প্রকাশ: ১০ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
পাকিস্তানের পাঞ্জাবের ছোট্ট গ্রাম আজমত শাহে জন্ম নেওয়া হায়দার আলী ছিলেন সাধারণ পরিবারের সন্তান। পরিবারিক কঠিন বাস্তবতা এবং ছোটবেলায় বাবা-মায়ের বিচ্ছেদের পর চাচার কাছে মানুষ হয়ে বড় হওয়া হায়দারের জীবনের শুরুটাই ছিল সংগ্রামের মধ্য দিয়ে। তবে ছোটবেলা থেকেই তার স্বপ্ন ছিল বিশাল—পাকিস্তানের জার্সিতে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট খেলা এবং দেশের জন্য সর্বোচ্চ পর্যায়ে প্রতিনিধিত্ব করা।
এই স্বপ্নকে বুকে নিয়ে হায়দার একসময় লাহোর পাড়ি দেন। জীবিকা নির্বাহের জন্য তাকে করতে হতো রাতের বেলা ওয়েটারের কাজ, কখনো ফল বিক্রি। ২০১৮ সালে পাকিস্তানের প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে অভিষেক হলেও জাতীয় দলে কাঙ্ক্ষিত জায়গা করে নিতে পারেননি। তিনি বলেন, ‘ঘরোয়া ক্রিকেটে ভালোই করেছিলাম। কী ঘটেছিল সেটা বলতে চাই না। জীবন এমনই, সবসময় সবকিছু আমাদের পক্ষে যায় না। আমি ইতিবাচক থাকতে পছন্দ করি।’
কোভিড-১৯ মহামারির সময় তার আর্থিক অবস্থা আরও খারাপ হয়ে যায়। একসময় তিনি সিদ্ধান্ত নেন উন্নত ভবিষ্যতের আশায় সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই) পাড়ি দেবেন। এখান থেকেই শুরু হয় নতুন অধ্যায়, ইউএই জাতীয় দলের জার্সিতে খেলার সুযোগ।
আইসিসির তিন বছরের আবাসিক নিয়ম পূর্ণ করার পর ২০২৫ সালে হায়দার ইউএই দলের হয়ে খেলতে যোগ্য হন। অভিষেক সিরিজেই তিনি নিজের দক্ষতা প্রমাণ করেন। শারজাহতে বাংলাদেশের বিপক্ষে ম্যাচে মাত্র ৪ ওভারে ৭ রান খরচ করে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ উইকেট নেন। একই বছর আইএলটি২০ লিগে দুবাই ক্যাপিটালসের হয়ে শিরোপা জয়ের স্বাদও পান। বর্তমানে ৩১ বছর বয়সী এই বাঁহাতি স্পিনার স্বপ্ন দেখছেন প্রথম বিশ্বকাপে খেলার।
হায়দার বলেন, ‘বিশ্বকাপ ক্রিকেটের সবচেয়ে বড় মঞ্চ। প্রত্যেক ক্রিকেটারের স্বপ্ন এখানে খেলা। ভারতের মাটিতে বিশ্বকাপ—সেখানে মানুষ ক্রিকেটকে প্রাণের মতো ভালোবাসে। এটা আমার জন্য বাড়তি অনুপ্রেরণা।’
নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে পাওয়ারপ্লেতে নতুন বল হাতে নেয়ার সুযোগও থাকতে পারে হায়দারের। আইএলটি২০-তে পাওয়ারপ্লেতে তার ইকোনমি ৫.৯৩, যা ন্যূনতম ২০ ইনিংস খেলা বোলারদের মধ্যে টুর্নামেন্টের রেকর্ড। তিনি বলেন, ‘আমি পাওয়ারপ্লেতে বোলিং করতে ভালোবাসি। প্রতিপক্ষ অস্ট্রেলিয়া, ভারত কিংবা নিউজিল্যান্ড হোক, সেটা আমার জন্য বড় কথা নয়। আমি শুধু বলের ওপর মনোযোগ দিই এবং দলের জন্য কী করতে হবে সেটা ভাবি।’
ডেভিড ওয়ার্নার, রভম্যান পাওয়েলসহ বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় খেলোয়াড়দের সঙ্গে একই ড্রেসিংরুম ভাগ করার অভিজ্ঞতা তার আত্মবিশ্বাসকে আরও বাড়িয়েছে। হায়দার বলেন, ‘আইএলটি২০ আমার জীবন বদলে দিয়েছে। প্রথম ম্যাচের পর ওয়ার্নার আমাকে বলেছিলেন, ‘তুমি অসাধারণ, এমন বাঁহাতি স্পিনার আমি খুব কমই দেখেছি।’ এই কথাগুলো আমার জন্য অনেক শক্তি দিয়েছে।’
বাংলাদেশের বিপক্ষে সিরিজ নির্ধারণী ম্যাচে তার পারফরম্যান্সকে নিজের ক্যারিয়ারের অন্যতম সেরা মুহূর্ত মনে করেন হায়দার। তিনি বলেন, ‘এই দেশ আমাকে সম্মান দিয়েছে, সুযোগ দিয়েছে। আমি ইউএই ব্যাজের জন্য খেলি, আর সেটাই আমার সবচেয়ে বড় গর্ব।’
হায়দারের গল্প প্রমাণ করে যে, কঠোর পরিশ্রম, দৃঢ় মনোবল এবং আত্মবিশ্বাস থাকলে সামাজিক ও আর্থিক সীমাবদ্ধতাকে পেরিয়ে সফলতা অর্জন সম্ভব। ফল বিক্রি করা ছোট্ট যুবক থেকে বিশ্বের ক্রিকেটের বড় মঞ্চে পৌঁছানো হায়দারের উদাহরণ প্রমাণ করে স্বপ্ন বাস্তবায়নের পথে ধৈর্য, আত্মত্যাগ এবং অধ্যবসায় কতটা গুরুত্বপূর্ণ।
আজ হায়দার আলীর জীবনের এই অধ্যায় শুধু তার ব্যক্তিগত অর্জন নয়, এটি ক্রিকেটপ্রেমী নতুন প্রজন্মের জন্য অনুপ্রেরণার এক অনন্য দৃষ্টান্ত। যে যুবক রাতে ফল বিক্রি করত, আজ প্রথম বিশ্বকাপে খেলার প্রস্তুতি নিচ্ছে এবং আন্তর্জাতিক মঞ্চে দেশ ও দলের জন্য প্রতিনিধিত্ব করবে—এটি সত্যিই প্রশংসনীয় ও হৃদয়স্পর্শী।