তর শুধু ধর্মীয় নয়; বরং মানবিক, সামাজিক ও বৈজ্ঞানিক যুক্তির আলোকে খুঁজে পাওয়া যায়।

পবিত্র কোরআনে মদ নিষিদ্ধকরণের ধারা একেবারে সরাসরি শুরু হয়নি। বরং ধাপে ধাপে ঘোষণা করা হয়েছে, যা ইসলামের শিক্ষণপ্রক্রিয়ার অনন্য উদাহরণ। প্রথমে মদের ক্ষতির দিকটি ইঙ্গিত করা হয়: মদ ও জুয়ার মধ্যে কিছু উপকার থাকলেও ক্ষতির পরিমাণ অনেক বেশি। পরবর্তী পর্যায়ে ইবাদতের ক্ষতি তুলে ধরে বলা হয়েছে যে, নেশাগ্রস্ত অবস্থায় নামাজ করা যাবে না, যতক্ষণ না ব্যক্তি নিজের ক্রিয়ার স্বচ্ছ ধারণা ফিরে পান। অবশেষে চূড়ান্ত নিষেধাজ্ঞা আসে অত্যন্ত কঠোর ভাষায়—মদকে “শয়তানের অপকর্ম” হিসেবে ঘোষণা করা হয়। এ আয়াতে বলা হয়েছে, মদ, জুয়া, প্রতিমা এবং ভাগ্য নির্ণায়ক তীর—এসব পরিহার করলে মানুষ সফল হবে। মদকে সরাসরি “রিজস” বা নাপাক ঘোষণা করা হয়, যা ইসলামে সর্বোচ্চ স্তরের নিষেধাজ্ঞা।

রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মদের ব্যাপারে এমন ভাষা ব্যবহার করেছেন, যা অন্য পাপের তুলনায় ভিন্ন। হাদিসে মদকে বলা হয়েছে সব অশ্লীলতা ও অনিষ্টের মূল। যে ব্যক্তি দুনিয়ায় মদ পান করেছে এবং তওবা করেনি, সে আখিরাতে তাত্থেকে বঞ্চিত থাকবে। এছাড়া মদ পানকারীর ঈমান সাময়িক হলেও নষ্ট হয়। শুধু পানকারী নয়, ইসলামের দৃষ্টিতে মদ উৎপাদন, সংরক্ষণ, পরিবহন, বিপণন ও ক্রয়—এই পুরো চেইন অপরাধী। আনাস ইবনে মালিক (রা.) হাদিসে বর্ণনা করেছেন যে, মদ তৈরিকারী, বিক্রেতা, পরিবেশক, ক্রেতা—এই চেইনের সকলকে রাসুলুল্লাহ (সা.) অভিশাপ দিয়েছেন। এ নীতিমালা সামাজিক কাঠামোকে লক্ষ্য করে, যেখান থেকে অপরাধ উৎপন্ন হয়।

মদ নিষিদ্ধ হওয়ার পর সাহাবাগণ তা সম্পূর্ণভাবে মেনে চলেছেন। আনাস ইবনে মালিক (রা.) বর্ণনা করেছেন যে, তারা মদের মটকাগুলো রাস্তার ওপর ফেলে দিয়ে তা ধ্বংস করেছেন, কোনো আর্থিক ক্ষতির চিন্তাভাবনা ছাড়াই। ইসলামিক স্কলারগণও একমত যে যেকোনো নেশাজাত দ্রব্য, তরল হোক বা কঠিন, তা হারাম। ইবনে তাইমিয়্যাহ উল্লেখ করেছেন, যে বস্তু মানুষের বুদ্ধি নষ্ট করে, তা মদের অন্তর্ভুক্ত এবং নাম বা রূপ পরিবর্তন করলে হুকুম বদলায় না। তাই আধুনিক ইয়াবা, হেরোইন, কোকেনের মতো ড্রাগস ইসলামের দৃষ্টিতে মদ থেকেও ভয়াবহ।

সমাজবিজ্ঞান ও আধুনিক স্বাস্থ্যবিজ্ঞানের আলোকে দেখা যায়, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) প্রতি বছর ৩০ লক্ষের বেশি মৃত্যুর জন্য মদ্যপান দায়ী বলছে। মদ্যপান পারিবারিক সহিংসতা, ধর্ষণ, সড়ক দুর্ঘটনা, লিভার সিরোসিস, ক্যানসার, মানসিক রোগ এবং আত্মহত্যার ঝুঁকি বাড়ায়। এমিল ডুর্খেইমের Social Disintegration Theory অনুযায়ী, নেশা সামাজিক বন্ধন ধ্বংস করে, ব্যক্তি ও সমাজের মধ্যে নৈতিক সম্পর্ক দুর্বল করে। ইসলাম যে ১৪০০ বছর আগে মদ নিষিদ্ধ করেছে, আধুনিক বিজ্ঞান আজ সেটি “পাবলিক হেলথ ডিজাস্টার” হিসেবে স্বীকৃত করেছে।

বাংলাদেশে মদ ও মাদক শুধু আইনশৃঙ্খলার সমস্যা নয়; এটি পরিবার, যুবসমাজ ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের অস্তিত্বের জন্য হুমকি। ইসলামী দৃষ্টিতে মাদক কারবার দমন ইবাদতের অংশ। নৈতিক শিক্ষা ও পারিবারিক সচেতনতা প্রতিরোধে সবচেয়ে কার্যকর। রাষ্ট্র, সমাজ ও আলেম—সবার সম্মিলিত দায়িত্ব অপরিহার্য। মদ ও মাদক মানুষকে ধীরে ধীরে হত্যা করে—শরীর, বিবেক ও সমাজের মাধ্যমে। তাই ইসলামের দৃষ্টিতে মদ ও মাদক কেবল ধর্মীয় নিষিদ্ধ নয়, বরং সমাজবিধ্বংসী।

মদ ও মাদক কোনো ব্যক্তিগত দুর্বলতার নাম নয়; এটি সংগঠিত সামাজিক অপরাধ। যে সমাজ শুধু পানকারীকে দোষারোপ করে, কিন্তু মদের উৎপাদন ও বাজারজাতকরণে নীরব থাকে, সে প্রকৃত অর্থে অপরাধের অংশীদার। ইসলামের বিধান স্পষ্ট—আক্ল রক্ষা করা, জীবন রক্ষা করা এবং সমাজকে অনাচারমুক্ত রাখা। এই তিনটি বাধ্যতামূলক বিধান পালন করতে ব্যর্থ রাষ্ট্র ও সমাজ দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি পায় না।

আজ বাংলাদেশের বাস্তবতায় মদ ও মাদকবিরোধী অবস্থান মানে শুধু ধর্মীয় আনুগত্য নয়; এটি মানবতার পক্ষে দাঁড়ানো, ভবিষ্যৎ প্রজন্ম রক্ষা করা এবং রাষ্ট্রীয় বিবেক জাগ্রত করার সংগ্রাম। যদি আইন, প্রশাসন, আলেম, গণমাধ্যম এবং পরিবার নিজেদের দায়িত্ব পালনে সচেতন হয়, তবে এই নীরব বিষের স্রোত থামানো সম্ভব। শেষ পর্যন্ত প্রশ্ন একটাই—আমরা কি শুধু মৃতের সংখ্যা গুনব, নাকি মৃত্যুর কারখানা বন্ধ করার সাহস দেখাব? কোরআন ও হাদিস আমাদের পথ দেখিয়েছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত