প্রকাশ: ৩০ জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
বার্ধক্য জীবনের অনিবার্য সত্য—এ কথা সবাই জানেন। তবে বয়স বাড়লেও তার ছাপ যেন সময়ের আগেই মুখে-চোখে ধরা না পড়ে, সে প্রত্যাশা থাকে সবারই। একসময় চল্লিশের কোঠায় পৌঁছানোর আগে ত্বকের বলিরেখা, শুষ্কতা বা উজ্জ্বলতা কমে যাওয়ার মতো সমস্যা খুব একটা চোখে পড়ত না। কিন্তু আধুনিক জীবনযাপন, অনিয়মিত খাদ্যাভ্যাস, ঘুমের ঘাটতি, অতিরিক্ত মানসিক চাপ, পরিবেশ দূষণ ও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব এখন অল্প বয়সেই ত্বকে বয়সের ছাপ ফেলে দিচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ত্বকের তারুণ্য অনেকটাই নির্ভর করে আমাদের প্রতিদিনের অভ্যাসের ওপর। যত দামি প্রসাধনীই ব্যবহার করা হোক না কেন, জীবনযাপনের ভেতরে শৃঙ্খলা না থাকলে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া কঠিন। তাই চল্লিশের পরেও ত্বক টানটান, সতেজ ও উজ্জ্বল রাখতে চাইলে কিছু সহজ কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ অভ্যাস নিয়মিত অনুসরণ করা জরুরি।
ত্বকের সুস্থতার প্রথম শর্ত হলো শরীরের ভেতর থেকে পর্যাপ্ত আর্দ্রতা নিশ্চিত করা। দিনের পর দিন কম পানি পান করলে তার প্রভাব সবার আগে পড়ে ত্বকে। ত্বক হয়ে ওঠে শুষ্ক, নিষ্প্রভ এবং বলিরেখা দ্রুত স্পষ্ট হয়। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, সকালে ঘুম থেকে ওঠার পর এক থেকে দুই গ্লাস পানি পান করলে শরীরের বিপাকক্রিয়া সক্রিয় হয় এবং রাতভর জমে থাকা টক্সিন বেরিয়ে যেতে সাহায্য করে। নিয়মিত পর্যাপ্ত পানি পান করলে ত্বকের কোষগুলো ভেতর থেকে আর্দ্রতা পায়, রক্ত সঞ্চালন ভালো হয় এবং স্বাভাবিক উজ্জ্বলতা বজায় থাকে। বয়স চল্লিশ পেরোলেও যারা নিয়ম করে পানি পান করেন, তাদের ত্বকে বয়সের ছাপ তুলনামূলকভাবে দেরিতে দেখা যায়—এমন তথ্যও উঠে এসেছে বিভিন্ন গবেষণায়।
শারীরিক ও মানসিক সুস্থতা ত্বকের তারুণ্যের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। নিয়মিত শরীরচর্চা শুধু ওজন নিয়ন্ত্রণ বা হৃদ্স্বাস্থ্যের জন্যই নয়, ত্বকের জন্যও অত্যন্ত উপকারী। ব্যায়াম করলে শরীরে রক্ত চলাচল বাড়ে, যার ফলে ত্বকের কোষে অক্সিজেন ও প্রয়োজনীয় পুষ্টি উপাদান সহজে পৌঁছায়। এর সঙ্গে যদি প্রতিদিন কিছু সময় ধ্যান বা মেডিটেশন করা যায়, তাহলে মানসিক চাপ অনেকটাই কমে। মানসিক চাপ বাড়লে শরীরে কর্টিসল নামক হরমোনের নিঃসরণ বেড়ে যায়, যা ত্বকের কোলাজেন ভেঙে দেয় এবং দ্রুত বার্ধক্যের লক্ষণ তৈরি করে। তাই নিয়মিত ব্যায়াম ও ধ্যানের মাধ্যমে শরীর ও মন দুটোই সুস্থ রাখা গেলে ত্বকও তারুণ্য ধরে রাখতে সক্ষম হয়।
ত্বকের যত্নে সকালের রুটিন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, অথচ অনেকেই বিষয়টি অবহেলা করেন। রাতের বেলা ঘুমের সময় ত্বকে তেল, ঘাম ও ধুলাবালি জমে রোমকূপ বন্ধ হয়ে যেতে পারে। সকালে ঘুম থেকে উঠে সঠিকভাবে মুখ পরিষ্কার না করলে এসব ময়লা ত্বকে থেকে যায়, যা ব্রণ, ব্ল্যাকহেড এবং ত্বকের নিস্তেজ ভাব বাড়িয়ে তোলে। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ত্বকের স্বাভাবিক পুনর্গঠনের ক্ষমতাও কমে আসে, তাই পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা আরও বেশি জরুরি হয়ে ওঠে। ত্বকের ধরন অনুযায়ী একটি উপযুক্ত ফেসওয়াশ দিয়ে প্রতিদিন সকালে মুখ পরিষ্কার করলে রোমকূপ খোলা থাকে, ত্বক শ্বাস নিতে পারে এবং সারাদিনের জন্য একটি সতেজ অনুভূতি তৈরি হয়। এর ফলে ত্বক দীর্ঘদিন টানটান ও উজ্জ্বল থাকে।
খাদ্যাভ্যাস ত্বকের সৌন্দর্যের অন্যতম প্রধান নিয়ামক। চল্লিশের পর শরীরের বিপাকক্রিয়া ধীর হয়ে আসে, ফলে ভুল খাদ্যাভ্যাসের প্রভাব ত্বকে দ্রুত পড়তে শুরু করে। ফাস্ট ফুড, অতিরিক্ত লবণ, চিনি ও প্রসেসড খাবার শরীরে প্রদাহ বাড়ায়, যা ত্বকের কোষের ক্ষতি করে এবং অকাল বার্ধক্যের ঝুঁকি বাড়ায়। নিয়মিত এসব খাবার গ্রহণ করলে ত্বক তার স্বাভাবিক উজ্জ্বলতা হারায়, শুষ্কতা ও বলিরেখা দেখা দেয়। বিপরীতে, তাজা ফল, শাকসবজি, পর্যাপ্ত প্রোটিন ও স্বাস্থ্যকর চর্বি ত্বকের কোলাজেন উৎপাদনে সহায়তা করে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যারা খাদ্যতালিকায় সচেতন পরিবর্তন আনেন, তাদের ক্ষেত্রে বয়সের সঙ্গে ত্বকের অবনতি অনেকটাই ধীর হয়।
মানসিক চাপ ও ক্ষতিকর অভ্যাস ত্বকের সবচেয়ে বড় শত্রু। দুশ্চিন্তা, উদ্বেগ ও দীর্ঘস্থায়ী মানসিক চাপ শুধু মনকেই ক্লান্ত করে না, ত্বককেও দ্রুত বুড়িয়ে দেয়। চাপের ফলে ত্বকে রক্ত প্রবাহ কমে যায়, কোষ পুনর্গঠন বাধাগ্রস্ত হয় এবং উজ্জ্বলতা নষ্ট হয়। এর পাশাপাশি ধূমপান ও অ্যালকোহলের মতো নেশাজাতীয় অভ্যাস ত্বকের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। ধূমপান ত্বকের রক্তনালিকে সংকুচিত করে, ফলে ত্বকে অক্সিজেন ও পুষ্টির ঘাটতি তৈরি হয়। অ্যালকোহল শরীরকে পানিশূন্য করে, যার সরাসরি প্রভাব পড়ে ত্বকের আর্দ্রতায়। এসব অভ্যাস দীর্ঘদিন ধরে চলতে থাকলে বলিরেখা, ঝুলে যাওয়া ত্বক ও অকাল বার্ধক্য অনিবার্য হয়ে ওঠে।
চিকিৎসক ও ত্বক বিশেষজ্ঞদের মতে, চল্লিশের পর ত্বক ভালো রাখতে কোনো জাদুকরী সমাধান নেই। বরং প্রতিদিনের ছোট ছোট অভ্যাসই বড় পরিবর্তন এনে দিতে পারে। পর্যাপ্ত পানি পান, নিয়মিত ব্যায়াম ও ধ্যান, সঠিক ত্বক পরিচর্যা, স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস এবং মানসিক চাপ ও নেশা থেকে দূরে থাকা—এই বিষয়গুলো একসঙ্গে অনুসরণ করলে বয়সের ছাপ অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব। জীবনের এই পর্যায়ে নিজের যত্ন নেওয়া মানে শুধু সৌন্দর্য নয়, বরং সামগ্রিক সুস্থতার দিকেও গুরুত্ব দেওয়া।
বিশেষজ্ঞদের ভাষায়, বয়স বাড়া মানেই সৌন্দর্য হারানো নয়। বরং বয়সের সঙ্গে সঙ্গে পরিণত সৌন্দর্য ও আত্মবিশ্বাস ফুটে ওঠে। সঠিক অভ্যাসের মাধ্যমে সেই সৌন্দর্যকে দীর্ঘদিন ধরে রাখা সম্ভব। তাই আজ থেকেই জীবনযাপনে ছোট পরিবর্তন আনলে, চল্লিশ পেরিয়েও আয়নায় তাকিয়ে নিজের টানটান, উজ্জ্বল ত্বক দেখে তৃপ্তির হাসি ফুটতেই পারে।