এপস্টিন ‘মন্দ লোক’: পুলিশকে ট্রাম্পের ফোন দাবি

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ১১ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬
  • ১০ বার
এপস্টিন ‘মন্দ লোক’: পুলিশকে ট্রাম্পের ফোন দাবি

প্রকাশ: ১১ ফেব্রুয়ারি  ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

যুক্তরাষ্ট্রের কুখ্যাত অর্থদাতা ও দণ্ডিত যৌন অপরাধী জেফরি এপস্টিনকে ঘিরে বিতর্ক যেন থামছেই না। বহু বছর আগের এক কথিত ফোনকল নতুন করে আলোচনায় এনে দিয়েছে সাবেক ও বর্তমান রাজনৈতিক সম্পর্ক, দায়-দায়িত্ব এবং সত্য গোপনের প্রশ্ন। সম্প্রতি প্রকাশিত এফবিআই নথির একটি সাক্ষাৎকারের সারাংশে দাবি করা হয়েছে, ২০০৬ সালে ফ্লোরিডার পাম বিচের তৎকালীন পুলিশপ্রধানকে ফোন করে ডোনাল্ড ট্রাম্প এপস্টিনকে ‘মন্দ প্রকৃতির লোক’ বলে উল্লেখ করেছিলেন এবং তাঁর আচরণ সম্পর্কে ‘সবাই জানত’ বলেও মন্তব্য করেছিলেন।

এই তথ্য সামনে আসার পর রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে—ট্রাম্প আসলে কী জানতেন এবং কখন থেকে জানতেন? কারণ, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বরাবরই দাবি করে আসছেন, এপস্টিনের অপরাধ সম্পর্কে তিনি কিছুই জানতেন না এবং ২০০৪ সালের দিকেই তাঁর সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করেছিলেন। অথচ এফবিআইয়ের নথিতে উঠে আসা এই ফোনকলের বর্ণনা ভিন্ন ইঙ্গিত দিচ্ছে।

প্রকাশিত নথিটি ২০১৯ সালে এফবিআইয়ের সঙ্গে পাম বিচের সাবেক পুলিশপ্রধানের একটি সাক্ষাৎকারের লিখিত সারাংশ। যদিও নথিতে তাঁর নাম মুছে দেওয়া হয়েছে, পরে ‘মায়ামি হেরাল্ড’কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে সাবেক পুলিশপ্রধান মাইকেল রাইটার নিশ্চিত করেন, তিনিই সেই ব্যক্তি এবং তিনি সত্যিই ট্রাম্পের কাছ থেকে একটি ফোনকল পেয়েছিলেন। রাইটারের ভাষ্যমতে, পাম বিচ পুলিশ যখন অপ্রাপ্তবয়স্ক মেয়েদের যৌন নির্যাতনের অভিযোগে এপস্টিনের বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু করে, তখন ট্রাম্প তাঁকে ফোন করে বলেন, “ভালো হয়েছে যে আপনারা তাঁকে থামাচ্ছেন। সবাই জানত তিনি বহু দিন ধরে এসব করছেন।”

রাইটারের দাবি অনুযায়ী, ট্রাম্প তাঁকে আরও জানান যে, তিনি এপস্টিনকে তাঁর ব্যক্তিগত ক্লাব মার-এ-লাগো থেকে বের করে দিয়েছেন। ট্রাম্প নাকি বলেন, নিউইয়র্কের মানুষ জানত এপস্টিন একজন ‘ঘৃণ্য মানুষ’। তিনি গিলেন ম্যাক্সওয়েলকে এপস্টিনের সহযোগী হিসেবেও উল্লেখ করেন এবং সতর্ক করেন, এপস্টিনের ওপর নজরদারি রাখা উচিত।

এই বক্তব্যগুলোর রাজনৈতিক গুরুত্ব অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ ২০১৯ সালে যখন ফেডারেল এজেন্টরা নারী পাচারের অভিযোগে এপস্টিনকে গ্রেপ্তার করেন, তখন সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে ট্রাম্প বলেছিলেন, তাঁর কোনো ধারণা ছিল না যে এপস্টিন এমন অপরাধে জড়িত। তিনি আরও বলেন, বহু বছর ধরে তাঁর সঙ্গে কোনো যোগাযোগ ছিল না। সেই অবস্থানের সঙ্গে ২০০৬ সালের এই কথিত ফোনকলের ভাষ্য সাংঘর্ষিক কি না, তা নিয়েই এখন বিতর্ক।

হোয়াইট হাউস অবশ্য বিষয়টি নিয়ে সতর্ক প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে। প্রেস সেক্রেটারি ক্যারোলাইন লেভিট সাম্প্রতিক এক ব্রিফিংয়ে বলেন, ফোনকলটি “ঘটে থাকতেও পারে, আবার না–ও পারে”—এ বিষয়ে তিনি নিশ্চিত নন। তবে তিনি জোর দিয়ে বলেন, প্রেসিডেন্ট সব সময়ই দাবি করেছেন যে এপস্টিনকে মার-এ-লাগো থেকে বের করে দেওয়া হয়েছিল তাঁর অসভ্য আচরণের কারণে। যদি ফোনকলটি ঘটে থাকে, তবে সেটি ট্রাম্পের পূর্ববর্তী বক্তব্যের সঙ্গেই সামঞ্জস্যপূর্ণ বলে তিনি মন্তব্য করেন।

অন্যদিকে মার্কিন বিচার বিভাগের এক কর্মকর্তা বিবিসিকে দেওয়া বিবৃতিতে বলেছেন, প্রায় ২০ বছর আগে প্রেসিডেন্ট আইন প্রয়োগকারী সংস্থার কোনো সদস্যের সঙ্গে এমন যোগাযোগ করেছিলেন—এমন সমর্থনযোগ্য প্রমাণ তাদের জানা নেই। ফলে বিষয়টি এখনো পুরোপুরি প্রমাণিত বা খণ্ডিত—কোনোটিই নয়।

এপস্টিন ও ট্রাম্পের সম্পর্ক নতুন কিছু নয়। নব্বইয়ের দশকে তাঁদের একসঙ্গে বিভিন্ন সামাজিক অনুষ্ঠানে দেখা গেছে। একাধিক ছবিতে তাঁদের পাশাপাশি দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়। তবে ট্রাম্পের দাবি, ২০০৪ সালের দিকে তাঁদের সম্পর্কের অবনতি ঘটে, যখন তিনি জানতে পারেন এপস্টিন তাঁর ক্লাবের কর্মীদের ‘ভাগিয়ে নেওয়ার’ চেষ্টা করছেন। ট্রাম্পের ভাষ্যমতে, তিনি এপস্টিনকে সতর্ক করেছিলেন এবং পরে ক্লাব থেকে বের করে দেন।

২০০৬ সালে পাম বিচ পুলিশ যখন তদন্ত শুরু করে, তখন অভিযোগ ছিল এপস্টিন অপ্রাপ্তবয়স্ক মেয়েদের যৌন নির্যাতন করেছেন। মামলাটি পরে ফেডারেল প্রসিকিউটরদের কাছে হস্তান্তর করা হয়। ২০০৮ সালে একটি বিতর্কিত চুক্তির মাধ্যমে এপস্টিন গুরুতর ফেডারেল অভিযোগ এড়িয়ে যান এবং তুলনামূলক হালকা শাস্তি ভোগ করেন। এই চুক্তি বহু বছর ধরে সমালোচিত হয়ে আসছে।

২০১৯ সালে নতুন করে গ্রেপ্তারের পর নিউইয়র্কের কারাগারে এপস্টিনের মৃত্যু হয়, যা আনুষ্ঠানিকভাবে আত্মহত্যা হিসেবে ঘোষণা করা হয়। তবে তাঁর মৃত্যু নিয়েও নানা ষড়যন্ত্র তত্ত্ব ছড়িয়ে পড়ে। এ সময়েই তাঁর দীর্ঘদিনের সহযোগী গিলেন ম্যাক্সওয়েল গ্রেপ্তার হন। ২০২১ সালে অপ্রাপ্তবয়স্ক মেয়েদের প্রলুব্ধ করার দায়ে তাঁকে দোষী সাব্যস্ত করা হয় এবং বর্তমানে তিনি ২০ বছরের কারাদণ্ড ভোগ করছেন।

সাম্প্রতিক সময়ে ম্যাক্সওয়েল মার্কিন প্রতিনিধি পরিষদের ওভারসাইট কমিটির সামনে ভার্চ্যুয়ালি সাক্ষ্য দিয়েছেন। তবে রুদ্ধদ্বার শুনানিতে তিনি প্রশ্নের উত্তর দিতে অস্বীকৃতি জানান এবং পঞ্চম সংশোধনীর অধিকার প্রয়োগ করেন। তাঁর আইনজীবী দাবি করেছেন, প্রেসিডেন্ট যদি ক্ষমার আশ্বাস দেন, তবে ম্যাক্সওয়েল পূর্ণাঙ্গ সাক্ষ্য দিতে প্রস্তুত। ট্রাম্প অবশ্য বলেছেন, তাঁকে ক্ষমা করার বিষয়ে তিনি কোনো সিদ্ধান্ত নেননি।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এফবিআইয়ের এই সাক্ষাৎকারের সারাংশ নতুন করে বিতর্ক উসকে দিলেও এটি সরাসরি কোনো অপরাধ প্রমাণ করে না। তবে এটি জনমনে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তোলে—ক্ষমতাবান ব্যক্তিরা কতটা আগে থেকে জানতেন এবং তাঁদের ভূমিকা কী ছিল। যুক্তরাষ্ট্রে আসন্ন নির্বাচনী প্রেক্ষাপটে এমন তথ্য রাজনৈতিকভাবে স্পর্শকাতর হয়ে ওঠাই স্বাভাবিক।

মানবিক দিক থেকে দেখলে, এপস্টিন কেলেঙ্কারি কেবল উচ্চপর্যায়ের রাজনীতির বিষয় নয়; এটি বহু কিশোরী ও তরুণীর জীবনের সঙ্গে জড়িত এক গভীর ট্র্যাজেডি। তাঁদের অভিজ্ঞতা, ন্যায়বিচারের দাবি এবং প্রভাবশালী ব্যক্তিদের দায়বদ্ধতার প্রশ্ন আজও সমানভাবে প্রাসঙ্গিক। ফোনকলটি ঘটেছিল কি না—তার চেয়েও বড় প্রশ্ন হলো, সমাজ ও রাষ্ট্র কতটা স্বচ্ছতার সঙ্গে এমন অপরাধের মোকাবিলা করছে।

সব মিলিয়ে, এপস্টিনকে ‘মন্দ প্রকৃতির লোক’ বলে উল্লেখ করা হয়েছিল কি না—সেই প্রশ্নের চূড়ান্ত উত্তর এখনো স্পষ্ট নয়। তবে প্রকাশিত নথি এবং সংশ্লিষ্টদের প্রতিক্রিয়া নতুন করে আলোচনার দরজা খুলে দিয়েছে। ট্রাম্পের বক্তব্য, পুলিশ কর্মকর্তার দাবি এবং বিচার বিভাগের অবস্থান—সব মিলিয়ে বিষয়টি এখনো তদন্ত ও বিশ্লেষণের পর্যায়ে রয়েছে

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত