প্রকাশ: ১০ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
টুথব্রাশ—দৈনন্দিন জীবনের এমন একটি ছোট কিন্তু অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ উপকরণ, যার ওপর নির্ভর করে আমাদের দাঁত, মাড়ি ও পুরো মুখগহ্বরের স্বাস্থ্য। সকালে ঘুম থেকে ওঠা থেকে শুরু করে রাতে ঘুমাতে যাওয়ার আগ পর্যন্ত দাঁত পরিষ্কারের অভ্যাস আমাদের পরিচ্ছন্নতার প্রথম ধাপ। অথচ এই টুথব্রাশটি কতদিন পরপর বদলানো উচিত, তা নিয়ে অনেকেই উদাসীন। ব্যবহার করতে করতে ব্রাশ পুরনো হয়ে গেলেও আমরা অনেক সময় তা বুঝে উঠতে পারি না কিংবা গুরুত্ব দিই না। অথচ দন্তচিকিৎসকদের মতে, সঠিক সময়ে টুথব্রাশ পরিবর্তন না করলে দাঁত পরিষ্কারের সুফল কমে যাওয়ার পাশাপাশি বাড়তে পারে নানা স্বাস্থ্যঝুঁকি।
বিশেষজ্ঞরা সাধারণত প্রতি তিন থেকে চার মাস অন্তর টুথব্রাশ বদলানোর পরামর্শ দিয়ে থাকেন। কারণ এই সময়ের মধ্যেই ব্রাশের ব্রিসল বা আঁশ স্বাভাবিকভাবেই ক্ষয়প্রাপ্ত হয়। প্রতিদিন দুইবার ব্যবহার করার ফলে ব্রিসল ধীরে ধীরে বেঁকে যায়, নরম হয়ে পড়ে বা ছড়িয়ে যায়। বাইরে থেকে ব্রাশ দেখতে ঠিকঠাক মনে হলেও এর কার্যকারিতা অনেকটাই কমে যায়। তখন দাঁতের ওপর জমে থাকা প্লাক, ব্যাকটেরিয়া ও খাদ্যকণাগুলো সঠিকভাবে পরিষ্কার হয় না। ফলে মুখের ভেতরে নীরবে জমতে থাকে নানা সমস্যা।
টুথব্রাশের মূল কাজ হলো দাঁতের প্রতিটি অংশে পৌঁছে ময়লা ও জীবাণু দূর করা। কিন্তু যখন ব্রিসল নষ্ট হয়ে যায়, তখন দাঁতের ফাঁক, মাড়ির কিনারা কিংবা পেছনের অংশ ভালোভাবে পরিষ্কার করা সম্ভব হয় না। এতে দাঁতের ক্ষয়, ক্যাভিটি, মাড়ির প্রদাহ বা দুর্গন্ধের মতো সমস্যা দেখা দিতে পারে। অনেকেই ভাবেন, শক্ত ব্রিসলযুক্ত ব্রাশ বেশি কার্যকর। কিন্তু বাস্তবে পুরনো শক্ত ব্রিসল দাঁত ও মাড়ির জন্য ক্ষতিকর হয়ে উঠতে পারে। নষ্ট ব্রিসল দাঁতের এনামেল ক্ষয় করতে পারে এবং মাড়িতে ক্ষত সৃষ্টি করতে পারে, যা পরবর্তীতে রক্তপাত বা সংক্রমণের কারণ হতে পারে।
টুথব্রাশ পরিবর্তনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হলো জীবাণু ও ব্যাকটেরিয়ার জমে থাকা। প্রতিবার দাঁত ব্রাশ করার সময় ব্রাশ ভিজে যায় এবং মুখের ভেতরের ব্যাকটেরিয়া এতে লেগে থাকে। যদি ব্যবহারের পর ব্রাশ ঠিকমতো পরিষ্কার করে খোলা জায়গায় শুকাতে না দেওয়া হয়, তাহলে আর্দ্র পরিবেশে জীবাণু দ্রুত বংশবিস্তার করতে পারে। গবেষণায় দেখা গেছে, দীর্ঘদিন ব্যবহার করা টুথব্রাশে ব্যাকটেরিয়া, ফাঙ্গাস এমনকি কিছু ক্ষতিকর জীবাণুও বাসা বাঁধতে পারে। এই জীবাণু প্রতিবার ব্রাশ করার সময় আবার মুখে প্রবেশ করে, যা দাঁত ও মাড়ির রোগের ঝুঁকি বাড়িয়ে তোলে।
বিশেষ করে যাঁরা বাথরুমে টয়লেটের কাছাকাছি টুথব্রাশ রাখেন, তাঁদের ক্ষেত্রে জীবাণু সংক্রমণের ঝুঁকি আরও বেশি হতে পারে। টয়লেট ফ্লাশ করার সময় বাতাসে ছড়িয়ে পড়া ক্ষুদ্র জীবাণু কণাও টুথব্রাশে লেগে থাকতে পারে। দীর্ঘদিন একই ব্রাশ ব্যবহার করলে এসব জীবাণু জমে গিয়ে মুখের স্বাস্থ্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। তাই নির্দিষ্ট সময় পরপর টুথব্রাশ বদলানো শুধু পরিচ্ছন্নতার বিষয় নয়, বরং এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ স্বাস্থ্য সুরক্ষা অভ্যাস।
মাড়ি ও দাঁতের সুরক্ষার ক্ষেত্রেও টুথব্রাশ পরিবর্তন অত্যন্ত জরুরি। পুরনো ব্রাশের নষ্ট ব্রিসল মাড়িতে নিয়মিত ঘষা লাগালে সেখানে প্রদাহ সৃষ্টি হতে পারে। অনেক সময় ব্রাশ করার পর মাড়ি থেকে রক্তপাত হলে আমরা সেটিকে তেমন গুরুত্ব দিই না। কিন্তু এটি হতে পারে পুরনো বা অনুপযুক্ত টুথব্রাশ ব্যবহারের ফল। নতুন ও নরম ব্রিসলযুক্ত ব্রাশ মাড়ির জন্য তুলনামূলকভাবে নিরাপদ এবং দাঁত পরিষ্কার করতেও বেশি কার্যকর। বিশেষ করে যাঁদের মাড়ি সংবেদনশীল বা আগে থেকেই মাড়ির সমস্যা রয়েছে, তাঁদের ক্ষেত্রে নিয়মিত ব্রাশ পরিবর্তন করা আরও বেশি জরুরি।
রোগ থেকে সেরে ওঠার পর টুথব্রাশ বদলানোর বিষয়টিও অনেকেই উপেক্ষা করেন। জ্বর, সর্দি-কাশি, ফ্লু বা মুখগহ্বরের কোনো সংক্রমণের সময় ব্যবহৃত টুথব্রাশে রোগজীবাণু থেকে যেতে পারে। অসুস্থতা কাটিয়ে ওঠার পরও সেই ব্রাশ ব্যবহার করলে শরীরে আবার সংক্রমণ ফিরে আসার আশঙ্কা থাকে। তাই অনেক দন্তচিকিৎসকই পরামর্শ দেন, কোনো সংক্রামক রোগে আক্রান্ত হওয়ার পর সুস্থ হলেই টুথব্রাশ বদলে ফেলতে। এটি একটি ছোট পদক্ষেপ হলেও এর মাধ্যমে বড় ধরনের স্বাস্থ্যঝুঁকি এড়ানো সম্ভব।
শিশুদের ক্ষেত্রে টুথব্রাশ পরিবর্তনের বিষয়টি আরও গুরুত্বের সঙ্গে দেখা প্রয়োজন। শিশুরা সাধারণত বেশি চাপ দিয়ে দাঁত ব্রাশ করে, ফলে তাদের ব্রাশ দ্রুত নষ্ট হয়ে যায়। এ ছাড়া তারা অনেক সময় ব্রাশ কামড়ায় বা মাটিতে ফেলে দেয়, যা জীবাণু সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়ায়। তাই শিশুদের টুথব্রাশ দুই থেকে তিন মাস অন্তর বা ব্রিসল নষ্ট হলেই বদলে দেওয়া ভালো। এতে তাদের দাঁতের সঠিক যত্ন নিশ্চিত হয় এবং ছোটবেলা থেকেই স্বাস্থ্যকর অভ্যাস গড়ে ওঠে।
অনেকেই ভাবেন, ইলেকট্রিক টুথব্রাশ ব্যবহার করলে হয়তো বারবার বদলানোর দরকার নেই। কিন্তু বাস্তবে ইলেকট্রিক টুথব্রাশের হেডও নির্দিষ্ট সময় পর পরিবর্তন করা জরুরি। সাধারণত তিন মাস পর ইলেকট্রিক ব্রাশের হেড বদলানোর পরামর্শ দেওয়া হয়। কারণ সেখানেও একইভাবে ব্রিসল ক্ষয় ও জীবাণু জমার ঝুঁকি থাকে।
সব মিলিয়ে বলা যায়, টুথব্রাশ পরিবর্তন করা কোনো বিলাসিতা নয়, বরং এটি মুখ ও দন্তস্বাস্থ্যের অপরিহার্য অংশ। নিয়মিত দাঁত ব্রাশ করলেও যদি ব্রাশ পুরনো ও অকার্যকর হয়, তাহলে কাঙ্ক্ষিত সুফল পাওয়া যায় না। তাই নিজের ও পরিবারের সবার সুস্থতার জন্য টুথব্রাশ বদলানোর বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা উচিত। সময়মতো ব্রাশ পরিবর্তনের এই ছোট অভ্যাসই দীর্ঘমেয়াদে দাঁত ও মাড়িকে সুস্থ রাখতে বড় ভূমিকা রাখতে পারে।