প্রকাশ: ০৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
হঠাৎ করে বুক ভারী হয়ে আসে, চোখের কোণে জমে ওঠে পানি। কোনো নির্দিষ্ট কারণ নেই, তবু নিঃশব্দে কেঁদে ফেলেন অনেকেই। নিজের ঘরে একা বসে, গভীর রাতে কিংবা দিনের ব্যস্ততার মাঝেও এমন কান্না এসে যেতে পারে। সমাজে প্রচলিত ধারণা অনুযায়ী, অকারণে কান্না দুর্বলতার লক্ষণ। কিন্তু আধুনিক মনোবিজ্ঞান ও স্নায়ুবিজ্ঞানের গবেষণা বলছে ভিন্ন কথা। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ধরনের কান্না আসলে শরীর ও মনের স্বাভাবিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, যা মানসিক ভারসাম্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
মানুষের আবেগ প্রকাশের সবচেয়ে প্রাচীন ও স্বাভাবিক উপায়গুলোর একটি হলো কান্না। শিশু জন্মের পর প্রথম যে শব্দ করে, সেটিও কান্না। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আমরা কান্নাকে নিয়ন্ত্রণ করতে শিখি, সামাজিক শিষ্টাচার আর প্রত্যাশার চাপে আবেগ গোপন করতে অভ্যস্ত হয়ে উঠি। কিন্তু আবেগ দমন করা মানেই যে তা হারিয়ে যায়, এমন নয়। বরং চাপা পড়া অনুভূতিগুলো শরীরের ভেতরে জমে থাকে এবং সুযোগ পেলেই প্রকাশের পথ খোঁজে। অকারণে হঠাৎ কান্না সেই জমে থাকা আবেগেরই বহিঃপ্রকাশ।
সম্প্রতি এক ভিডিও বার্তায় জনপ্রিয় হরমোন কোচ পূর্ণিমা পেরি জানিয়েছেন, অকারণে কান্না আসলে শরীরের বুদ্ধিদীপ্ত আত্মনিয়ন্ত্রণ প্রক্রিয়ার অংশ। তাঁর ভাষায়, কান্না দুর্বলতার প্রকাশ নয়, বরং এটি শরীরের ভারসাম্য ফিরিয়ে আনার একটি স্বাভাবিক উপায়। আধুনিক জীবনের চাপ, অনিশ্চয়তা ও অতিরিক্ত মানসিক ক্লান্তির ভেতর দিয়ে শরীর নিজেকে সুস্থ রাখার জন্য যে পথ বেছে নেয়, কান্না তার অন্যতম।
বৈজ্ঞানিকভাবে ব্যাখ্যা করলে দেখা যায়, কান্নার সঙ্গে সরাসরি জড়িয়ে আছে আমাদের স্নায়ুতন্ত্র। মানবদেহের অটোনমিক নার্ভাস সিস্টেমের দুটি প্রধান অংশ—সিমপ্যাথেটিক ও প্যারাসিমপ্যাথেটিক। সিমপ্যাথেটিক সিস্টেম সক্রিয় হলে শরীর ‘ফাইট-অর-ফ্লাইট’ অবস্থায় চলে যায়। তখন হৃদস্পন্দন বেড়ে যায়, পেশি টানটান হয়ে ওঠে, শরীরে কর্টিসলসহ স্ট্রেস হরমোনের মাত্রা বাড়ে। বিপরীতে প্যারাসিমপ্যাথেটিক সিস্টেম শরীরকে শান্ত ও স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনে।
পূর্ণিমা পেরির ব্যাখ্যায়, কান্না মূলত প্যারাসিমপ্যাথেটিক নার্ভাস সিস্টেমকে সক্রিয় করে। যখন দীর্ঘ সময় ধরে মানসিক চাপ বা উদ্বেগে থাকা হয়, তখন শরীর ক্লান্ত হয়ে পড়ে এবং কর্টিসলের মাত্রা কমানোর উপায় খোঁজে। কান্না সেই প্রক্রিয়ারই অংশ, যা মানুষকে ধীরে ধীরে উত্তেজনা থেকে শান্ত অবস্থায় নিয়ে আসে। এ কারণেই অনেকেই কান্নার পর হালকা লাগা, বুকের চাপ কমে যাওয়া বা গভীর স্বস্তির অনুভূতি পান।
বিশ্বখ্যাত চিকিৎসা প্রতিষ্ঠান ক্লিভল্যান্ড ক্লিনিকের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কান্নার পর অনেকের মনে হয় যেন বুকের ওপর থেকে ভারী কোনো বোঝা সরে গেছে। গবেষকরা মনে করেন, আবেগ চেপে রাখলে তা দীর্ঘমেয়াদে শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। দীর্ঘদিন অব্যক্ত আবেগ শরীরে উচ্চ রক্তচাপ, মাথাব্যথা, ঘুমের সমস্যা এমনকি হৃদ্রোগের ঝুঁকি বাড়াতে পারে। কান্না সেই জমে থাকা আবেগের নিরাপদ নিষ্কাশন পথ।
মনোবিজ্ঞানীরা আরও বলেন, কান্না মানুষের মস্তিষ্কে নিরাপত্তার সংকেত পাঠায়। মানুষ সাধারণত তখনই কাঁদে, যখন সে নিজেকে নিরাপদ মনে করে—হোক তা বিশ্বাসযোগ্য মানুষের সামনে কিংবা নিজের ব্যক্তিগত জায়গায়। এই নিরাপত্তাবোধ মস্তিষ্ককে সতর্ক অবস্থান থেকে বের করে এনে আরাম ও স্বস্তির অনুভূতি তৈরি করে। ফলে শরীর ধীরে ধীরে ভারসাম্যে ফিরে আসে।
পূর্ণিমা পেরির মতে, অব্যক্ত আবেগ শরীরের নির্দিষ্ট অংশে চাপ সৃষ্টি করে। অনেকেই বলেন, বুক ভারী লাগে, গলা আটকে আসে বা মাথার ভেতর অদ্ভুত চাপ অনুভূত হয়। কান্নার মাধ্যমে এই ভেতরের চাপ মুক্ত হয়। চোখের জল শুধু আবেগের বহিঃপ্রকাশ নয়, বরং এটি একধরনের শারীরবৃত্তীয় প্রতিক্রিয়া, যা স্নায়ুতন্ত্রকে শিথিল করে।
ক্লিভল্যান্ড ক্লিনিক আরও জানায়, তীব্র মানসিক যন্ত্রণা, হতাশা বা গভীর দুশ্চিন্তার সময় কান্না আসা পুরোপুরি স্বাভাবিক। কান্না শেষ হওয়ার পর পরিস্থিতিকে অনেক সময় আরও স্পষ্টভাবে দেখা যায়। আবেগগুলো তখন তুলনামূলকভাবে সহজে নিয়ন্ত্রণে আসে, সিদ্ধান্ত নেওয়াও হয় বাস্তবসম্মত।
তবে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেন, কান্নাকে লজ্জার বিষয় মনে করে দমিয়ে রাখা ঠিক নয়। সমাজে বিশেষ করে পুরুষদের ক্ষেত্রে কান্নাকে দুর্বলতা হিসেবে দেখা হয়, যা মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর। আবেগ চেপে রাখলে স্ট্রেস হরমোনের মাত্রা দীর্ঘদিন ধরে বেশি থাকে, যা শরীরের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতাও দুর্বল করে দিতে পারে।
পূর্ণিমা পেরির ভাষায়, আপনি যদি ইদানীং বেশি কাঁদছেন, তার মানে শরীর ভেঙে পড়ছে না। বরং শরীর নিজের স্বাভাবিক ভারসাম্যে ফিরতে চাইছে। এটি একটি ইতিবাচক সংকেতও হতে পারে যে, আপনার মস্তিষ্ক ও স্নায়ুতন্ত্র অতিরিক্ত চাপ সামলাতে নিজস্ব উপায়ে কাজ করছে।
তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ও রয়েছে। অকারণে কান্না যদি খুব ঘন ঘন হয়, দীর্ঘদিন ধরে চলতে থাকে বা দৈনন্দিন কাজকর্মে বাধা সৃষ্টি করে, তাহলে সেটি অবহেলা করা উচিত নয়। এমন ক্ষেত্রে মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া জরুরি। কারণ কখনো কখনো এটি বিষণ্নতা, উদ্বেগজনিত ব্যাধি বা হরমোনজনিত সমস্যার লক্ষণও হতে পারে।
সব মিলিয়ে বিজ্ঞান বলছে, হঠাৎ কান্না মানেই দুর্বলতা নয়। বরং এটি মানুষের শরীর ও মনের গভীর বুদ্ধিদীপ্ত প্রতিক্রিয়া, যা চাপ কমিয়ে ভারসাম্য ফিরিয়ে আনতে সাহায্য করে। তাই নিজেকে প্রশ্নবিদ্ধ না করে, কান্নাকে স্বাভাবিকভাবে গ্রহণ করাই হতে পারে মানসিক সুস্থতার দিকে এক সাহসী ও ইতিবাচক পদক্ষেপ