প্রকাশ: ২১ জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
আধুনিক জীবনযাত্রার ব্যস্ততা, অনিয়ম আর মানসিক চাপের মধ্যে শরীরের ভেতরে নীরবে বাসা বাঁধছে নানা হরমোনজনিত সমস্যা। ডায়াবেটিসের পাশাপাশি যেটি এখন ঘরে ঘরে পরিচিত রোগ হিসেবে দেখা দিচ্ছে, তা হলো থাইরয়েডের সমস্যা। অনেকেই বুঝতেই পারেন না, দৈনন্দিন জীবনযাপনের কিছু সাধারণ ভুল অভ্যাসই ধীরে ধীরে এই জটিল সমস্যার দিকে ঠেলে দিচ্ছে শরীরকে। সচেতনতার অভাবের কারণে শুরুতে উপসর্গ ধরা না পড়লেও একসময় তা গুরুতর আকার নিতে পারে।
মানবদেহের গলার সামনের অংশে অবস্থিত থাইরয়েড গ্রন্থি থেকে নিঃসৃত থাইরক্সিন হরমোন শরীরের বিপাকক্রিয়া নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। হৃদ্স্পন্দন স্বাভাবিক রাখা, রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ, শরীরের তাপমাত্রা ঠিক রাখা, ওজনের ভারসাম্য বজায় রাখা—সবকিছুতেই এই হরমোনের প্রভাব রয়েছে। থাইরক্সিনের নিঃসরণ বেশি হলে হাইপারথাইরয়েডিজম এবং কম হলে হাইপোথাইরয়েডিজম দেখা দেয়। কারো ক্ষেত্রে হঠাৎ ওজন বেড়ে যায়, আবার কারো ওজন অস্বাভাবিকভাবে কমে যেতে পারে। ক্লান্তি, অবসাদ, অকারণ উদ্বেগ, বুক ধড়ফড়ানি, ঠান্ডা সহ্য না হওয়া, চুল পড়া বা ত্বক শুষ্ক হয়ে যাওয়ার মতো উপসর্গ অনেক সময় থাইরয়েডের সমস্যারই ইঙ্গিত দেয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, থাইরয়েডের সমস্যার পেছনে বংশগত কারণ যেমন রয়েছে, তেমনি জীবনযাপনের ভুল অভ্যাসও বড় ভূমিকা পালন করে। তার মধ্যে অন্যতম হলো পর্যাপ্ত ঘুমের অভাব। বর্তমান সময়ে পড়াশোনা, অফিসের কাজ, রাত জাগা কিংবা অতিরিক্ত মোবাইল ও স্ক্রিন ব্যবহারের কারণে অনেকেই নিয়মিত সাত থেকে আট ঘণ্টা ঘুমাতে পারেন না। দীর্ঘদিন ঘুমের ঘাটতি হলে শরীর ঠিকমতো বিশ্রাম পায় না, ফলে হরমোন নিঃসরণে ব্যাঘাত ঘটে। চিকিৎসকদের ভাষ্য অনুযায়ী, নিয়মিত কম ঘুম থাইরক্সিন হরমোনের মাত্রা কমিয়ে দিতে পারে, যা ধীরে ধীরে থাইরয়েড গ্রন্থির কার্যকারিতা দুর্বল করে তোলে।
দুশ্চিন্তা ও মানসিক চাপও থাইরয়েড সমস্যার একটি বড় কারণ হিসেবে বিবেচিত। আধুনিক জীবনে মানসিক চাপ এড়ানো কঠিন হলেও দীর্ঘস্থায়ী উদ্বেগ শরীরের হরমোন ব্যবস্থাকে মারাত্মকভাবে প্রভাবিত করে। অতিরিক্ত চাপের ফলে কর্টিসল নামক স্ট্রেস হরমোন বেড়ে যায়, যা থাইরয়েড হরমোনের স্বাভাবিক কাজকে ব্যাহত করতে পারে। সাময়িক চাপ শরীর অনেক সময় সামলে নিতে পারলেও, দীর্ঘদিন ধরে চলতে থাকলে তা থাইরয়েডের ভারসাম্য নষ্ট করে দেয়। নিয়মিত ব্যায়াম, ধ্যান, প্রাণায়াম কিংবা পছন্দের কাজে সময় কাটানো মানসিক চাপ কমাতে সহায়ক হতে পারে।
খাদ্যাভ্যাসের অনিয়মও থাইরয়েড সমস্যাকে উসকে দেয়। অনেকেই ওজন কমানোর তাগিদে চিকিৎসক বা পুষ্টিবিদের পরামর্শ ছাড়াই কড়া ডায়েট অনুসরণ করেন। দীর্ঘ সময় না খেয়ে থাকা, প্রয়োজনের তুলনায় খুব কম ক্যালরি গ্রহণ বা পুষ্টিহীন খাবার খাওয়ার ফলে শরীর প্রয়োজনীয় শক্তি পায় না। দিনে এক হাজার ক্যালরির কম খাবার গ্রহণ করলে শরীর বিপাকক্রিয়া ধীর করে দেয়, যার সরাসরি প্রভাব পড়ে থাইরয়েড গ্রন্থির ওপর। ফলে হরমোন নিঃসরণে ভারসাম্যহীনতা দেখা দিতে পারে। বিশেষজ্ঞরা বলেন, থাইরয়েড সুস্থ রাখতে সুষম খাদ্য গ্রহণ অত্যন্ত জরুরি।
বর্তমান সময়ে সাপ্লিমেন্ট ব্যবহারের প্রবণতাও বেড়েছে। ওজন কমানো, শরীর ফিট রাখা কিংবা পেশি গঠনের আশায় অনেকেই চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া বিভিন্ন সাপ্লিমেন্ট গ্রহণ করছেন। কিন্তু সব সাপ্লিমেন্ট সবার শরীরের জন্য উপযোগী নয়। অনিয়ন্ত্রিতভাবে সাপ্লিমেন্ট গ্রহণ করলে শরীরের স্বাভাবিক হরমোন কার্যপ্রক্রিয়ায় বিঘ্ন ঘটতে পারে। বিশেষ করে কিছু সাপ্লিমেন্টে থাকা অতিরিক্ত আয়োডিন বা হরমোনজাত উপাদান থাইরয়েডের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। তাই সাপ্লিমেন্ট গ্রহণের আগে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়ার ওপর জোর দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা।
শরীরচর্চার অভাবও পরোক্ষভাবে থাইরয়েড সমস্যার ঝুঁকি বাড়ায়। ব্যস্ত জীবনে অনেকেই নিয়মিত ব্যায়ামের সময় বের করতে পারেন না। কিন্তু শরীরচর্চা শুধু ওজন নিয়ন্ত্রণেই নয়, হরমোনের ভারসাম্য বজায় রাখতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। নিয়মিত হাঁটা, হালকা ব্যায়াম বা যোগব্যায়াম শরীরের বিপাকক্রিয়া সক্রিয় রাখে এবং থাইরয়েড গ্রন্থিকে সুস্থ রাখতে সহায়তা করে। দীর্ঘদিন শারীরিক নিষ্ক্রিয়তায় ভুগলে হরমোনের কার্যকারিতা ধীর হয়ে যেতে পারে।
চিকিৎসকদের মতে, থাইরয়েড সমস্যার সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হলো উপসর্গগুলোকে অবহেলা করা। অনেকেই ক্লান্তি বা ওজন পরিবর্তনকে সাধারণ বিষয় ভেবে গুরুত্ব দেন না। কিন্তু সময়মতো পরীক্ষা ও চিকিৎসা না হলে সমস্যা জটিল আকার ধারণ করতে পারে। নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা, বিশেষ করে যাদের পরিবারে থাইরয়েডের ইতিহাস রয়েছে, তাদের জন্য অত্যন্ত জরুরি।
সব মিলিয়ে বলা যায়, থাইরয়েডের সমস্যা একদিনে তৈরি হয় না। এটি ধীরে ধীরে গড়ে ওঠে আমাদের দৈনন্দিন অভ্যাসের ফল হিসেবে। পর্যাপ্ত ঘুম, মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণ, সুষম খাদ্যাভ্যাস, নিয়মিত শরীরচর্চা এবং চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া ওষুধ বা সাপ্লিমেন্ট না নেওয়ার মতো সাধারণ অভ্যাসই থাইরয়েডকে সুস্থ রাখতে বড় ভূমিকা রাখতে পারে। সচেতন জীবনযাপনই পারে এই নীরব রোগের ঝুঁকি অনেকটাই কমিয়ে আনতে।