গাজায় সেনা পাঠাতে ইন্দোনেশিয়ার প্রস্তুতি

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ১১ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬
  • ২০ বার
গাজায় ৮ হাজার সেনা পাঠাচ্ছে ইন্দোনেশিয়া

প্রকাশ: ১১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

গাজা উপত্যকাকে কেন্দ্র করে দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত ও মানবিক সংকটের মধ্যে নতুন এক আন্তর্জাতিক উদ্যোগের আলোচনায় উঠে এসেছে ইন্দোনেশিয়ার নাম। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার এই বৃহৎ মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ রাষ্ট্রটি সম্ভাব্য শান্তিরক্ষী মিশনে অংশ নিতে সর্বোচ্চ আট হাজার সেনা পাঠানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে বলে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনে জানা গেছে। তবে পরিকল্পনাটি এখনো চূড়ান্ত নয় এবং সেনা পাঠানোর সময়, সংখ্যা ও কাঠামো নিয়ে আলোচনাও চলছে।

প্রতিবেদনগুলো বলছে, ইন্দোনেশিয়ার সেনাপ্রধান জেনারেল মারুলি সিমানজুন্তাক জানিয়েছেন যে দেশটি গাজায় সম্ভাব্য শান্তিরক্ষী মিশনের জন্য পাঁচ হাজার থেকে আট হাজার সৈন্য প্রস্তুত রাখছে, যাদের বেশিরভাগই প্রকৌশলী ও চিকিৎসা ইউনিটের সদস্য। এই বাহিনীর মূল লক্ষ্য হবে যুদ্ধবিধ্বস্ত অঞ্চলে চিকিৎসা সহায়তা প্রদান, অবকাঠামো পুনর্গঠন এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা স্বাভাবিক করতে সহায়তা করা।

তবে সেনা মোতায়েনের বিষয়টি এখনো আলোচনাধীন। সেনাপ্রধান নিজেই বলেছেন, সবকিছু এখনো আলোচনার পর্যায়ে রয়েছে এবং চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। অর্থাৎ এটি তাৎক্ষণিক কোনো মোতায়েন নয়; বরং সম্ভাব্য আন্তর্জাতিক মিশনের প্রস্তুতিমূলক ধাপ।

এই উদ্যোগটি যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রস্তাবিত গাজা শান্তি পরিকল্পনার দ্বিতীয় ধাপের সঙ্গে যুক্ত বলে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সূত্রে উল্লেখ করা হয়েছে। ওই পরিকল্পনার অংশ হিসেবে একটি আন্তর্জাতিক স্থিতিশীলতা বাহিনী গঠনের কথা বলা হয়েছে, যেখানে বিভিন্ন দেশ অংশ নিতে পারে। এই বাহিনীকে “ইন্টারন্যাশনাল স্ট্যাবিলাইজেশন ফোর্স (আইএসএফ)” নামে অভিহিত করা হচ্ছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে।

ইন্দোনেশিয়ার প্রেসিডেন্ট প্রাবোও সুবিয়ান্তো আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা ও শান্তিরক্ষী কার্যক্রমে দেশের ভূমিকা বাড়াতে আগ্রহী বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন। দেশটি দীর্ঘদিন ধরেই জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে অন্যতম বড় অবদানকারী হিসেবে পরিচিত, এবং গত বছরের জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে তিনি ঘোষণা দিয়েছিলেন যে প্রয়োজনে গাজা বা অন্য কোনো অঞ্চলে শান্তি নিশ্চিত করতে ইন্দোনেশিয়া ২০ হাজার পর্যন্ত শান্তিরক্ষী পাঠাতে প্রস্তুত।

তবে এই সম্ভাব্য মিশনের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক অনুমোদন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। পূর্ববর্তী এক সরকারি বিবৃতিতে ইন্দোনেশিয়ার সামরিক কর্তৃপক্ষ জানিয়েছিল, গাজায় সেনা পাঠাতে হলে জাতিসংঘের অনুমোদন, সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর সমর্থন এবং সংঘাতে জড়িত পক্ষগুলোর সম্মতি দরকার হবে। অর্থাৎ কূটনৈতিক সমঝোতা ছাড়া এমন পদক্ষেপ বাস্তবায়ন সম্ভব নয়।

সাম্প্রতিক খবরে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র ইন্দোনেশিয়ার প্রেসিডেন্টকে ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝি একটি বৈঠকে আমন্ত্রণ জানিয়েছে, যেখানে গাজা পরিস্থিতি নিয়ে গঠিত একটি আন্তর্জাতিক বোর্ড অব পিস-এর আলোচনা হওয়ার কথা। এই বৈঠককে কেন্দ্র করেই সেনা প্রস্তুতির ঘোষণা এসেছে বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন।

এদিকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে গাজায় বাহিনী পাঠানো নিয়ে নানা দেশের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। কিছু দেশ এই উদ্যোগে আগ্রহ দেখালেও অন্যরা এখনো সেনা পাঠাতে অনীহা প্রকাশ করেছে বলে কূটনৈতিক সূত্রগুলো জানিয়েছে। ফলে সম্ভাব্য আন্তর্জাতিক বাহিনীর আকার, কাঠামো এবং নেতৃত্ব নিয়ে অনিশ্চয়তা থেকেই যাচ্ছে।

বিশ্লেষকদের মতে, গাজায় বিদেশি সেনা মোতায়েনের বিষয়টি ঐতিহাসিক গুরুত্ব বহন করতে পারে, কারণ ১৯৬৭ সালের পর সেখানে কোনো আন্তর্জাতিক বাহিনী স্থায়ীভাবে মোতায়েন হয়নি। যদি পরিকল্পনাটি বাস্তবায়িত হয়, তবে এটি মধ্যপ্রাচ্যের দীর্ঘমেয়াদি সংঘাত সমাধানের প্রচেষ্টায় নতুন অধ্যায় সূচিত করতে পারে।

তবে বাস্তবতা হলো, গাজা ইস্যু অত্যন্ত সংবেদনশীল এবং রাজনৈতিকভাবে জটিল। সেখানে আন্তর্জাতিক বাহিনী মোতায়েন মানে শুধু সামরিক প্রস্তুতি নয়, বরং আঞ্চললিক শক্তিগুলোর মধ্যে সমন্বয়, মানবিক সংস্থার সহযোগিতা এবং সংঘাতরত পক্ষগুলোর আস্থা অর্জন—এই সবকিছুর সমন্বিত প্রক্রিয়া।

মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকেও বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। যুদ্ধের ফলে বিধ্বস্ত গাজায় হাসপাতাল, পানি সরবরাহ, স্যানিটেশন ও যোগাযোগব্যবস্থা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সম্ভাব্য আন্তর্জাতিক বাহিনীর প্রকৌশল ও চিকিৎসা ইউনিট এসব ক্ষেত্রে সহায়তা দিতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে।

সুতরাং, ইন্দোনেশিয়া গাজায় ৮ হাজার সেনা পাঠাচ্ছে—এই বক্তব্য পুরোপুরি চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নয়; বরং বলা যায় দেশটি সম্ভাব্য শান্তিরক্ষী মিশনের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে এবং আন্তর্জাতিক সমঝোতার অপেক্ষায় রয়েছে। পরিস্থিতি কোন দিকে মোড় নেবে, তা নির্ভর করছে কূটনৈতিক আলোচনা, আন্তর্জাতিক অনুমোদন এবং মাঠপর্যায়ের নিরাপত্তা বাস্তবতার ওপর।

বিশ্ব রাজনীতির অস্থির এই সময়ে গাজা প্রশ্নে ইন্দোনেশিয়ার সক্রিয় ভূমিকা আন্তর্জাতিক মহলে নতুন কৌতূহল সৃষ্টি করেছে। কেউ এটিকে মানবিক দায়বদ্ধতার প্রকাশ হিসেবে দেখছেন, আবার কেউ এটিকে বৈশ্বিক ভূরাজনীতিতে প্রভাব বাড়ানোর কৌশল হিসেবে ব্যাখ্যা করছেন। বাস্তবতা যাই হোক, একটি বিষয় স্পষ্ট—গাজা সংকট এখন আর শুধু আঞ্চলিক সমস্যা নয়; এটি বৈশ্বিক কূটনীতি, নিরাপত্তা ও মানবিক দায়বদ্ধতার পরীক্ষাক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত