প্রকাশ: ০৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
গভীর রাজনৈতিক সংকটের মধ্যে হাইতির উপকূলে মার্কিন যুদ্ধজাহাজ মোতায়েন করা হয়েছে। মঙ্গলবার যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক কর্মকর্তারা এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন। এই পদক্ষেপকে হাইতির নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতার জন্য গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে, যেখানে দেশটি দীর্ঘদিন ধরেই সহিংসতা ও রাজনৈতিক অস্থিরতার চক্রে ফেঁসে আছে।
মার্কিন দূতাবাস জানায়, ইউএসএস স্টকডেল, ইউএসসিজিসি স্টোন এবং ইউএসসিজিসি ডিলিজেন্স পোর্ট-অ-প্রিন্স উপসাগরে প্রবেশ করেছে। দূতাবাসের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া বার্তায় বলা হয়েছে, “হাইতির নিরাপত্তা, স্থিতিশীলতা ও উজ্জ্বল ভবিষ্যতের প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের দৃঢ় অঙ্গীকারের প্রতিফলন।” এছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধমন্ত্রী পিট হেগসেথের নির্দেশে নৌবহরটি পাঠানো হয়েছে।
মার্কিন সামরিক কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এই নৌবহরের অংশগ্রহণ ‘অপারেশন সাউদার্ন স্পিয়ার’-এর আওতায়। এটি ক্যারিবীয় ও পূর্ব প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে মাদক পাচারকারীদের বিরুদ্ধে পরিচালিত একটি সামরিক অভিযান। এই অভিযানে এখন পর্যন্ত শতাধিক মানুষের প্রাণহানি ঘটেছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, হাইতিতে মার্কিন নৌবহরের উপস্থিতি রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং সশস্ত্র গ্যাং সহিংসতার দিকে একটি প্রতীকী এবং বাস্তবিক পদক্ষেপ।
হাইতিতে দীর্ঘদিনের সহিংসতা এবং রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার ফলে দেশটি বর্তমানে নতুন সংকটের মুখোমুখি। প্রেসিডেনশিয়াল ট্রানজিশনাল কাউন্সিলের মেয়াদ আগামী ৭ ফেব্রুয়ারি শেষ হওয়ার কথা থাকায় রাজনৈতিক অস্থিরতা আরও বাড়ছে। ২০২৪ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী আরিয়েল অঁরি গ্যাং সহিংসতার চাপের কারণে পদত্যাগ করতে বাধ্য হন। ২০১৬ সালের পর হাইতিতে আর কোনো নির্বাচন না হওয়ায় রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্ব অনেকাংশে দুর্বল হয়ে পড়েছে।
পশ্চিম গোলার্ধের সবচেয়ে দরিদ্র দেশ হিসেবে পরিচিত হাইতির বহু এলাকা বর্তমানে প্রতিদ্বন্দ্বী সশস্ত্র গ্যাংয়ের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। এসব গ্যাং হত্যা, ধর্ষণ ও অপহরণের মতো গুরুতর অপরাধে জড়িত বলে অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয় নাগরিকরা প্রতিনিয়তই সহিংসতার শিকার হচ্ছেন। চিকিৎসা, শিক্ষা ও খাদ্য নিরাপত্তা ব্যবস্থাও প্রভাবিত হচ্ছে। নিরাপত্তাহীনতার কারণে মানুষ ভয়ে নিজ এলাকা ছেড়ে অন্যত্র স্থানান্তরিত হচ্ছেন।
উল্লেখ্য, হাইতির শীর্ষ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র নতুন ভিসা নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। অভিযোগ করা হচ্ছে, তারা সশস্ত্র গ্যাংগুলোর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বা তাদের সমর্থন করছেন। মার্কিন নীতিনির্ধারকরা বলেছেন, এই পদক্ষেপের মাধ্যমে হাইতির শীর্ষ নেতৃত্বকে দায়িত্বজ্ঞানী হওয়ার এবং গ্যাং সহিংসতার বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য চাপ সৃষ্টি করা হবে।
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, হাইতিতে রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা সংকট দীর্ঘস্থায়ী এবং জনগণ ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের জন্য একটি চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। মার্কিন নৌবহরের উপস্থিতি এই সংকটের একটি সামরিক ও প্রতিরক্ষা দিক তুলে ধরলেও রাজনৈতিক সমাধানের বিকল্প নয়। দেশটির অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সংলাপ, সামাজিক পুনর্গঠন ও সুশাসন ছাড়া সুষ্ঠু শান্তি ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।
বর্তমানে হাইতি আন্তর্জাতিক মানবিক সহায়তা এবং নিরাপত্তা নজরদারি বৃদ্ধি করার আহ্বান জানাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা হাইতির সরকারকে সহায়তা ও পরামর্শ দিচ্ছে। তবে দীর্ঘমেয়াদি শান্তি স্থাপনের জন্য দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি, সামাজিক পুনর্গঠন এবং নাগরিক অংশগ্রহণ অপরিহার্য।
এই পরিস্থিতিতে হাইতি ও ক্যারিবীয় অঞ্চলের নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন, সামরিক উপস্থিতি একদিকে সঙ্কট নিয়ন্ত্রণ করতে সাহায্য করলেও দীর্ঘমেয়াদি শান্তি ও স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠার জন্য রাজনৈতিক সমাধান ও আইন প্রয়োগ অপরিহার্য। গ্যাং সহিংসতা এবং রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্যে সাধারণ মানুষের জীবন ও নিরাপত্তা এখনও সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয় হিসেবে রয়ে গেছে।