প্রকাশ: ১০ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে টানা প্রায় তিন সপ্তাহের জমজমাট রাজনৈতিক প্রচার-প্রচারণার আনুষ্ঠানিক সমাপ্তি ঘটেছে। নির্বাচনি আচরণবিধি অনুযায়ী মঙ্গলবার সকাল সাড়ে ৭টার সঙ্গে সঙ্গে শেষ হয়ে গেছে সংসদ নির্বাচন ও গণভোটের সব ধরনের প্রচার কার্যক্রম। এখন রাজনৈতিক দল, প্রার্থী ও ভোটারদের দৃষ্টি নিবদ্ধ বৃহস্পতিবার, ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিতব্য ভোটগ্রহণের দিকে।
গত ২২ জানুয়ারি শুরু হওয়া নির্বাচনি প্রচারের শেষ দিন সোমবার রাজধানী ঢাকা থেকে শুরু করে বিভাগীয় শহর, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে ছিল ব্যস্ত ও উত্তেজনাপূর্ণ। বড় বড় মিছিল, পথসভা, জনসভা ও শোডাউনে মুখর হয়ে ওঠে নগর ও জনপদ। শেষ মুহূর্তে ভোটারদের কাছে নিজেদের বার্তা পৌঁছে দিতে সর্বোচ্চ চেষ্টা চালান প্রার্থী ও তাদের সমর্থকেরা। প্রচারের শেষ দিনে যেন এক ধরনের রাজনৈতিক উৎসবের আমেজ বিরাজ করে।
বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান এবং জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান রাজধানীতে একাধিক জনসভা ও পথসভায় অংশ নিয়ে নিজ নিজ দল ও জোটের প্রার্থীদের পক্ষে ভোট চান। নির্বাচনি মাঠে তাঁদের সরব উপস্থিতি দলীয় নেতাকর্মীদের মধ্যে বাড়তি উদ্দীপনা সৃষ্টি করে। একই সঙ্গে অন্যান্য রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেতারাও শেষ দিনের প্রচারে অংশ নেন।
নির্বাচনি আচরণবিধিতে স্পষ্টভাবে বলা আছে, ভোটগ্রহণের ৪৮ ঘণ্টা আগে থেকে কোনো রাজনৈতিক দল বা প্রার্থী কোনো ধরনের প্রচার চালাতে পারবেন না। সে অনুযায়ী আজ সকাল সাড়ে ৭টার পর থেকে নির্বাচনি এলাকায় পোস্টার, মাইকিং, সভা কিংবা মিছিল—সবই নিষিদ্ধ হয়ে গেছে। নির্বাচন কমিশন জানিয়েছে, এই সময়সীমা কঠোরভাবে মানতে মাঠ প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সতর্ক অবস্থানে রয়েছে।
এবারের নির্বাচনে প্রচারপর্বে বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান প্রায় সারা দেশ চষে বেড়িয়েছেন। দলের রেওয়াজ অনুযায়ী তিনি সিলেট থেকে প্রচার শুরু করেন। ১৯ দিনের প্রচার সময়ে তিনি আটটি বিভাগের অন্তত ২৪টি জেলায় গিয়ে ৪৩টি জনসভা ও পথসভায় বক্তব্য দেন। এসব সভায় তিনি ভোটাধিকার প্রয়োগ, গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার ও পরিবর্তনের আহ্বান জানান।
অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমানও ছিলেন সমানভাবে সক্রিয়। তিনি সব বিভাগের ৪৩টি জেলার বিভিন্ন এলাকায় অর্ধশতাধিক বড় জনসভা ও একাধিক পথসভায় বক্তব্য রাখেন। তাঁর বক্তৃতায় নির্বাচনে অংশগ্রহণ, সুশাসন ও ন্যায়বিচারের বিষয়টি গুরুত্ব পায়। একইভাবে এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলামসহ অন্যান্য দলের নেতারাও বিভিন্ন জেলায় সফর করে ভোটারদের সঙ্গে মতবিনিময় করেন।
প্রচারণা শেষ হলেও রাজনৈতিক দলগুলোর কাজ থেমে নেই। ভোটগ্রহণ শুরুর আগের ৪৮ ঘণ্টাকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সময় হিসেবে দেখছেন দলীয় নেতারা। এই সময়ে তারা কেন্দ্রভিত্তিক কৌশল নির্ধারণ, পোলিং এজেন্ট নিয়োগ, নির্বাচনি এজেন্টদের প্রশিক্ষণ ও দায়িত্ব বণ্টনের কাজ করছেন। দলীয় সূত্রগুলো বলছে, ভোটের দিন যাতে কোনো অনিয়ম না ঘটে, সে জন্য সর্বোচ্চ প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে।
আগামী বৃহস্পতিবার সকাল সাড়ে ৭টা থেকে বিকাল সাড়ে ৪টা পর্যন্ত সারাদেশে একযোগে ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটে ৩০০ আসনের মধ্যে ২৯৯টি আসনে ভোট হচ্ছে। শেরপুর-৩ আসনে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থীর মৃত্যুর কারণে ওই আসনের নির্বাচন স্থগিত করেছে নির্বাচন কমিশন। পরে সেখানে নতুন করে তফসিল ঘোষণা করা হবে।
ইসি সচিবালয় সূত্রে জানা গেছে, নির্বাচন সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করতে প্রয়োজনীয় সব প্রস্তুতি প্রায় শেষ। দেশের সব জেলায় রিটার্নিং অফিসারদের কাছে ব্যালট পেপারসহ নির্বাচনি সরঞ্জাম পাঠানো হয়েছে। ইতোমধ্যে ভোটকেন্দ্রগুলো প্রস্তুত করা হয়েছে এবং ভোটগ্রহণ কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণ সম্পন্ন হয়েছে।
এবারের নির্বাচনে মোট ভোটার সংখ্যা ১২ কোটি ৭৭ লাখ ১১ হাজার। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ছয় কোটি ৪৮ লাখ ২৫ হাজার, নারী ভোটার ছয় কোটি ২৮ লাখ ৮৫ হাজার এবং তৃতীয় লিঙ্গের ভোটার রয়েছেন এক হাজার ২২০ জন। এই বিপুল সংখ্যক ভোটারের অংশগ্রহণকে কেন্দ্র করে নির্বাচন কমিশন বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে ভোটকেন্দ্র ব্যবস্থাপনা ও নিরাপত্তায়।
ভোটার সংখ্যার দিক থেকে ঝালকাঠি-১ আসনে রয়েছে সর্বনিম্ন দুই লাখ ২৮ হাজার ৪৩১ জন ভোটার এবং গাজীপুর-২ আসনে সর্বোচ্চ আট লাখ চার হাজার ৩৩৩ জন ভোটার। সারা দেশে মোট ৪২ হাজার ৭৭৯টি ভোটকেন্দ্রে দুই লাখ ৪৭ হাজার ৪৮২টি ভোটকক্ষ স্থাপন করা হয়েছে।
এই নির্বাচনে ৫১টি রাজনৈতিক দল অংশ নিচ্ছে এবং মোট প্রার্থী সংখ্যা দুই হাজার ৩৩ জন। এর মধ্যে ২৭৫ জন স্বতন্ত্র প্রার্থী রয়েছেন। রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি প্রার্থী দিয়েছে বিএনপি, যার সংখ্যা ২৯১। ঢাকা-১২ আসনে সর্বাধিক ১৫ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন, আর পিরোজপুর-১ আসনে সবচেয়ে কম মাত্র দুজন প্রার্থী মাঠে রয়েছেন।
নির্বাচনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রায় আট লাখ নির্বাচনি কর্মকর্তার পাশাপাশি নয় লাখের মতো আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য দায়িত্ব পালন করবেন। দেশীয় পর্যবেক্ষক থাকছেন প্রায় ৩৫ হাজার এবং আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক থাকছেন সাড়ে তিনশ’র মতো। নির্বাচন কমিশনের আশা, সব পক্ষের সহযোগিতায় শান্তিপূর্ণ পরিবেশে ভোটগ্রহণ সম্পন্ন হবে।
টানা প্রচার-প্রচারণার পর এখন দেশজুড়ে এক ধরনের নীরব প্রত্যাশা। রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীদের হিসাব-নিকাশের পাশাপাশি সাধারণ ভোটাররাও অপেক্ষা করছেন তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগের দিনের জন্য। প্রচারের কোলাহল থেমে গিয়ে এখন গণতন্ত্রের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়—ভোটের পালা।