প্রকাশ: ১১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
পশ্চিমবঙ্গের জনপ্রিয় দুই অভিনেত্রী ও রাজনীতিক নুসরাত জাহান ও মিমি চক্রবর্তীর বন্ধুত্ব বরাবরই ভক্তদের আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দুতে। টালিউডে একসঙ্গে পথচলা, রাজনীতির মঞ্চে সমান্তরাল অবস্থান, আবার সময়ের সঙ্গে দূরত্ব—সব মিলিয়ে তাদের সম্পর্ক যেন এক বহুচর্চিত অধ্যায়। সেই অধ্যায়ে নতুন আবেগ যোগ করল মিমি চক্রবর্তীর জন্মদিন উপলক্ষে নুসরাতের লেখা এক খোলা চিঠি, যা ইতোমধ্যেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক সাড়া ফেলেছে।
ভারতীয় একটি সংবাদপত্রে প্রকাশিত সেই চিঠিতে নুসরাত ফিরে গেছেন তাদের বন্ধুত্বের শুরুর দিনগুলোয়। তিনি লিখেছেন, তাদের প্রথম দেখা সম্ভবত ‘যোদ্ধা’ সিনেমার শুটিংয়ের সময়। তখন দুজনেই এসভিএফ প্রযোজনা সংস্থার সঙ্গে কাজ করছিলেন। সিনেমায় সহশিল্পী হিসেবে পরিচয় হলেও দ্রুতই সম্পর্ক গাঢ় হয়ে ওঠে। একসঙ্গে নাচের মহড়া, শুটিংয়ের ফাঁকে আড্ডা, পরস্পরের ঘরে যাতায়াত—এই ছোট ছোট মুহূর্ত থেকেই জন্ম নেয় গভীর বন্ধুত্ব।
নুসরাত স্মৃতিচারণ করে লিখেছেন, দীর্ঘ ১৫ দিনের আউটডোর শুটিংয়ে তারা ছিলেন একে অপরের ছায়াসঙ্গী। সেই সময়টুকুই নাকি তাদের সম্পর্ককে অন্য উচ্চতায় নিয়ে যায়। পরস্পরের ব্যক্তিগত কথা, গোপন কষ্ট কিংবা আনন্দ—কিছুই অজানা ছিল না। প্রতিদিন রাতের আলাপে জমে উঠত গল্প, পরিকল্পনা আর স্বপ্নের কথা। সকালের নাশতা থেকে রাতের খাবার পর্যন্ত একই মেনু ভাগ করে নেওয়া, কিংবা নির্দোষ গসিপ—সব মিলিয়ে সেই দিনগুলো ছিল নিখাদ বন্ধুত্বের।
চিঠিতে নুসরাত উল্লেখ করেছেন, তারা কখনো কারও বিরুদ্ধে নেতিবাচক আলোচনা করতেন না; বরং নিজেদের কাজ ও ভবিষ্যৎ নিয়েই ব্যস্ত থাকতেন। একসঙ্গে বিদেশভ্রমণের স্মৃতিও তিনি টেনে এনেছেন। লাস ভেগাস ও লস অ্যাঞ্জেলেস সফরের অভিজ্ঞতা তাদের সম্পর্ককে আরও দৃঢ় করেছিল বলে জানিয়েছেন তিনি।
তবে বন্ধুত্বের পথ সবসময় সমতল ছিল না। নুসরাত অকপটে লিখেছেন, মিমির রাগী স্বভাব কিংবা দুজনের মতবিরোধ কখনো কখনো তীব্র তর্কে গড়িয়েছে। টিমের সামনেও হয়েছে ঝগড়া। কিন্তু সেই রাগ স্থায়ী হয়নি। পরদিন সকালেই সব স্বাভাবিক হয়ে যেত। এই স্বাভাবিকতায়ই তিনি খুঁজে পান সম্পর্কের শক্ত ভিত্তি।
বর্তমানের মিমিকে নিয়ে নুসরাতের ভাষায়, তিনি এখন অনেক বেশি পরিণত। একসময়কার ছেলেমানুষি স্বভাব বদলে আজকের মিমি আরও দায়িত্বশীল, সংযত ও বাস্তববাদী। বন্ধুর এই পরিবর্তনকে তিনি গর্বের সঙ্গেই দেখেন। একইসঙ্গে নিজের জীবনের ব্যস্ততার কথাও উল্লেখ করেছেন নুসরাত। সন্তানকে সময় দেওয়া, সংসার সামলানো—সব মিলিয়ে আগের মতো সময় পাওয়া সম্ভব হয় না। তবুও তিনি দৃঢ়ভাবে বলেছেন, দূরত্ব মানেই বন্ধুত্বের অবসান নয়।
দুজনের সম্পর্ক নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই নানা গুঞ্জন ছিল। টালিউড ও রাজনৈতিক অঙ্গনে একসময় তাদের দূরত্ব নিয়ে জল্পনা-কল্পনার শেষ ছিল না। অনেকেই বলেছিলেন, দুই নারী দীর্ঘদিন ভালো বন্ধু থাকতে পারেন না। সেই ধারণাকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে নুসরাত লিখেছেন, গভীর বন্ধুত্ব হলে তা সময়ের পরীক্ষায় টিকে থাকে। মাঝেমধ্যে দূরত্ব তৈরি হলেও সম্পর্কের মৃত্যু ঘটে না।
রাজনীতির প্রসঙ্গেও এসেছে গুরুত্বপূর্ণ স্মৃতি। কাকতালীয়ভাবে দুজনই তৃণমূল কংগ্রেসের প্রার্থী হয়ে লোকসভা নির্বাচনে জয়ী হন। মিমির প্রার্থিতার ঘোষণা আগে হয়েছিল। ফোন করে নুসরাতকে সেই খবর জানান তিনি। এরপর একসঙ্গে সংসদে যাওয়া, নতুন দায়িত্ব নেওয়া—সবকিছুই ছিল জীবনের এক নতুন অধ্যায়। নুসরাতের ভাষায়, সংসদে তারা কখনো দুষ্টুমি করেননি; বরং দায়িত্বশীল প্রতিনিধির মতো আচরণ করেছেন।
বন্ধুর ব্যক্তিত্ব সম্পর্কে বলতে গিয়ে নুসরাত ইঙ্গিত দিয়েছেন, মিমিকে অনেকেই বাইরে থেকে যেভাবে দেখেন, তিনি সেভাবে নন। তার ভেতর ও বাহির আলাদা। ব্যক্তিগত জীবনে তিনি সংবেদনশীল, যত্নশীল ও গভীর আবেগপ্রবণ—যা সবসময় প্রকাশ পায় না।
চিঠির শেষাংশে আবেগ আরও ঘনীভূত হয়েছে। বহু জন্মদিন একসঙ্গে উদ্যাপনের স্মৃতি টেনে এনে নুসরাত ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করেছেন, মিমি যেন কখনো বদলে না যান। যেমন আছেন, তেমনই থাকুন। সুখে ও শান্তিতে থাকুন। তিনি লিখেছেন, ভালো-মন্দ সব সময়ের সাক্ষী তারা দুজন। মিমিকে আগলে রাখার দায়িত্ব তিনি নিজের কাঁধে নিয়েছেন। টালিউড যে আদর করে তাদের ‘বোনুয়া’ নাম দিয়েছে, সেটিকেও তিনি ভালোবাসার স্বীকৃতি হিসেবে দেখেন।
এই খোলা চিঠি প্রকাশের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভক্তরা আবেগাপ্লুত প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন। অনেকে বলেছেন, বন্ধুত্বের এমন স্বীকারোক্তি আজকের প্রতিযোগিতামূলক দুনিয়ায় বিরল। কেউ কেউ আবার তাদের পুরোনো ছবির দৃশ্য বা সংসদে একসঙ্গে তোলা ছবি শেয়ার করে স্মৃতিচারণ করছেন।
বিশ্লেষকদের মতে, তারকাদের ব্যক্তিগত সম্পর্ক নিয়ে জনমানসে যে আগ্রহ থাকে, এই চিঠি সেই আগ্রহকে নতুন মাত্রা দিয়েছে। একইসঙ্গে এটি দেখিয়েছে, আলোচিত ব্যক্তিত্বদের জীবনেও বন্ধুত্বের বন্ধন কতটা গুরুত্বপূর্ণ। টালিউডে পেশাগত প্রতিযোগিতা থাকলেও ব্যক্তিগত সম্পর্ক যে অটুট থাকতে পারে, নুসরাতের লেখায় তারই প্রতিফলন মিলেছে।
নুসরাত ও মিমির সম্পর্ক তাই শুধুই দুই সহশিল্পীর বন্ধুত্ব নয়; এটি সময়, দূরত্ব, সাফল্য ও সমালোচনার ভেতর দিয়ে টিকে থাকা এক আবেগের গল্প। জন্মদিনের শুভেচ্ছা জানাতে গিয়ে নুসরাত যে আবেগঘন বার্তা দিয়েছেন, তা নিছক আনুষ্ঠানিকতা নয়—বরং দীর্ঘ দিনের সঙ্গ, স্মৃতি আর বিশ্বাসের স্বীকৃতি।
বন্ধুত্বের এই প্রকাশ্য স্বীকারোক্তি আবারও প্রমাণ করল, সম্পর্কের গভীরতা প্রকাশের জন্য সবসময় একসঙ্গে থাকা জরুরি নয়। কখনো কখনো দূরত্বও সম্পর্ককে আরও পরিণত ও স্থায়ী করে তোলে। আর সেই পরিণত বন্ধুত্বের নামই আজ টালিউডে পরিচিত ‘বোনুয়া’ হিসেবে।