প্রকাশ: ১১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
মার্কিন কংগ্রেসের প্রভাবশালী ডেমোক্র্যাট সদস্য জেরি ন্যাডলার ইসরাইলের সাম্প্রতিক পদক্ষেপকে দখল স্থায়ী করার প্রচেষ্টা হিসেবে উল্লেখ করে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। ন্যাডলার বলেন, পশ্চিম তীরে ইসরাইলের এই নীতি কার্যত তাদের সামরিক দখলকে স্থায়ী করে তুলতে পারে এবং দুই রাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানের সম্ভাবনাকে ধ্বংস করছে।
হাউস অব রিপ্রেজেন্টেটিভসের এই জ্যেষ্ঠ আইনপ্রণেতা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে প্রকাশিত এক পোস্টে বলেন, “ইসরাইল যদি এই পদক্ষেপগুলো বাস্তবায়ন করে, তাহলে পশ্চিম তীরে তাদের সামরিক দখল কার্যত স্থায়ী হবে এবং শান্তিপূর্ণ সমাধানের পথ বন্ধ হয়ে যাবে। এছাড়া, এমন সিদ্ধান্ত ইসরাইলের প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক এবং বিশ্বজুড়ে বহু দেশের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ককেও ঝুঁকির মধ্যে ফেলে দেবে।”
ন্যাডলার দীর্ঘদিন ধরে ইসরাইলের শক্তিশালী সমর্থক হিসেবে পরিচিত ছিলেন। কিন্তু সাম্প্রতিক পদক্ষেপের কারণে তিনি দেশটির নীতির বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে সমালোচনা করতে শুরু করেছেন। যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এটি ন্যাডলারের দৃষ্টিকোণ থেকে দুই রাষ্ট্র সমাধানের গুরুত্ব এবং আন্তর্জাতিক আইনকে রক্ষা করার প্রচেষ্টা।
গত রোববার (৮ ফেব্রুয়ারি) ইসরাইলের কট্টর ডানপন্থি অর্থমন্ত্রী বেজালেল স্মোট্রিচ এবং প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরাইল কাটজ অধিকৃত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে নিয়ন্ত্রণ সম্প্রসারণের নতুন পদক্ষেপ ঘোষণা করেন। এই পদক্ষেপের ফলে ইসরাইলি সেটেলারদের জন্য নতুন বসতি স্থাপনের জমি অধিগ্রহণ আরও সহজ হবে। আন্তর্জাতিক আইন অনুসারে এসব বসতি অবৈধ, তবে ইসরাইল এই প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করছে। পাশাপাশি, সেখানে ফিলিস্তিনিদের ওপর আইন প্রয়োগের ক্ষমতা আরও জোরদার হচ্ছে এবং ধর্মীয় কিছু স্থাপনা ব্যবস্থাপনার দায়িত্বও ইসরাইলিদের হাতে দেওয়া হচ্ছে।
এই ঘোষণার পর তীব্র সমালোচনার মুখে পড়েছে ইসরাইল। ফিলিস্তিনি বিভিন্ন সংগঠন এই পদক্ষেপের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানিয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও এ বিষয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, হোয়াইট হাউসের এক কর্মকর্তা বলেছেন, পশ্চিম তীর স্থিতিশীল থাকলে ইসরাইলও নিরাপদ থাকে। হোয়াইট হাউস জানিয়েছে, ট্রাম্প এই পদক্ষেপের সঙ্গে একমত নন।
পশ্চিম তীরে ইসরাইলি নীতির বিরোধিতা কেবল আমেরিকাতেই সীমাবদ্ধ নয়। মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ আট দেশ—মিশর, ইন্দোনেশিয়া, জর্ডান, পাকিস্তান, কাতার, সৌদি আরব, তুরস্ক এবং সংযুক্ত আরব আমিরাত—এক যৌথ বিবৃতিতে ইসরাইলের পদক্ষেপের নিন্দা জানিয়েছে। দেশগুলো উল্লেখ করেছে, এই পদক্ষেপের লক্ষ্য হলো অবৈধ বসতি আরও পাকাপোক্ত করা এবং পশ্চিম তীরে নতুন আইনি ও প্রশাসনিক বাস্তবতা চাপিয়ে দেয়া।
এ পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক মহল এবং মানবাধিকার সংস্থাগুলোও উদ্বিগ্ন। পশ্চিম তীরের জনগণকে দীর্ঘদিন ধরে সীমিত নিয়ন্ত্রণ, বসতি সম্প্রসারণ ও সীমান্ত স্থাপনার ফলে দৈনন্দিন জীবনে বড় প্রভাব পড়ছে। বর্তমানে ইসরাইলের পদক্ষেপ এই সমস্যাকে আরও গভীর করে তুলছে।
উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, ইসরাইলের নতুন নীতি কেবল রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক প্রভাব ফেলছে না, বরং ফিলিস্তিনি জনগণের মানবিক পরিস্থিতিকেও জটিল করে তুলছে। শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা এবং জীবনযাত্রার মৌলিক সুবিধা সীমিত হয়ে আসছে। আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এই পদক্ষেপ দীর্ঘমেয়াদে মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি প্রতিষ্ঠার সম্ভাবনাকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে।
এই সংকটের প্রেক্ষাপটে, ন্যাডলার তার অভিজ্ঞতা ও রাজনৈতিক প্রভাব ব্যবহার করে ইসরাইলকে দুই রাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানের পথে ফেরানোর চেষ্টা করছেন। তিনি বারবার বলেছেন, “শান্তি ও স্থিতিশীলতার জন্য দীর্ঘমেয়াদি সমাধান ছাড়া কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করা অনুপযুক্ত। পশ্চিম তীরে স্থায়ী দখল দুটি দেশের জনগণের জন্যও ঝুঁকি তৈরি করবে।”
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ইসরাইলি পদক্ষেপের কারণে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের চাপ বেড়েছে। ফিলিস্তিনি জনগণ, মধ্যপ্রাচ্যের দেশসমূহ এবং বিশ্বের অন্যান্য রাষ্ট্রের নীতি ও মন্তব্য ইসরাইলের কৌশলগত সিদ্ধান্তে সরাসরি প্রভাব ফেলতে পারে। কংগ্রেস সদস্যদের পাশাপাশি মানবাধিকার সংস্থা এবং আন্তর্জাতিক সংস্থা বিষয়টিতে নজর রাখছে।
সব মিলিয়ে, ইসরাইলের এই নতুন পদক্ষেপ পশ্চিম তীরে রাজনৈতিক, মানবিক ও কূটনৈতিক জটিলতা আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। এ প্রেক্ষাপটে ন্যাডলার এবং অন্যান্য আন্তর্জাতিক নেতা ও সংস্থা শান্তি, স্থিতিশীলতা এবং দুই রাষ্ট্র সমাধানের গুরুত্ব পুনর্ব্যক্ত করছেন। এই সংকট কেবল ইসরাইল বা ফিলিস্তিনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং এটি আন্তর্জাতিক সম্পর্ক এবং মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টার ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলছে।