প্রকাশ: ১১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
জাতীয় নির্বাচনের প্রাক্কালে রাজনৈতিক অঙ্গন যখন উত্তপ্ত, তখন ভোটারদের বিভ্রান্ত করতে একটি গোষ্ঠী অপচেষ্টায় লিপ্ত—এমন অভিযোগ তুলেছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান। বুধবার বেলা দুইটার কিছু পরে নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে দেওয়া এক পোস্টে তিনি দাবি করেন, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন সামনে রেখে যখন জাতি প্রস্তুতি নিচ্ছে, ঠিক তখনই পরিকল্পিতভাবে অপতথ্য ছড়িয়ে বিভ্রান্তি তৈরির চেষ্টা চলছে।
শফিকুর রহমান তাঁর পোস্টে সরাসরি কারও নাম উল্লেখ না করলেও বলেন, জামায়াতের ক্রমবর্ধমান জনপ্রিয়তা ও জনসমর্থনে ভীত হয়ে একটি গোষ্ঠী ভোটারদের মনে সন্দেহ ও বিভ্রান্তি সৃষ্টি করতে চাইছে। তিনি দলীয় নেতাকর্মী ও সাধারণ সমর্থকদের উদ্দেশে আহ্বান জানান, যেন তারা এসব অপপ্রচারে কান না দেন এবং শান্ত থেকে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় অংশ নেন। একই সঙ্গে তিনি ভোটারদের পছন্দের প্রার্থী ও প্রতীকে ভোট দেওয়ার আহ্বান জানান।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, নির্বাচনের আগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নানা ধরনের তথ্য, গুজব ও পাল্টাপাল্টি বক্তব্য ছড়িয়ে পড়া এখন প্রায় নিয়মিত ঘটনা। রাজনৈতিক দলগুলো নিজেদের অবস্থান তুলে ধরতে যেমন সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহার করছে, তেমনি বিরোধী পক্ষের বিরুদ্ধে অভিযোগ-প্রতিআরোপের ক্ষেত্রেও এই প্ল্যাটফর্মগুলো গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ফলে নির্বাচন ঘনিয়ে এলে বিভ্রান্তি ও অপতথ্যের ঝুঁকি বেড়ে যায়।
শফিকুর রহমানের এই পোস্টের সময়কালও তাৎপর্যপূর্ণ। একই দিনে নীলফামারীর সৈয়দপুর বিমানবন্দরে বিপুল পরিমাণ টাকাসহ ঠাকুরগাঁও জেলা জামায়াতের আমির বেলাল উদ্দিন প্রধানকে আটক করেছে পুলিশ। নীলফামারীর পুলিশ সুপার শেখ জাহিদুল ইসলাম গণমাধ্যমকে বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তবে আটকের ঘটনায় জামায়াতের পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিক বিস্তারিত প্রতিক্রিয়া জানানো হয়নি।
শফিকুর রহমান তাঁর ফেসবুক পোস্টে আটকের ঘটনাটি সরাসরি উল্লেখ না করলেও রাজনৈতিক মহলে ধারণা করা হচ্ছে, সাম্প্রতিক ঘটনাবলির প্রেক্ষাপটেই তিনি এ বক্তব্য দিয়েছেন। দলীয় সূত্র জানিয়েছে, বিষয়টি নিয়ে সংবাদ সম্মেলন করার প্রস্তুতি রয়েছে। সেখানে দলের অবস্থান স্পষ্ট করা হতে পারে।
পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, বিমানবন্দরে নিয়মিত তল্লাশির সময় বেলাল উদ্দিন প্রধানকে আটক করা হয়। তাঁর কাছ থেকে উদ্ধার হওয়া অর্থের পরিমাণ ও উৎস সম্পর্কে তদন্ত চলছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে এবং প্রয়োজনীয় আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
এদিকে জামায়াতে ইসলামীর নেতাকর্মীরা দাবি করছেন, নির্বাচনের আগে তাদের নেতাদের হয়রানি করা হচ্ছে। যদিও প্রশাসনের পক্ষ থেকে এমন অভিযোগ অস্বীকার করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, আইন তার নিজস্ব গতিতে চলছে এবং কারও রাজনৈতিক পরিচয় বিবেচনায় নেওয়া হচ্ছে না।
নির্বাচন সামনে রেখে দেশের রাজনৈতিক পরিবেশ ধীরে ধীরে উত্তপ্ত হয়ে উঠছে। বিভিন্ন দল মাঠপর্যায়ে প্রচার-প্রচারণা চালাচ্ছে। একই সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বক্তব্য ও পাল্টা বক্তব্যের ঝড় বইছে। নির্বাচন কমিশনও ইতোমধ্যে সুষ্ঠু ভোটগ্রহণ নিশ্চিত করতে একাধিক নির্দেশনা জারি করেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, নির্বাচনের সময় সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো ভোটারদের আস্থা বজায় রাখা। যদি ভোটাররা মনে করেন যে তথ্য বিকৃত করা হচ্ছে বা উদ্দেশ্যমূলক প্রচারণা চালানো হচ্ছে, তবে তা নির্বাচনী পরিবেশকে প্রভাবিত করতে পারে। এ অবস্থায় রাজনৈতিক দলগুলোর দায়িত্বশীল আচরণ এবং প্রশাসনের নিরপেক্ষ ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
শফিকুর রহমান তাঁর পোস্টে শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বজায় রাখার ওপর জোর দিয়েছেন। তিনি বলেন, জনগণ যেন গুজব বা অপতথ্যে বিভ্রান্ত না হয়ে নিজেদের বিবেচনায় সিদ্ধান্ত নেয়। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, গণতন্ত্রের শক্তি জনগণের সচেতন অংশগ্রহণে নিহিত।
মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে, নির্বাচনের সময় সাধারণ ভোটারদের ওপর নানা ধরনের চাপ ও বিভ্রান্তি কাজ করে। একদিকে রাজনৈতিক প্রচারণা, অন্যদিকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের দ্রুত ছড়িয়ে পড়া তথ্য—সব মিলিয়ে সত্য ও গুজবের পার্থক্য করা কঠিন হয়ে পড়ে। এমন পরিস্থিতিতে দায়িত্বশীল বক্তব্য ও স্বচ্ছ তদন্তই পারে আস্থা ফিরিয়ে আনতে।
আগামী দিনগুলোতে বেলাল উদ্দিন প্রধানের আটকের ঘটনায় কী অগ্রগতি হয় এবং জামায়াতের ঘোষিত সংবাদ সম্মেলনে কী বক্তব্য আসে, সেদিকে নজর থাকবে রাজনৈতিক মহলের। একই সঙ্গে নির্বাচন ঘিরে অপতথ্য ও বিভ্রান্তি রোধে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কী পদক্ষেপ নেয়, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
সব মিলিয়ে, নির্বাচনের প্রাক্কালে রাজনৈতিক উত্তাপ বাড়লেও মূল প্রত্যাশা একটাই—একটি সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন। দলগুলোর পারস্পরিক অভিযোগ-প্রতিআরোপের ভেতরেও সাধারণ মানুষের আকাঙ্ক্ষা হলো শান্তিপূর্ণ পরিবেশে ভোটাধিকার প্রয়োগ করা। সেই প্রত্যাশা কতটা পূরণ হবে, সেটিই এখন সময়ের বড় প্রশ্ন।