৯ দিনে রেমিট্যান্স ১.১৩ বিলিয়ন ডলার

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ১১ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬
  • ২০ বার
৯ দিনে রেমিট্যান্স ১.১৩ বিলিয়ন ডলার

প্রকাশ: ১১ ফেব্রুয়ারি  ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

চলতি ফেব্রুয়ারির প্রথম ৯ দিনেই প্রবাসী আয় বা রেমিট্যান্স প্রবাহে নতুন গতি লক্ষ্য করা গেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্যে দেখা যায়, ১ থেকে ৯ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত দেশে এসেছে ১১৩ কোটি ৫০ লাখ মার্কিন ডলার, যা ১ দশমিক ১৩ বিলিয়ন ডলারের সমান। গড়ে প্রতিদিন প্রবাসীরা দেশে পাঠিয়েছেন প্রায় ১২ কোটি ৬১ লাখ ডলার। অর্থনীতিবিদদের মতে, বছরের শুরুতেই রেমিট্যান্স প্রবাহের এই ইতিবাচক ধারা দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ও সামষ্টিক অর্থনীতিতে স্বস্তি দিচ্ছে।

মঙ্গলবার বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান জানান, গত বছরের একই সময়ে দেশে রেমিট্যান্স এসেছিল ৮৫ কোটি ৬০ লাখ ডলার। সে তুলনায় এবার প্রবৃদ্ধি উল্লেখযোগ্য। বছর ব্যবধানে রেমিট্যান্স প্রবাহ বেড়ে যাওয়াকে তিনি দেশের অর্থনীতির জন্য ইতিবাচক বার্তা হিসেবে দেখছেন।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, চলতি ২০২৪-২৫ অর্থবছরের জুলাই থেকে ৯ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত মোট রেমিট্যান্স এসেছে ২ হাজার ৫৬ কোটি ৫০ লাখ ডলার। আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় যা ২২ দশমিক ৩০ শতাংশ বেশি। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, বৈধ চ্যানেলে অর্থ পাঠানোর প্রবণতা বৃদ্ধি, হুন্ডি নিয়ন্ত্রণে নজরদারি এবং প্রণোদনা অব্যাহত রাখার ফলে এই প্রবৃদ্ধি সম্ভব হয়েছে।

গত কয়েক মাস ধরেই রেমিট্যান্স প্রবাহে ঊর্ধ্বমুখী ধারা দেখা যাচ্ছে। জানুয়ারি মাসে দেশে এসেছে ৩১৭ কোটি ৯ লাখ ৪০ হাজার ডলার, যা দেশের ইতিহাসে কোনো এক মাসে তৃতীয় সর্বোচ্চ এবং চলতি অর্থবছরের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ প্রবাসী আয়। এর আগে ডিসেম্বরে রেমিট্যান্স আসে ৩২২ কোটি ৬৭ লাখ ডলার, যা দেশের ইতিহাসে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ এবং চলতি অর্থবছরের এক মাসে সর্বোচ্চ প্রবাসী আয় হিসেবে রেকর্ড গড়েছে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, মধ্যপ্রাচ্য, ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকায় কর্মরত বাংলাদেশি শ্রমিকদের আয় বৃদ্ধি, নতুন শ্রমবাজার উন্মুক্ত হওয়া এবং বৈধ পথে অর্থ পাঠাতে সরকারের ২ দশমিক ৫ শতাংশ নগদ প্রণোদনা রেমিট্যান্স বৃদ্ধিতে বড় ভূমিকা রাখছে। এছাড়া ডলারের বিনিময় হার বাস্তবসম্মত হওয়ায় প্রবাসীরা ব্যাংকিং চ্যানেলেই বেশি আগ্রহী হচ্ছেন।

২০২৪-২৫ অর্থবছর জুড়ে প্রবাসীরা দেশে পাঠিয়েছেন মোট ৩০ দশমিক ৩২ বিলিয়ন ডলার, অর্থাৎ ৩ হাজার ৩২ কোটি ৮০ লাখ মার্কিন ডলার রেমিট্যান্স। দেশের ইতিহাসে কোনো নির্দিষ্ট অর্থবছরে এটি সর্বোচ্চ প্রবাসী আয়ের রেকর্ড। অর্থনীতিবিদদের মতে, রপ্তানি আয়ের পাশাপাশি রেমিট্যান্স দেশের বৈদেশিক মুদ্রার অন্যতম প্রধান উৎস। বৈদেশিক লেনদেনের ভারসাম্য রক্ষা, আমদানি ব্যয় পরিশোধ এবং রিজার্ভ স্থিতিশীল রাখতে রেমিট্যান্স গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) এক গবেষক বলেন, রেমিট্যান্স শুধু বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের ক্ষেত্রেই নয়, গ্রামীণ অর্থনীতিতেও বড় প্রভাব ফেলে। প্রবাসী আয়ের একটি বড় অংশ গ্রামে পরিবারগুলোর জীবনযাত্রার মান উন্নয়নে ব্যয় হয়। শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, আবাসন এবং ছোট ব্যবসায় বিনিয়োগে এই অর্থ ব্যবহৃত হয়। ফলে স্থানীয় অর্থনীতিতে চাহিদা সৃষ্টি হয় এবং কর্মসংস্থান বাড়ে।

তবে অর্থনীতিবিদরা সতর্ক করে বলেন, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতি কিংবা অভিবাসন নীতির পরিবর্তন রেমিট্যান্স প্রবাহে প্রভাব ফেলতে পারে। তাই শ্রমবাজার বৈচিত্র্যকরণ, দক্ষ কর্মী তৈরি এবং নতুন দেশে কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়ানোর ওপর জোর দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন তারা।

বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা জানান, হুন্ডি বা অবৈধ চ্যানেল বন্ধে নজরদারি জোরদার করা হয়েছে। একই সঙ্গে প্রবাসীদের ব্যাংকিং সুবিধা সহজ করা এবং দ্রুত লেনদেন নিশ্চিত করতে প্রযুক্তিনির্ভর সেবা সম্প্রসারণ করা হচ্ছে। ডিজিটাল রেমিট্যান্স প্ল্যাটফর্মের ব্যবহারও বাড়ছে, যা সময় ও খরচ কমাতে সহায়তা করছে।

প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরে নতুন করে কয়েক লাখ কর্মী বিদেশে গেছেন। দক্ষতা উন্নয়ন প্রশিক্ষণ এবং সরকারি উদ্যোগে নতুন বাজার অনুসন্ধানের ফলে রেমিট্যান্সে ইতিবাচক প্রভাব পড়ছে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।

সামষ্টিক অর্থনীতির বিশ্লেষণে দেখা যায়, রেমিট্যান্স প্রবাহ শক্তিশালী থাকলে দেশের চলতি হিসাবের ঘাটতি কমে এবং টাকার মান স্থিতিশীল রাখতে সহায়তা করে। একই সঙ্গে এটি ভোক্তা ব্যয় ও বিনিয়োগ বাড়িয়ে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে অবদান রাখে।

অর্থনীতিবিদদের মতে, ধারাবাহিক প্রবৃদ্ধি বজায় রাখতে হলে প্রবাসী আয়ের সুষ্ঠু ব্যবহার নিশ্চিত করা জরুরি। উৎপাদনমুখী খাতে বিনিয়োগ বাড়ানো গেলে রেমিট্যান্স দেশের দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নে আরও বড় ভূমিকা রাখতে পারে।

ফেব্রুয়ারির প্রথম ৯ দিনের পরিসংখ্যান তাই শুধু একটি সংখ্যা নয়; এটি দেশের অর্থনীতির প্রাণশক্তির প্রতিফলন। প্রবাসে ঘামঝরা পরিশ্রমে অর্জিত এই আয় দেশের পরিবার, সমাজ ও সামগ্রিক অর্থনীতিকে এগিয়ে নিতে সহায়ক হচ্ছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত