প্রকাশ: ২৮ জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
দৈনন্দিন জীবনের ছুটে চলা গতি, কাজের চাপ, সময়মতো বিশ্রাম না পাওয়া—সব মিলিয়ে আধুনিক মানুষের জীবনে মানসিক চাপ এখন নিত্যসঙ্গী। অফিসের কাজ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পড়াশোনা, পারিবারিক দায়িত্ব কিংবা আর্থিক দুশ্চিন্তা—সবকিছু একসঙ্গে সামলাতে গিয়ে শরীর ও মন অনেক সময়ই ক্লান্ত হয়ে পড়ে। এই ক্লান্তি কাটাতে অনেকেই কফি, সফট ড্রিংকস কিংবা নানা ধরনের এনার্জি ড্রিঙ্কসের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েন। সাময়িকভাবে এগুলো কিছুটা চাঙা ভাব দিলেও অতিরিক্ত ক্যাফেইন ও চিনি দীর্ঘমেয়াদে শরীরের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে। ঠিক এই জায়গাতেই প্রাকৃতিক ও ভেষজ পানীয় হিসেবে রোজেলা চা ধীরে ধীরে স্বাস্থ্যসচেতন মানুষের কাছে জনপ্রিয় হয়ে উঠছে।
রোজেলা ফলকে আমাদের দেশে কেউ চুকাই, কেউ মেস্তা বা টক ফল নামে চেনে। মূলত রোজেলা গাছের ফুল শুকিয়ে যে ভেষজ চা তৈরি করা হয়, সেটিই রোজেলা চা। উজ্জ্বল লালচে রং, হালকা টক-মিষ্টি স্বাদ আর সুগন্ধি ঘ্রাণ এই চায়ের প্রধান বৈশিষ্ট্য। আফ্রিকা, এশিয়া ও লাতিন আমেরিকার বিভিন্ন দেশে বহু বছর ধরেই রোজেলা ফুল দিয়ে তৈরি চা ও পানীয় জনপ্রিয়। সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশেও এই চা স্বাস্থ্যপ্রেমীদের মধ্যে জায়গা করে নিচ্ছে, বিশেষ করে মানসিক চাপ কমানো ও স্বস্তি আনার প্রাকৃতিক উপায় হিসেবে।
পুষ্টিবিদদের মতে, রোজেলা চায়ের অন্যতম বড় গুণ হলো এর অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট সমৃদ্ধ গঠন। রোজেলা ফুলে প্রচুর পরিমাণে অ্যান্থোসায়ানিন ও ভিটামিন সি থাকে, যা শরীরের কোষকে ক্ষতিকর ফ্রি র্যাডিক্যালের আক্রমণ থেকে রক্ষা করে। প্রতিদিনের মানসিক চাপ ও শারীরিক ক্লান্তির ফলে শরীরে যে টক্সিন জমে, সেগুলো বের করে দিতে এই অ্যান্টি-অক্সিডেন্টগুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ফলে শরীরে এক ধরনের হালকা ভাব আসে, ক্লান্তি কমে এবং কর্মক্ষমতা বাড়ে।
মানসিক চাপের সঙ্গে আমাদের শরীরের একটি গুরুত্বপূর্ণ হরমোন সরাসরি জড়িত, যার নাম কর্টিসল। অতিরিক্ত মানসিক চাপের সময় এই স্ট্রেস হরমোনের মাত্রা বেড়ে যায়, যা দীর্ঘদিন ধরে চলতে থাকলে উদ্বেগ, অবসাদ ও অনিদ্রার মতো সমস্যার সৃষ্টি করতে পারে। গবেষণা ও অভিজ্ঞতার আলোকে পুষ্টিবিদরা বলছেন, রোজেলা চা প্রাকৃতিকভাবে কর্টিসলের মাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখতে সহায়তা করে। নিয়মিত এক বা দুই কাপ রোজেলা চা পান করলে স্নায়ুতন্ত্র ধীরে ধীরে শান্ত হয়, দুশ্চিন্তার মাত্রা কমে এবং মন প্রশান্তি পায়।
শুধু মানসিক স্বস্তিই নয়, রোজেলা চা রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণেও সহায়ক। উচ্চ রক্তচাপের কারণে অনেকের মাথা ভার হয়ে যায়, সহজেই ক্লান্তি চলে আসে এবং মনোযোগে ঘাটতি দেখা দেয়। রোজেলা চা রক্তনালীগুলোকে শিথিল করতে সাহায্য করে, যার ফলে রক্ত চলাচল স্বাভাবিক থাকে এবং রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে আসে। রক্তচাপ স্থিতিশীল থাকলে শরীর ও মন উভয়ই বেশি স্বস্তিতে থাকে, কাজের মাঝেও ক্লান্তি কম অনুভূত হয়।
দিনভর কাজের চাপের পর ভালো ঘুম না হলে পরদিন মানসিক চাপ আরও বেড়ে যায়। অনিদ্রা বা অস্থির ঘুম আজকাল অনেকেরই পরিচিত সমস্যা। এই ক্ষেত্রেও রোজেলা চা হতে পারে এক সহজ ও প্রাকৃতিক সমাধান। দিন শেষে, বিশেষ করে রাতে ঘুমানোর আগে এক কাপ উষ্ণ রোজেলা চা মস্তিষ্ক ও স্নায়ুকে ধীরে ধীরে শান্ত করে। এর ফলে ঘুম সহজে আসে, ঘুমের গভীরতা বাড়ে এবং সকালে ঘুম থেকে উঠে শরীর ও মন দুটোই সতেজ অনুভূত হয়।
রোজেলা চায়ের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো এতে প্রাকৃতিকভাবে ক্যাফেইন নেই। ফলে কফি বা চায়ের মতো এটি হৃদস্পন্দন বাড়ায় না কিংবা অস্থিরতা তৈরি করে না। যারা ক্যাফেইনের প্রতি সংবেদনশীল, তাদের জন্য এটি একটি নিরাপদ বিকল্প। একই সঙ্গে রোজেলা চায়ের টক-মিষ্টি স্বাদ মুখে এক ধরনের সতেজ অনুভূতি এনে দেয়, যা মানসিকভাবে ভালো লাগার অনুভূতি সৃষ্টি করে।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, রোজেলা চা কোনো ওষুধ নয়, বরং এটি একটি সহায়ক ভেষজ পানীয়। মানসিক চাপ কমাতে নিয়মিত ব্যায়াম, সঠিক ঘুম, সুষম খাদ্যাভ্যাস ও ইতিবাচক জীবনযাপন যেমন প্রয়োজন, তেমনি রোজেলা চা সেই প্রক্রিয়াকে আরও সহজ ও আনন্দদায়ক করতে পারে। অফিসের বিরতিতে বা বিকেলের ক্লান্ত সময়ে এক কাপ রোজেলা চা শরীর ও মনের ওপর আলাদা এক প্রশান্তির প্রভাব ফেলতে পারে।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে রোজেলা চা আরও জনপ্রিয় হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে, কারণ এটি প্রাকৃতিক, তুলনামূলকভাবে সাশ্রয়ী এবং সহজলভ্য। গ্রামীণ এলাকাতেও রোজেলা বা মেস্তা গাছ দেখা যায়, যা থেকে স্থানীয়ভাবে এই চা প্রস্তুত করা সম্ভব। ফলে এটি শুধু স্বাস্থ্য সচেতনতার অংশই নয়, বরং ভবিষ্যতে একটি সম্ভাবনাময় ভেষজ পণ্য হিসেবেও জায়গা করে নিতে পারে।
সব মিলিয়ে বলা যায়, মানসিক চাপ ও ক্লান্তি কমাতে রোজেলা চা হতে পারে একটি নিরাপদ ও প্রাকৃতিক সহচর। আধুনিক জীবনের দৌড়ঝাঁপের মধ্যে নিজের জন্য একটু প্রশান্তির সময় বের করা যেমন জরুরি, তেমনি সেই সময়টাকে স্বাস্থ্যকর করে তুলতে রোজেলা চা একটি সহজ কিন্তু কার্যকর পছন্দ হতে পারে। নিয়মিত অভ্যাসে এই লালচে চা শুধু শরীরকে চাঙা করে না, মনকেও দেয় প্রয়োজনীয় শান্তি ও ভারসাম্য।