প্রকাশ: ১০ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অন্যতম উদীয়মান অর্থনীতি মালয়েশিয়া আবারও আস্থার বার্তা দিচ্ছে। বৈশ্বিক অর্থনীতির অনিশ্চয়তা, ভূরাজনৈতিক টানাপোড়েন, উচ্চ সুদের হার এবং বাণিজ্যিক চাপের মধ্যেও দেশটির অর্থনীতি ২০২৫ সালের শেষ প্রান্তিকে গত এক বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ প্রবৃদ্ধির পথে এগিয়েছে। আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা রয়টার্স পরিচালিত অর্থনীতিবিদদের এক সাম্প্রতিক জরিপে উঠে এসেছে এই আশাব্যঞ্জক চিত্র, যা মালয়েশিয়ার অর্থনৈতিক সক্ষমতা ও কাঠামোগত শক্তির নতুন করে প্রমাণ দিচ্ছে।
জরিপ অনুযায়ী, ২০২৫ সালের অক্টোবর থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত চতুর্থ প্রান্তিকে মালয়েশিয়ার অর্থনীতি বার্ষিক ভিত্তিতে প্রায় ৫ দশমিক ৭ শতাংশ হারে বৃদ্ধি পেতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এটি তৃতীয় প্রান্তিকের ৫ দশমিক ২ শতাংশ প্রবৃদ্ধির তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি। অর্থনীতিবিদদের মতে, এই প্রবৃদ্ধি শুধু পরিসংখ্যানগত উন্নতি নয়, বরং অভ্যন্তরীণ চাহিদা, বিনিয়োগ ও উৎপাদন খাতের সম্মিলিত শক্তির প্রতিফলন।
বিশ্লেষকদের ভাষ্য অনুযায়ী, সাম্প্রতিক সময়ে মালয়েশিয়ার অভ্যন্তরীণ বাজার বেশ চাঙা রয়েছে। ভোক্তা ব্যয় বৃদ্ধি, সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পের গতি এবং বেসরকারি খাতে বিনিয়োগের প্রবাহ অর্থনীতিকে ভিতর থেকে শক্তিশালী করছে। দীর্ঘদিন পর শ্রমবাজারে স্থিতিশীলতা ফিরে আসায় মানুষের আয় বেড়েছে, যা ভোগব্যয় বাড়াতে সহায়ক ভূমিকা রাখছে। এর ফলে খুচরা বাণিজ্য, পরিবহন, পর্যটন এবং অন্যান্য সেবামূলক খাতে উল্লেখযোগ্য প্রবৃদ্ধি লক্ষ্য করা যাচ্ছে।
সেবামূলক খাতের পাশাপাশি ম্যানুফ্যাকচারিং বা উৎপাদন খাতও এই প্রবৃদ্ধিতে বড় অবদান রেখেছে। বৈদ্যুতিক ও ইলেকট্রনিক পণ্য, অটোমোটিভ যন্ত্রাংশ এবং শিল্পভিত্তিক রফতানি পণ্যের চাহিদা বাড়ায় কারখানাগুলোর উৎপাদন সক্ষমতা আরও সক্রিয় হয়েছে। বিশেষ করে প্রযুক্তিনির্ভর শিল্পে বৈদেশিক বিনিয়োগ বৃদ্ধি পাওয়ায় কর্মসংস্থান ও উৎপাদন—দুই ক্ষেত্রেই ইতিবাচক প্রভাব পড়েছে।
এমন এক সময়ে এই অগ্রগতি এসেছে, যখন যুক্তরাষ্ট্র মালয়েশিয়ার কিছু পণ্যের ওপর প্রায় ১৯ শতাংশ শুল্ক আরোপ করেছে। সাধারণত এমন শুল্ক আরোপ রফতানিনির্ভর অর্থনীতির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়। কিন্তু মালয়েশিয়ার ক্ষেত্রে চিত্রটি ভিন্ন। শুল্কের চাপ সত্ত্বেও দেশটির রফতানি প্রবৃদ্ধি ইতিবাচক ধারায় রয়েছে। এর পেছনে রয়েছে বাজার বৈচিত্র্যকরণ কৌশল, আঞ্চলিক বাণিজ্য চুক্তি এবং উচ্চমূল্য সংযোজনকারী পণ্যের উৎপাদন বৃদ্ধি।
ডিসেম্বর মাসে মালয়েশিয়ার বাণিজ্য উদ্বৃত্ত বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৯ দশমিক ৩ বিলিয়ন রিঙ্গিতে, যা মার্কিন ডলারে প্রায় ৪ দশমিক ৯২ বিলিয়ন। এই উদ্বৃত্ত রফতানি আয়ের শক্ত অবস্থানকে স্পষ্ট করে এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভকে আরও স্থিতিশীল রাখার সুযোগ সৃষ্টি করেছে। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, এটি দেশের মুদ্রানীতির জন্যও একটি ইতিবাচক সংকেত।
ওসিবিসি ব্যাংকের সিনিয়র আসিয়ান অর্থনীতিবিদ লাবণ্য ভেঙ্কটেশ্বরন মনে করেন, মালয়েশিয়ার বর্তমান প্রবৃদ্ধি বহুমাত্রিক শক্তির ওপর দাঁড়িয়ে আছে। তাঁর মতে, রফতানি, সরকারি ও বেসরকারি বিনিয়োগ, সরকারি ব্যয় এবং পারিবারিক ভোগ—সবকিছু মিলিয়ে অর্থনীতি একটি শক্ত ভিত্তির ওপর এগিয়ে যাচ্ছে। তিনি আরও বলেন, ২০২৩ সালের পর থেকে মালয়েশিয়ার অর্থনীতি যেভাবে পুনর্গঠিত হয়েছে, তা দীর্ঘমেয়াদে টেকসই প্রবৃদ্ধির সম্ভাবনা তৈরি করেছে।
একই সুরে কথা বলেছেন আন্তর্জাতিক ব্যাংকিং গ্রুপ এএনজেড-এর অর্থনীতিবিদ ক্রিস্টাল তান। তাঁর মতে, বিনিয়োগের ধারাবাহিক প্রবাহ এবং তুলনামূলকভাবে সুস্থ শ্রমবাজার ২০২৬ সালেও মালয়েশিয়ার প্রবৃদ্ধিকে সমর্থন দেবে। তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, অবকাঠামো উন্নয়ন, ডিজিটাল রূপান্তর এবং সবুজ অর্থনীতিতে সরকারের মনোযোগ ভবিষ্যতে আরও নতুন সুযোগ সৃষ্টি করতে পারে।
রয়টার্সের জরিপে অংশ নেওয়া অর্থনীতিবিদরা আরও পূর্বাভাস দিয়েছেন, ২০২৬ সালে মালয়েশিয়ার অর্থনীতি গড়ে প্রায় ৪ দশমিক ৫ শতাংশ হারে বৃদ্ধি পেতে পারে। যদিও এটি ২০২৫ সালের চতুর্থ প্রান্তিকের তুলনায় কিছুটা কম, তবে আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে এই প্রবৃদ্ধিকে যথেষ্ট শক্তিশালী বলেই মনে করছেন বিশ্লেষকরা। বৈশ্বিক মন্দার আশঙ্কা, উচ্চ সুদের হার এবং বাণিজ্যিক টানাপোড়েনের মধ্যেও এই হার ধরে রাখা একটি বড় সাফল্য।
মুদ্রানীতির ক্ষেত্রে দেশটির কেন্দ্রীয় ব্যাংক ব্যাংক নেগারা মালয়েশিয়া বর্তমানে তাদের বেঞ্চমার্ক সুদের হার ২ দশমিক ৭৫ শতাংশে অপরিবর্তিত রাখতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। বিশ্লেষকদের মতে, মূল্যস্ফীতি এখনো নিয়ন্ত্রণের মধ্যে থাকলেও প্রবৃদ্ধির গতি বজায় রাখতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক খুব সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। ভবিষ্যতে পরিস্থিতি বিবেচনায় সুদের হার কমানোর চেয়ে বাড়ানোর সম্ভাবনাই তুলনামূলক বেশি বলে মত দিচ্ছেন অনেকে।
আঞ্চলিক প্রেক্ষাপটে মালয়েশিয়ার এই অর্জন আরও তাৎপর্যপূর্ণ। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অনেক দেশ যখন দুর্বল অভ্যন্তরীণ চাহিদা, মুদ্রার অবমূল্যায়ন এবং বৈদেশিক ঋণের চাপ সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে, তখন মালয়েশিয়া তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল অবস্থানে রয়েছে। এই স্থিতিশীলতা বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আস্থা বাড়াচ্ছে এবং দেশটিকে এশিয়ার একটি সুবিধাজনক বিনিয়োগ গন্তব্য হিসেবে তুলে ধরছে।
সব মিলিয়ে বলা যায়, মালয়েশিয়ার অর্থনীতি বর্তমানে একটি আত্মবিশ্বাসী পর্যায়ে অবস্থান করছে। শক্তিশালী অভ্যন্তরীণ চাহিদা, বিনিয়োগের গতি, রফতানির স্থিতিশীলতা এবং বিচক্ষণ নীতিনির্ধারণ দেশটিকে এক বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ প্রবৃদ্ধির পথে নিয়ে গেছে। এই ধারাবাহিকতা বজায় থাকলে আগামী বছরগুলোতে মালয়েশিয়া শুধু আঞ্চলিক নয়, বৈশ্বিক অর্থনীতিতেও একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ হয়ে উঠতে পারে।