প্রকাশ: ০৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী আজ তাদের নির্বাচনী ইশতেহার ঘোষণা করতে যাচ্ছে। নির্বাচনের তারিখ যত ঘনিয়ে আসছে, রাজনৈতিক অঙ্গনে ততই বাড়ছে আলোচনা, কৌশল ও প্রস্তুতি। এই প্রেক্ষাপটে জামায়াতের ইশতেহার প্রকাশকে ঘিরে রাজনৈতিক মহল, বিশ্লেষক এবং সাধারণ ভোটারদের মধ্যে বাড়তি আগ্রহ লক্ষ্য করা যাচ্ছে।
গণমাধ্যমে পাঠানো এক আমন্ত্রণপত্রে জানানো হয়েছে, বুধবার সন্ধ্যা সাড়ে ছয়টার দিকে রাজধানীর বনানীর একটি অভিজাত হোটেলে আনুষ্ঠানিকভাবে এই ইশতেহার প্রকাশ করা হবে। দলটির শীর্ষ নেতারা, জোটসঙ্গী দলের প্রতিনিধিরা, কূটনৈতিক মিশনের সদস্য, রাজনৈতিক বিশ্লেষক, সাংবাদিক এবং বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার বিশিষ্ট ব্যক্তিদের উপস্থিত থাকার কথা রয়েছে বলে আমন্ত্রণপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে।
আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। দীর্ঘদিন পর জাতীয় রাজনীতিতে তুলনামূলকভাবে ভিন্ন এক বাস্তবতায় এই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। একদিকে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে প্রতিযোগিতা, অন্যদিকে নির্বাচনকেন্দ্রিক আইনশৃঙ্খলা, সুষ্ঠু ভোটগ্রহণ এবং অংশগ্রহণমূলক পরিবেশ নিয়ে জনমনে নানা প্রশ্ন ও প্রত্যাশা রয়েছে। এই অবস্থায় প্রতিটি দলের নির্বাচনী ইশতেহার ভোটারদের সামনে তাদের রাজনৈতিক দর্শন, ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা এবং রাষ্ট্র পরিচালনা বিষয়ে অবস্থান তুলে ধরার একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী দীর্ঘদিন ধরে একটি আদর্শভিত্তিক রাজনৈতিক দল হিসেবে নিজেদের পরিচয় তুলে ধরে আসছে। দলটি বরাবরই দাবি করে এসেছে যে, তারা ইসলামী মূল্যবোধ, ন্যায়বিচার, সুশাসন এবং দুর্নীতিমুক্ত রাষ্ট্রব্যবস্থার পক্ষে রাজনীতি করে। এবারের ইশতেহারে এসব বিষয় আরও সুস্পষ্টভাবে উপস্থাপিত হবে বলে দলীয় সূত্রগুলো ইঙ্গিত দিচ্ছে। বিশেষ করে অর্থনীতি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কর্মসংস্থান, সামাজিক নিরাপত্তা এবং সুশাসন ইস্যুতে দলটির অবস্থান কী হবে, তা জানার আগ্রহ রয়েছে ভোটারদের মধ্যে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান প্রেক্ষাপটে কোনো দলের ইশতেহার শুধু নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির দলিল নয়, বরং সেটি একটি রাজনৈতিক বার্তা। ইশতেহারের ভাষা, বিষয়বস্তু এবং অগ্রাধিকার থেকেই অনেক সময় বোঝা যায়, একটি দল কোন শ্রেণির ভোটারকে লক্ষ্য করে রাজনীতি করছে এবং রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে তারা কোন পথে হাঁটতে চায়। জামায়াতের ইশতেহারও সে কারণেই গুরুত্ব পাচ্ছে।
দলীয় সূত্রে জানা গেছে, এবারের ইশতেহার প্রণয়নে দীর্ঘ সময় ধরে কাজ করা হয়েছে। বিভিন্ন খাতের বিশেষজ্ঞ, অর্থনীতিবিদ, শিক্ষাবিদ এবং নীতিনির্ধারকদের মতামত নেওয়া হয়েছে বলে দাবি করা হচ্ছে। সমাজের বিভিন্ন স্তরের মানুষের সমস্যা, প্রত্যাশা এবং সমাধানের পথ খোঁজার চেষ্টা এই ইশতেহারে প্রতিফলিত হবে বলেও জানানো হয়েছে। তবে ইশতেহারের পূর্ণাঙ্গ বিষয়বস্তু আনুষ্ঠানিক ঘোষণার আগে প্রকাশ করা হয়নি।
রাজনৈতিক অঙ্গনে জামায়াতের ভূমিকা বরাবরই আলোচিত। অতীতের নানা ঘটনার কারণে দলটি যেমন সমালোচনার মুখে পড়েছে, তেমনি একটি নির্দিষ্ট ভোটব্যাংকের সমর্থনও তারা ধরে রেখেছে বলে মনে করা হয়। বর্তমান নির্বাচনে সেই সমর্থন কতটা প্রভাব ফেলবে এবং ইশতেহার কতটা ভোটারদের আকৃষ্ট করতে পারবে, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।
নির্বাচনী পরিবেশ নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা যাচ্ছে। কেউ আশা করছেন, এবারের নির্বাচন তুলনামূলকভাবে শান্তিপূর্ণ ও অংশগ্রহণমূলক হবে। আবার কেউ কেউ সংশয় প্রকাশ করছেন ভোটের স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষতা নিয়ে। এই প্রেক্ষাপটে রাজনৈতিক দলগুলোর দায়িত্বশীল ভূমিকা এবং বাস্তবসম্মত প্রতিশ্রুতি দেওয়ার বিষয়টি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
জামায়াতের ইশতেহার ঘোষণার অনুষ্ঠানটি ঘিরে রাজধানীতে বাড়তি নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। বড় রাজনৈতিক আয়োজন হওয়ায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সতর্ক থাকবে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। একই সঙ্গে অনুষ্ঠানটি সরাসরি সম্প্রচার বা সংবাদমাধ্যমে বিস্তারিতভাবে তুলে ধরা হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে, যাতে দেশের বিভিন্ন প্রান্তের মানুষ ইশতেহারের মূল বক্তব্য জানতে পারেন।
নির্বাচনী ইশতেহার ঘোষণার মাধ্যমে রাজনৈতিক দলগুলো মূলত ভোটারদের সঙ্গে এক ধরনের নৈতিক চুক্তিতে আবদ্ধ হয়। ভোটাররা প্রতিশ্রুতির ভিত্তিতে ভোট দেন, আর নির্বাচিত হলে দলগুলোর দায়িত্ব হয় সেই প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের চেষ্টা করা। অতীত অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, অনেক প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। সে কারণেই এবারের ইশতেহারগুলো কতটা বাস্তবসম্মত এবং সময়োপযোগী, তা নিয়ে আলোচনা চলছে।
জামায়াতের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, তারা ক্ষমতায় গেলে বা সংসদে উল্লেখযোগ্য প্রতিনিধিত্ব পেলে দেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতি বদলে দিতে চায়। দলটির নেতারা বিভিন্ন সময়ে দাবি করেছেন, ন্যায়ভিত্তিক সমাজ গঠন এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান তাদের রাজনীতির মূল লক্ষ্য। ইশতেহারে এই বিষয়গুলো কীভাবে উপস্থাপিত হয় এবং সেগুলো বাস্তবায়নের রূপরেখা কতটা স্পষ্ট থাকে, সেটিই এখন দেখার বিষয়।
সব মিলিয়ে, সন্ধ্যায় অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া জামায়াতের নির্বাচনী ইশতেহার ঘোষণা শুধু একটি আনুষ্ঠানিক আয়োজন নয়, বরং এটি আসন্ন জাতীয় নির্বাচনের রাজনীতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় যোগ করবে বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা। এই ইশতেহার প্রকাশের পর রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে আলোচনা, বিশ্লেষণ এবং প্রতিক্রিয়ার ঝড় উঠবে, এমনটাই প্রত্যাশা করা হচ্ছে।