প্রকাশ: ০৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
ব্যস্ত আধুনিক জীবনে সময় বাঁচাতে আমরা ক্রমেই প্যাকেটজাত ও প্রক্রিয়াজাত খাবারের দিকে ঝুঁকছি। বিস্কুট, চিপস, সস, জুস, ইনস্ট্যান্ট নুডলস থেকে শুরু করে প্রক্রিয়াজাত মাংস—সবখানেই থাকে বিভিন্ন ধরনের খাদ্য সংরক্ষণকারী উপাদান। এগুলোর মূল উদ্দেশ্য হলো খাবার দীর্ঘদিন ভালো রাখা, ব্যাকটেরিয়া ও ছত্রাকের বৃদ্ধি রোধ করা এবং স্বাদ ও রং বজায় রাখা। তবে সাম্প্রতিক গবেষণা বলছে, এই সুবিধার পেছনে লুকিয়ে থাকতে পারে দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যঝুঁকি, যা আমাদের নজরদারি ও সচেতনতা দাবি করে।
আন্তর্জাতিক মেডিক্যাল জার্নাল ও ম্যাডস্ক্যাপে প্রকাশিত সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, ফ্রান্সের এক বৃহৎ নিউট্রিনেটসেন্টé গবেষণায় এক লাখের বেশি মানুষের খাদ্যাভ্যাস বহু বছর ধরে বিশ্লেষণ করা হয়েছে। গবেষণায় দেখা গেছে, যারা নিয়মিতভাবে প্রক্রিয়াজাত খাবার গ্রহণ করেন এবং এতে থাকা সংরক্ষণকারী উপাদান বেশি গ্রহণ হয়, তাদের মধ্যে ক্যানসার ও টাইপ ২ ডায়াবেটিসের ঝুঁকি তুলনামূলকভাবে বেশি। এটি বিশেষত একটি সতর্কবার্তা হিসেবে ধরা হচ্ছে, কারণ আজকের প্যাকেটজাত খাবার ভবিষ্যতের দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যঝুঁকির সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত।
ক্যানসারের ক্ষেত্রে কিছু সংরক্ষণকারী উপাদান বিশেষভাবে নজরে এসেছে। সোডিয়াম নাইট্রাইট ও নাইট্রেট, যা প্রায়শই সসেজ, বেকন ও প্রক্রিয়াজাত মাংসে ব্যবহার করা হয়, প্রোস্টেট ও স্তন ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়াতে পারে। এছাড়া পটাশিয়াম সরবেট ও সালফাইট, যা বিভিন্ন প্যাকেটজাত খাবার ও পানীয়তে ব্যবহৃত হয়, সামগ্রিক ক্যানসারের ঝুঁকি সামান্য বাড়াতে পারে বলে গবেষণা ইঙ্গিত দিয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এসব উপাদান সাধারণত পুষ্টিগুণে দরিদ্র এবং লবণ, চিনি বা ক্ষতিকর চর্বিতে ভরপুর খাবারে ব্যবহৃত হয়, ফলে ঝুঁকির পেছনে সামগ্রিক খাদ্যাভ্যাসও বড় ভূমিকা রাখে।
টাইপ ২ ডায়াবেটিসের ঝুঁকিও বাড়তে পারে। গবেষণায় দেখা গেছে, সংরক্ষণকারী উপাদান বেশি গ্রহণকারীদের মধ্যে টাইপ ২ ডায়াবেটিসের ঝুঁকি প্রায় ৪০ থেকে ৪৫ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে যেতে পারে। পটাশিয়াম সরবেট, ক্যালসিয়াম প্রোপিওনেট ও অ্যাসটিক অ্যাসিডের মতো উপাদান শরীরের ইনসুলিন সংবেদনশীলতা ও অন্ত্রের জীবাণু ভারসাম্যকে প্রভাবিত করতে পারে, যার ফলে দীর্ঘমেয়াদিভাবে ডায়াবেটিসের ঝুঁকি বৃদ্ধি পায়।
তবে এতে আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই। বিশেষজ্ঞদের মতে, সংরক্ষণকারী উপাদান পুরোপুরি বাদ দেওয়া সম্ভব নয়, কারণ এগুলি ছাড়া খাবার দীর্ঘদিন সংরক্ষণ করা সম্ভব নয়। তবে আমরা কিছু বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ গ্রহণ করে ঝুঁকি কমাতে পারি। এর মধ্যে রয়েছে আলট্রা প্রসেসড বা অতিরিক্ত প্রক্রিয়াজাত খাবার যতটা সম্ভব কম খাওয়া, ঘরে রান্না করা, টাটকা ও মৌসুমি খাবার গ্রহণে জোর দেওয়া, এবং খাবারের প্যাকেটে লেখা উপাদান বা ইনগ্রিডিয়েন্ট পরীক্ষা করা। এছাড়া প্রক্রিয়াজাত মাংসের অতিরিক্ত ব্যবহার এড়িয়ে চলাও স্বাস্থ্য রক্ষায় সহায়ক।
প্রক্রিয়াজাত খাবারের সুবিধা আমাদের দৈনন্দিন জীবনকে সহজ করেছে, কিন্তু অতিরিক্ত নির্ভরতা ভবিষ্যতে স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়াতে পারে। সুষম খাদ্যাভ্যাস ও পরিমিত জীবনযাপনই ক্যানসার, ডায়াবেটিস ও অন্যান্য দীর্ঘমেয়াদি রোগ প্রতিরোধের সবচেয়ে কার্যকর উপায়। আধুনিক জীবনের ব্যস্ততাকে অজুহাত বানিয়ে প্রক্রিয়াজাত খাবারের উপর নির্ভরতা বাড়ালে আমরা স্বাস্থ্যঝুঁকির ফাঁদে পড়ে যেতে পারি। তাই সচেতন হওয়া, স্বাস্থ্যবান খাবার বেছে নেওয়া এবং পুষ্টিকর খাদ্যাভ্যাসে মনোযোগ দেওয়া সময়ের দাবি।
যদিও প্রক্রিয়াজাত খাবার কমাতে হলে আমাদের দৈনন্দিন পরিকল্পনা ও খাদ্য ব্যবস্থাপনাকে আরও দায়িত্বশীল করতে হবে। টাটকা, পুষ্টিকর ও মৌসুমি খাদ্য গ্রহণের মাধ্যমে শুধু দীর্ঘমেয়াদি রোগের ঝুঁকি কমানো সম্ভব নয়, বরং দৈনন্দিন শক্তি ও মানসিক সতেজতাও বৃদ্ধি পায়। স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনের জন্য আমাদের প্রতিদিনের খাদ্য পছন্দকে সচেতনভাবে তৈরি করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।