প্রকাশ: ১১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
নতুন বছরের শুরুতেই এশিয়ার রাজনৈতিক মানচিত্রে এক ধরনের স্পষ্ট বার্তা ফুটে উঠেছে। জাপান, থাইল্যান্ড ও মিয়ানমারে সাম্প্রতিক নির্বাচনগুলোর ফলাফল বলছে, বহু দেশে ভোটাররা সংস্কারের চেয়ে স্থিতিশীলতা, উদারনীতির চেয়ে জাতীয়তাবাদ এবং অনিশ্চয়তার চেয়ে শক্ত অবস্থানকেই অগ্রাধিকার দিচ্ছেন। অর্থনৈতিক চাপ, ভূরাজনৈতিক টানাপোড়েন ও অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা উদ্বেগ—এই তিনের সংমিশ্রণে এশিয়ার বিভিন্ন প্রান্তে ‘রক্ষণশীল’ ও জাতীয়তাবাদী শক্তির উত্থান যেন নতুন বাস্তবতা হয়ে উঠছে।
গত রোববার জাপান ও থাইল্যান্ডে একই দিনে অনুষ্ঠিত নির্বাচনের প্রাথমিক ফলাফলেই এই প্রবণতা স্পষ্ট হয়। জাপানে এগিয়ে থাকে লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি, সংক্ষেপে এলডিপি। নামের সঙ্গে ‘লিবারেল’ থাকলেও দলটির বর্তমান নেতৃত্ব এবং নীতিগত অবস্থান অনেক পর্যবেক্ষকের কাছে দৃঢ়ভাবে রক্ষণশীল হিসেবে পরিচিত। দলটির প্রেসিডেন্ট ও প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি সামাজিকভাবে রক্ষণশীল মূল্যবোধ, শক্তিশালী জাতীয় প্রতিরক্ষা এবং চীনবিরোধী অবস্থানের জন্য আলোচিত।
জাপানের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে রক্ষণশীলতার রূপ পশ্চিমা বিশ্বের তুলনায় আলাদা। তাকাইচি সমলিঙ্গ বিবাহের বিরোধিতা করেছেন এবং পরিবার ও ঐতিহ্যগত সামাজিক কাঠামোর পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। তিনি এক-পদবি ব্যবস্থার সমর্থক, যার ফলে বিবাহের পর নারীদের স্বামীর পদবি গ্রহণ করতে হয়। একই সঙ্গে তিনি জাপানের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়ানো এবং সংবিধানের শান্তিবাদী ধারা সংশোধনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।
গত বছরের অর্থনৈতিক স্থবিরতা, মূল্যস্ফীতি ও রাজনৈতিক বিতর্কের কারণে এলডিপি চাপে ছিল। অনেক পুরোনো সমর্থক দলটিকে অতিরিক্ত সেকেলে মনে করছিলেন। কিন্তু নির্বাচনের আগে তাকাইচির কৌশলী প্রচার, সামাজিক মাধ্যমে সক্রিয় উপস্থিতি এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক তুলে ধরা ভোটারদের আস্থা পুনরুদ্ধারে ভূমিকা রাখে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জাপান সফর এবং বিরল খনিজসম্পদ নিয়ে চুক্তি স্বাক্ষর দুই দেশের কৌশলগত সম্পর্ককে আরও জোরালো করে।
তাইওয়ান প্রসঙ্গে তাকাইচির কঠোর বক্তব্য আঞ্চলিক রাজনীতিতে আলোচনার জন্ম দেয়। তিনি স্পষ্ট করে বলেন, জাপানের ভূখণ্ডের নিকটবর্তী তাইওয়ানে কোনো আগ্রাসন হলে টোকিও নীরব থাকবে না। এর পরপরই যুক্তরাষ্ট্র তাইওয়ানের কাছে বড় অঙ্কের অস্ত্র বিক্রির অনুমোদন দেয়। ফলে জাপানের ভোটে এলডিপির সাফল্য শুধু অভ্যন্তরীণ রাজনীতির ফল নয়; বরং তা ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলের কৌশলগত ভারসাম্যেও প্রভাব ফেলতে পারে।
অন্যদিকে থাইল্যান্ডে ভুমজাইথাই পার্টির জয় দেখিয়েছে, জাতীয় নিরাপত্তা ও রাজতন্ত্রের প্রতি আনুগত্যের বার্তা ভোটারদের একটি বড় অংশের কাছে গ্রহণযোগ্য হয়েছে। নির্বাচনের আগে বিভিন্ন জনমত জরিপে তরুণসমর্থিত প্রগতিশীল পিপলস পার্টিকে এগিয়ে রাখা হলেও শেষ পর্যন্ত জাতীয়তাবাদী অবস্থানই বেশি ভোট টেনেছে।
গত বছর কম্বোডিয়ার সঙ্গে সীমান্তসংঘাত থাইল্যান্ডের রাজনীতিতে গভীর প্রভাব ফেলে। সীমান্ত এলাকায় বাস্তুচ্যুতি, নিরাপত্তাহীনতা ও জাতীয় মর্যাদার প্রশ্ন ভোটারদের আবেগকে নাড়া দেয়। ভুমজাইথাই নেতা অনুতিন চার্নভিরাকুল শক্ত প্রতিরক্ষা, সীমান্তে দেয়াল নির্মাণ এবং সামরিক প্রস্তুতি জোরদারের অঙ্গীকার করেন। তাঁর বক্তব্যে কঠোর ভাষা ও প্রতিশোধমূলক অবস্থান জাতীয়তাবাদী আবেগকে উসকে দেয়। ফলাফলে দেখা যায়, পার্লামেন্টের নিম্নকক্ষে দলটি এককভাবে উল্লেখযোগ্য সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়েছে।
বিশ্লেষকেরা বলছেন, থাইল্যান্ডের ফলাফল ইঙ্গিত দিচ্ছে যে বহু ভোটার এখন সংস্কারের প্রতিশ্রুতির চেয়ে নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতাকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন। তরুণদের মধ্যে সংস্কারবাদী রাজনীতির আকর্ষণ থাকলেও জাতীয় সংকটের মুহূর্তে রক্ষণশীল শক্তিই বেশি গ্রহণযোগ্যতা পাচ্ছে।
মিয়ানমারের পরিস্থিতি আরও জটিল। সেখানে অনুষ্ঠিত নির্বাচন আন্তর্জাতিক মহলে ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়ে। প্রধান বিরোধী দলগুলো অংশ নেয়নি, মানবাধিকার সংগঠনগুলো নির্বাচনকে প্রহসন বলে উল্লেখ করেছে। তবুও সামরিক সমর্থিত ইউনিয়ন সলিডারিটি অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট পার্টি ভূমিধস জয় দাবি করেছে।
মিয়ানমারে দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক অস্থিরতা ও সশস্ত্র সংঘাতের প্রেক্ষাপটে চীনের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। বিশ্লেষকেরা মনে করেন, বেইজিং রাষ্ট্রীয় কাঠামো ভেঙে পড়ার আশঙ্কা থেকে সামরিক সরকারের প্রতি সমর্থন জোরদার করেছে। একই সঙ্গে বিরল খনিজসম্পদ ও আঞ্চলিক প্রভাব বিস্তারের স্বার্থও এখানে কাজ করছে। তবে সামরিক নেতৃত্ব নিয়ে চীনের অভ্যন্তরীণ সংশয়ও আলোচনায় আছে, যা ভবিষ্যতে রাজনৈতিক পুনর্বিন্যাসের ইঙ্গিত দিতে পারে।
এই তিন দেশের অভিজ্ঞতা মিলিয়ে একটি বড় প্রশ্ন সামনে আসে—এশিয়ার ভোটাররা কি পরিবর্তনের চেয়ে স্থিতিশীলতা চান? অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, বৈশ্বিক শক্তির প্রতিদ্বন্দ্বিতা, সীমান্তসংঘাত ও সামাজিক রূপান্তরের চাপে অনেক সমাজে অনিশ্চয়তা বেড়েছে। এমন প্রেক্ষাপটে দৃঢ় নেতৃত্ব, শক্তিশালী প্রতিরক্ষা ও জাতীয় স্বার্থরক্ষার প্রতিশ্রুতি ভোটারদের কাছে আশ্বাসবাণী হিসেবে কাজ করছে।
বাংলাদেশের মতো অর্থনৈতিকভাবে সংযুক্ত দেশের জন্য এই পরিবর্তন তাৎপর্যপূর্ণ। জাপান বাংলাদেশের অন্যতম বড় উন্নয়ন সহযোগী। থাইল্যান্ড আঞ্চলিক বাণিজ্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার। মিয়ানমারের অস্থিতিশীলতা সীমান্ত নিরাপত্তা ও শরণার্থী পরিস্থিতিকে প্রভাবিত করে। ফলে এশিয়ায় রক্ষণশীল শক্তির উত্থান কেবল রাজনৈতিক ঘটনা নয়; এর অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক প্রতিফলনও সুদূরপ্রসারী।
তবে এটাও সত্য, রক্ষণশীলতার উত্থান মানেই যে সংস্কারের পথ বন্ধ হয়ে যাচ্ছে, তা নয়। বরং অনেক ক্ষেত্রেই দলগুলো জাতীয়তাবাদী ভাষ্যকে সামনে রেখে অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার ও প্রশাসনিক সংস্কারের প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে। ভোটারদের এই মনোভাব এক ধরনের সতর্ক বার্তা—তারা দ্রুত পরিবর্তনের ঝুঁকির চেয়ে নিরাপত্তা ও ধারাবাহিকতাকে প্রাধান্য দিতে প্রস্তুত।
এশিয়ার রাজনৈতিক প্রবাহ এখন এক সন্ধিক্ষণে। একদিকে রয়েছে বৈশ্বিক শক্তির প্রতিযোগিতা, অন্যদিকে অভ্যন্তরীণ সংস্কারের দাবি। এই টানাপোড়েনের মধ্যেই ভোটাররা তাঁদের সিদ্ধান্ত দিচ্ছেন। সাম্প্রতিক নির্বাচনগুলো বলছে, অন্তত এই মুহূর্তে বহু দেশে স্থিতিশীলতার প্রতিশ্রুতিই বেশি গ্রহণযোগ্য হয়ে উঠেছে। ভবিষ্যৎ বলবে, এই রক্ষণশীল ঢেউ কতটা দীর্ঘস্থায়ী হয় এবং তা এশিয়ার কূটনীতি, অর্থনীতি ও গণতন্ত্রকে কোন পথে নিয়ে যায়।