প্রকাশ: ০৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটকে ঘিরে নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলা ব্যবস্থাপনায় গুরুত্বপূর্ণ একটি সিদ্ধান্ত থেকে সরে এলো নির্বাচন কমিশন। ভোটকেন্দ্রে বাংলাদেশ ন্যাশনাল ক্যাডেট কোরের সদস্যদের মোতায়েনের পূর্বের সিদ্ধান্ত বাতিল করেছে নির্বাচন কমিশন। সংশোধিত এই সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, নির্বাচনের দিন আর সরাসরি ভোটকেন্দ্রে বিএনসিসি ক্যাডেটরা দায়িত্ব পালন করবেন না। তবে নির্বাচন কার্যক্রমের একটি নির্দিষ্ট অংশে সীমিত পরিসরে তাদের সম্পৃক্ততা রাখা হয়েছে।
মঙ্গলবার ৩ ফেব্রুয়ারি নির্বাচন কমিশনের উপসচিব মোহাম্মদ মনির হোসেনের সই করা একটি সংশোধিত নির্দেশনার মাধ্যমে এই তথ্য জানানো হয়। নির্দেশনাটি দেশের সব রিটার্নিং কর্মকর্তার কাছে পাঠানো হয়েছে। এতে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে যে, আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিতব্য জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট উপলক্ষে ভোটকেন্দ্রে শৃঙ্খলা রক্ষার কাজে বিএনসিসি মোতায়েনের সিদ্ধান্ত কার্যকর থাকবে না।
এর আগে নির্বাচন কমিশনের প্রাথমিক নির্দেশনায় ভোটকেন্দ্রে আইনশৃঙ্খলা ও সহায়ক কার্যক্রমে বিএনসিসি ক্যাডেটদের ব্যবহার করার বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত ছিল। এই সিদ্ধান্ত সামনে আসার পর রাজনৈতিক অঙ্গন এবং বিভিন্ন মহলে আলোচনা ও সমালোচনা শুরু হয়। বিশেষ করে নির্বাচনী পরিবেশে শিক্ষার্থী ও প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ক্যাডেটদের উপস্থিতি কতটা যৌক্তিক এবং আইনগতভাবে গ্রহণযোগ্য, তা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। এমন প্রেক্ষাপটেই নির্বাচন কমিশন তাদের অবস্থান পুনর্বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করেছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
সংশোধিত নির্দেশনায় বলা হয়েছে, ভোটগ্রহণের দিন কেন্দ্রভিত্তিক দায়িত্বে নয়, বরং রিটার্নিং কর্মকর্তার কার্যালয়ে স্থাপিত আইটি সাপোর্টেড পোস্টাল ব্যালট গণনা কেন্দ্রে বিএনসিসি ক্যাডেটরা দায়িত্ব পালন করবেন। এই কেন্দ্রগুলোতে ওসিভি এবং আইসিপিভি পদ্ধতিতে প্রাপ্ত পোস্টাল ব্যালট গণনার সময় শৃঙ্খলা বজায় রাখা এবং প্রশাসনিক কাজে সহায়তা করাই হবে তাদের মূল দায়িত্ব। অর্থাৎ ভোটারদের সঙ্গে সরাসরি কোনো যোগাযোগ বা ভোটকেন্দ্রের অভ্যন্তরীণ কার্যক্রমে তারা যুক্ত থাকবেন না।
নির্বাচন কমিশন সূত্রে জানা গেছে, পোস্টাল ব্যালট গণনা একটি সংবেদনশীল ও প্রযুক্তিনির্ভর প্রক্রিয়া হওয়ায় সেখানে সহায়ক জনবল প্রয়োজন হয়। ক্যাডেটদের শৃঙ্খলা, সময়ানুবর্তিতা এবং প্রশিক্ষণকে বিবেচনায় রেখে এই নির্দিষ্ট দায়িত্বে তাদের রাখার সিদ্ধান্ত বহাল রাখা হয়েছে। তবে ভোটকেন্দ্রের পরিবেশ যাতে কোনোভাবেই প্রশ্নবিদ্ধ না হয়, সে কারণেই আগের সিদ্ধান্ত সংশোধন করা হয়েছে।
এই সিদ্ধান্ত পরিবর্তনের পর রাজনৈতিক অঙ্গনে ভিন্ন ভিন্ন প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। নির্বাচন পর্যবেক্ষকদের একটি অংশ মনে করছেন, ভোটকেন্দ্রে বিএনসিসি মোতায়েন না করার সিদ্ধান্ত নির্বাচন কমিশনের জন্য একটি বাস্তবসম্মত ও সময়োপযোগী পদক্ষেপ। তাদের মতে, নির্বাচন যত বেশি বেসামরিক ও রাজনৈতিকভাবে নিরপেক্ষ থাকবে, ভোটারদের আস্থা তত বাড়বে। শিক্ষার্থী বা ক্যাডেটদের সরাসরি ভোটকেন্দ্রে দায়িত্ব দেওয়া হলে তা নিয়ে বিভ্রান্তি ও অপ্রয়োজনীয় বিতর্ক তৈরি হওয়ার আশঙ্কা ছিল।
অন্যদিকে কেউ কেউ বলছেন, বিএনসিসি একটি শৃঙ্খলাবদ্ধ বাহিনী হওয়ায় সহায়ক শক্তি হিসেবে তাদের ব্যবহার নিয়ে আপত্তির তেমন সুযোগ ছিল না। তবে নির্বাচন কমিশন যেহেতু শেষ পর্যন্ত সংশোধিত সিদ্ধান্ত নিয়েছে, তাই বিষয়টি এখন অনেকটাই নিষ্পত্তির দিকে গেছে বলে মনে করছেন তারা।
নির্বাচন কমিশনের দায়িত্বশীল একটি সূত্র জানিয়েছে, নির্বাচন ব্যবস্থাপনায় প্রতিটি সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে জনমত, রাজনৈতিক বাস্তবতা এবং আইনগত দিক বিবেচনায় রাখা হচ্ছে। কমিশনের লক্ষ্য হচ্ছে একটি গ্রহণযোগ্য, শান্তিপূর্ণ এবং সুষ্ঠু নির্বাচন আয়োজন করা। সেই লক্ষ্যেই প্রয়োজনে আগের সিদ্ধান্ত সংশোধন করতেও তারা পিছপা হচ্ছে না।
ভোটকেন্দ্রের নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলা রক্ষায় এবারও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য, আনসার ও ভিডিপি এবং প্রশাসনের নির্ধারিত কর্মীরা দায়িত্ব পালন করবেন। নির্বাচন কমিশন জানিয়েছে, প্রতিটি কেন্দ্রে পর্যাপ্ত নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে একটি সমন্বিত পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এর সঙ্গে প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানো হয়েছে, যাতে ভোটগ্রহণ ও ফলাফল ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা যায়।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে এমনিতেই রাজনৈতিক উত্তাপ বিরাজ করছে। এর সঙ্গে একই দিনে গণভোট অনুষ্ঠিত হওয়ায় প্রশাসনিক ও সাংগঠনিক চাপ বেড়েছে বহুগুণ। এই প্রেক্ষাপটে ভোটের প্রতিটি ধাপ নিয়ে কমিশন বাড়তি সতর্কতা অবলম্বন করছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। বিএনসিসি মোতায়েনের সিদ্ধান্ত বাতিল সেই সতর্কতারই একটি অংশ বলে ব্যাখ্যা করছেন অনেকে।
নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় ক্যাডেটদের সম্পৃক্ততা নিয়ে অতীতেও আলোচনা হয়েছে। বিভিন্ন সময়ে জাতীয় অনুষ্ঠান, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কিংবা সামাজিক সচেতনতামূলক কার্যক্রমে বিএনসিসি সদস্যদের ভূমিকা প্রশংসিত হলেও সরাসরি রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় তাদের অংশগ্রহণ নিয়ে সবসময়ই সংবেদনশীলতা কাজ করে। নির্বাচন কমিশনের সাম্প্রতিক সিদ্ধান্ত সেই সংবেদনশীলতার প্রতিফলন হিসেবেই দেখা হচ্ছে।
রিটার্নিং কর্মকর্তাদের পাঠানো চিঠিতে আরও বলা হয়েছে, পোস্টাল ব্যালট গণনা কেন্দ্রের বাইরে অন্য কোনো নির্বাচনী কার্যক্রমে বিএনসিসি সদস্যদের ব্যবহার করা যাবে না। নির্দেশনা যথাযথভাবে অনুসরণ করার জন্য সংশ্লিষ্ট সবাইকে বলা হয়েছে। কোনো ধরনের বিভ্রান্তি বা ব্যত্যয় হলে তাৎক্ষণিকভাবে কমিশনকে অবহিত করার কথাও উল্লেখ রয়েছে।
নির্বাচন বিশেষজ্ঞদের মতে, এমন সিদ্ধান্ত পরিবর্তন কমিশনের নমনীয়তা এবং পরিস্থিতি অনুযায়ী মানিয়ে নেওয়ার সক্ষমতা প্রকাশ করে। তারা বলছেন, একটি নির্বাচন শুধু ভোটগ্রহণের দিনেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে আস্থা, গ্রহণযোগ্যতা এবং ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা। কমিশনের প্রতিটি পদক্ষেপ সেই দৃষ্টিকোণ থেকেই বিচার করা হয়।
সব মিলিয়ে, ভোটকেন্দ্রে বিএনসিসি মোতায়েনের সিদ্ধান্ত বাতিল করে নির্বাচন কমিশন একটি স্পষ্ট বার্তা দিয়েছে যে, নির্বাচনকে ঘিরে যেকোনো বিতর্ক এড়িয়ে তারা সামনে এগোতে চায়। পোস্টাল ব্যালট গণনার মতো সীমিত ও প্রশাসনিক কাজে ক্যাডেটদের ব্যবহার রেখে মূল ভোটকেন্দ্রগুলোকে পুরোপুরি প্রচলিত কাঠামোর মধ্যেই রাখার এই উদ্যোগ নির্বাচনের পরিবেশকে আরও স্বচ্ছ ও গ্রহণযোগ্য করবে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।