প্রকাশ: ১১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে রাজনৈতিক অঙ্গনে উত্তেজনা যখন তুঙ্গে, ঠিক সেই সময়ে ঠাকুরগাঁও জেলা জামায়াতে ইসলামীর আমির বেলাল উদ্দিনকে সৈয়দপুর বিমানবন্দরে বিপুল পরিমাণ টাকাসহ আটকের ঘটনাকে কেন্দ্র করে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। নির্বাচনপূর্ব শেষ দিনে এ ঘটনাকে ঘিরে জরুরি সংবাদ সম্মেলন করে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী অভিযোগ করেছে, তাদের নেতাকে নিয়ে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে মিথ্যা তথ্য ছড়ানো হচ্ছে এবং দলীয় ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ করার চেষ্টা চলছে।
বুধবার দুপুরে রাজধানীতে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য দেন জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এহসানুল মাহবুব জুবায়ের। তিনি বলেন, দেশের বিভিন্ন স্থানে জামায়াত ও ১১ দলীয় জোটের প্রার্থীদের সমর্থকদের ওপর হামলা, নির্বাচনী কার্যালয় ভাঙচুর এবং ভয়ভীতি প্রদর্শনের ঘটনা ঘটছে। তার দাবি, এসব ঘটনার পেছনে প্রশাসনের একটি অংশের নীরব সমর্থন রয়েছে, যা নির্বাচনী পরিবেশকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে।
সৈয়দপুর বিমানবন্দরে বেলাল উদ্দিনকে আটকের প্রসঙ্গে জুবায়ের বলেন, তার কাছে যে অর্থ পাওয়া গেছে বলে প্রচার করা হচ্ছে, তা কোনোভাবেই নির্বাচনী কাজে ব্যবহারের জন্য ছিল না। এটি ছিল তার ব্যক্তিগত ব্যবসায়িক লেনদেনের অর্থ। তিনি অভিযোগ করেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে ঘটনাটিকে ভিন্নভাবে উপস্থাপন করে জনমনে বিভ্রান্তি ছড়ানো হচ্ছে। “ঠাকুরগাঁও জেলা জামায়াতের আমিরকে নিয়ে মিথ্যা তথ্য ছড়ানো হচ্ছে। তার কাছে থাকা টাকা নির্বাচনী প্রচারণার কোনো কাজে ব্যবহারের জন্য ছিল না; এটি ছিল তার ব্যবসায়িক টাকা,”—সংবাদ সম্মেলনে বলেন জুবায়ের।
ঘটনাটির পরপরই আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পক্ষ থেকে জানানো হয়, নিয়মিত তল্লাশির সময় সন্দেহভাজন হিসেবে তাকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আটক করা হয়েছে। তবে আটকের সুনির্দিষ্ট কারণ ও টাকার পরিমাণ সম্পর্কে আনুষ্ঠানিকভাবে বিস্তারিত কিছু জানানো হয়নি। এ নিয়ে বিভিন্ন মাধ্যমে ভিন্ন ভিন্ন তথ্য ছড়িয়ে পড়ায় রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনা আরও ঘনীভূত হয়েছে।
জামায়াতের দাবি, নির্বাচনের ঠিক আগের মুহূর্তে এ ধরনের ঘটনা দলের বিরুদ্ধে পরিকল্পিত প্রচারণার অংশ হতে পারে। সংবাদ সম্মেলনে জুবায়ের বলেন, প্রশাসনের একটি অংশ একটি বিশেষ দলের প্রতি ঝুঁকে পড়েছে বলে তাদের কাছে প্রতীয়মান হচ্ছে। নির্বাচন ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের আশঙ্কা আছে কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, “আমরা লক্ষ্য করছি, কিছু কর্মকাণ্ড নিরপেক্ষ নির্বাচনী পরিবেশের পরিপন্থী। প্রশাসনের একটি অংশ এই অপচেষ্টা করছে বলে আমাদের কাছে মনে হচ্ছে।”
রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা বলছেন, নির্বাচনপূর্ব সময়ে বড় অঙ্কের অর্থ উদ্ধার বা আটকের ঘটনা স্বাভাবিকভাবেই জনমনে প্রশ্ন তোলে। একই সঙ্গে রাজনৈতিক দলগুলোও এ ধরনের ঘটনাকে নিজেদের অবস্থান ব্যাখ্যার সুযোগ হিসেবে নেয়। অতীতে বিভিন্ন নির্বাচনের আগে প্রার্থীদের বা নেতাদের কাছ থেকে নগদ অর্থ উদ্ধারের ঘটনা নিয়ে বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। অনেক সময় তা নির্বাচনী আচরণবিধি লঙ্ঘনের অভিযোগে রূপ নিয়েছে, আবার অনেক ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা দাবি করেছেন, অর্থের উৎস ছিল ব্যক্তিগত বা ব্যবসায়িক।
নির্বাচন কমিশনের আচরণবিধি অনুযায়ী, নির্বাচনী প্রচারণায় ব্যয়ের সীমা ও অর্থ ব্যবহারের বিষয়ে নির্দিষ্ট বিধিনিষেধ রয়েছে। তবে ব্যক্তিগত ব্যবসায়িক লেনদেনের অর্থ বহনের ক্ষেত্রে আইনগত ব্যাখ্যা নির্ভর করে পরিস্থিতি, প্রমাণ ও তদন্তের ওপর। আইন বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, কোনো ব্যক্তির কাছে অর্থ পাওয়া গেলেই তা নির্বাচনী অপরাধ প্রমাণ হয় না; বরং অর্থের উৎস, ব্যবহার ও উদ্দেশ্য সম্পর্কে নিরপেক্ষ তদন্ত জরুরি।
এদিকে দেশের বিভিন্ন স্থানে হামলা ও ভাঙচুরের অভিযোগের বিষয়ে স্থানীয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি। তবে নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সহিংসতা প্রতিরোধে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সতর্ক রয়েছে বলে জানা গেছে। নির্বাচন কমিশনও এর আগে সব পক্ষকে সংযত থাকার আহ্বান জানিয়েছে এবং অভিযোগ পেলে তদন্তের আশ্বাস দিয়েছে।
রাজনৈতিক পরিবেশের এই উত্তপ্ত প্রেক্ষাপটে সাধারণ ভোটারদের মধ্যে উদ্বেগও দেখা যাচ্ছে। অনেকেই চান, নির্বাচনের আগে ও পরে যেন কোনো ধরনের সহিংসতা বা বিতর্ক পরিস্থিতিকে অস্থিতিশীল না করে। ভোটারদের আস্থা ধরে রাখতে স্বচ্ছ তদন্ত ও তথ্যের স্বচ্ছতা গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা।
জামায়াত জানিয়েছে, বেলাল উদ্দিনের আটকের বিষয়ে তারা আইনি পদক্ষেপ নেবে এবং প্রয়োজনে বিস্তারিত ব্যাখ্যা জনসমক্ষে তুলে ধরবে। একই সঙ্গে তারা প্রশাসনের নিরপেক্ষ ভূমিকা নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছে। অন্যদিকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক তদন্তের ফলাফল প্রকাশ না হওয়া পর্যন্ত ঘটনার পূর্ণ চিত্র স্পষ্ট হচ্ছে না।
নির্বাচনের প্রাক্কালে এমন সংবেদনশীল ঘটনায় রাজনৈতিক উত্তেজনা বাড়লেও পর্যবেক্ষকদের মতে, গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার স্বার্থে সব পক্ষের সংযম, তথ্যভিত্তিক বক্তব্য এবং আইনি প্রক্রিয়ার প্রতি আস্থা রাখা জরুরি। ভোটাররা এখন তাকিয়ে আছেন—অভিযোগ ও পাল্টা অভিযোগের ভেতর দিয়ে শেষ পর্যন্ত কতটা স্বচ্ছ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়