প্রকাশ: ১১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
সমাজ ও রাষ্ট্র পরিচালনার প্রশ্নে নেতৃত্ব নির্বাচন মানবসভ্যতার এক প্রাচীন ও সংবেদনশীল অধ্যায়। একটি জাতির অগ্রগতি, ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা এবং সামাজিক স্থিতিশীলতা অনেকাংশে নির্ভর করে তাদের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের সততা, প্রজ্ঞা ও দায়বদ্ধতার ওপর। সমসাময়িক রাজনৈতিক বাস্তবতায় জনপ্রতিনিধি নির্বাচন যেমন গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার কেন্দ্রবিন্দু, তেমনি ইসলামী চিন্তাধারায় এটি গভীর নৈতিক ও আধ্যাত্মিক তাৎপর্যপূর্ণ একটি দায়িত্ব। কোরআন ও হাদিসের আলোকে নেতৃত্ব কেবল ক্ষমতার আসন নয়; বরং এটি একটি আমানত, যার সঙ্গে জড়িয়ে আছে জবাবদিহি, ন্যায়পরায়ণতা ও জনকল্যাণের অঙ্গীকার।
ইসলামী শিক্ষায় নেতৃত্বকে সর্বাগ্রে আমানত হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা নির্দেশ দিয়েছেন, আমানত যেন তার যোগ্য ব্যক্তির হাতে অর্পণ করা হয় এবং বিচারকার্যে ন্যায় প্রতিষ্ঠিত হয়। এই নির্দেশনা শুধু ধর্মীয় দায়িত্ব নয়; এটি একটি সামাজিক নীতিমালা। রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব, প্রশাসনিক ক্ষমতা কিংবা জনপ্রতিনিধিত্ব—যে ক্ষেত্রেই হোক, অযোগ্য বা অসৎ ব্যক্তির হাতে দায়িত্ব তুলে দেওয়া ইসলামের দৃষ্টিতে আমানতের খিয়ানত। সমসাময়িক বিশ্বে দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহার যে বহু দেশের রাজনৈতিক সংকটের মূল কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে, তা বিশ্লেষণ করলে এই কোরআনিক নির্দেশনার প্রাসঙ্গিকতা আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
হাদিসে এ বিষয়ে কঠোর সতর্কবার্তাও রয়েছে। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, যখন দায়িত্ব অযোগ্য ব্যক্তির হাতে ন্যস্ত করা হবে, তখন কিয়ামতের অপেক্ষা করো। ইসলামী পণ্ডিতদের মতে, এখানে কিয়ামত শব্দটি কেবল আখিরাতের চূড়ান্ত বিচারকে নয়, বরং সামাজিক বিপর্যয় ও নৈতিক পতনের ইঙ্গিতও বহন করে। ইতিহাসের নানা অধ্যায়ে দেখা গেছে, নেতৃত্বের অযোগ্যতা রাষ্ট্রকে অর্থনৈতিক দুর্বলতা, আইনের শাসনের অবক্ষয় এবং জনআস্থার সংকটে ঠেলে দিয়েছে।
ইসলামে নেতৃত্বের মৌলিক দুটি গুণের কথা বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়েছে—সক্ষমতা ও আমানতদারিতা। হজরত ইউসুফ (আ.)-এর জীবনীতে আমরা দেখি, তিনি রাষ্ট্রীয় ভাণ্ডারের দায়িত্ব গ্রহণের সময় নিজেকে সংরক্ষণকারী ও জ্ঞানসম্পন্ন হিসেবে তুলে ধরেন। আবার হজরত মুসা (আ.) সম্পর্কে কোরআনে বলা হয়েছে, উত্তম কর্মচারী সে-ই, যে শক্তিশালী ও বিশ্বস্ত। এই দুটি আয়াত ইসলামী রাজনৈতিক দর্শনের এক গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি স্থাপন করে। নেতৃত্বপ্রার্থীকে শুধু নৈতিকভাবে সৎ হলেই চলবে না; তাকে দক্ষ, জ্ঞানসম্পন্ন ও বাস্তবতা বোঝার সক্ষমতাসম্পন্ন হতে হবে। একইভাবে কেবল দক্ষতা থাকলেই যথেষ্ট নয়, যদি তার চরিত্রে সততা ও আল্লাহভীতি অনুপস্থিত থাকে।
সমসাময়িক প্রেক্ষাপটে এই নীতিগুলো অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় ভোটাররা প্রার্থীর অতীত কর্ম, নীতি-আদর্শ, প্রশাসনিক অভিজ্ঞতা ও জনকল্যাণমূলক কাজের মূল্যায়নের মাধ্যমে সিদ্ধান্ত নেন। ইসলামী দৃষ্টিভঙ্গি এ মূল্যায়নকে আরও গভীর নৈতিক মাত্রা দেয়। কারণ ভোট দেওয়া এখানে কেবল রাজনৈতিক পছন্দ নয়; এটি এক ধরনের সাক্ষ্য। কোরআনে মুমিনদের ন্যায়ের পক্ষে দৃঢ় থাকার এবং আল্লাহর জন্য সাক্ষ্য দেওয়ার নির্দেশ রয়েছে। একজন ভোটার যখন ব্যালট প্রদান করেন, তখন তিনি কার্যত ঘোষণা করেন যে তার বিবেচনায় এই ব্যক্তি নেতৃত্বের উপযুক্ত। তাই পক্ষপাত, দলীয় অন্ধতা, ব্যক্তিগত স্বার্থ বা ভয়ভীতির কারণে অযোগ্য কাউকে সমর্থন করা ইসলামী নৈতিকতার পরিপন্থী হতে পারে।
নেতৃত্বের প্রতি লোভ ও ক্ষমতার আকাঙ্ক্ষা সম্পর্কে ইসলামে সতর্কতা উচ্চারিত হয়েছে। হাদিসে বর্ণিত আছে, যারা নেতৃত্ব কামনা করে এবং তার জন্য লোভী হয়, তাদেরকে দায়িত্ব দেওয়া উচিত নয়। এই শিক্ষা নেতৃত্বকে সেবা ও দায়িত্বের অবস্থানে স্থাপন করে, আধিপত্য বা ব্যক্তিগত স্বার্থসিদ্ধির মাধ্যম হিসেবে নয়। আধুনিক রাজনীতিতে ক্ষমতার প্রতিযোগিতা প্রায়শই ব্যক্তিকেন্দ্রিক হয়ে ওঠে; সেখানে ইসলামী শিক্ষা নেতৃত্বকে জনকল্যাণের মাধ্যম হিসেবে পুনঃসংজ্ঞায়িত করে।
একই সঙ্গে ইসলাম শূরা বা পরামর্শভিত্তিক ব্যবস্থাকে গুরুত্ব দিয়েছে। কোরআনে মুমিনদের গুণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে যে তাদের কাজ পারস্পরিক পরামর্শের ভিত্তিতে পরিচালিত হয়। অনেক গবেষকের মতে, এ নীতি গণঅংশগ্রহণমূলক শাসনব্যবস্থার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। ইতিহাসে খিলাফতে রাশেদার সময় গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তগুলো সাহাবিদের পরামর্শক্রমে গৃহীত হতো। এ থেকে বোঝা যায়, জনগণের মতামত ও অংশগ্রহণকে মূল্য দেওয়া ইসলামী রাষ্ট্রচিন্তার অংশ।
বর্তমান বৈশ্বিক বাস্তবতায় মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশগুলোতে নির্বাচন প্রক্রিয়া নানা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়—রাজনৈতিক মেরুকরণ, অর্থের প্রভাব, ভুয়া তথ্যের বিস্তার এবং প্রশাসনিক নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন। ইসলামী নীতিমালার আলোকে এ চ্যালেঞ্জগুলোর মোকাবিলায় নৈতিক সংস্কৃতি গড়ে তোলা জরুরি। রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা যেন ব্যক্তিগত বিদ্বেষে পরিণত না হয়, নির্বাচন যেন সহিংসতার ক্ষেত্র না হয় এবং জনগণের আস্থা যেন অটুট থাকে—এসবই ইসলামী ন্যায়নীতির সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ লক্ষ্য।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, নেতৃত্ব নির্বাচনের ক্ষেত্রে নাগরিকদের সচেতনতা বৃদ্ধি অপরিহার্য। শিক্ষাব্যবস্থা, গণমাধ্যম ও সামাজিক আলোচনার মাধ্যমে প্রার্থীদের যোগ্যতা, সততা ও নীতিগত অবস্থান বিশ্লেষণের সংস্কৃতি গড়ে উঠলে নির্বাচন আরও অর্থবহ হতে পারে। ইসলামী মূল্যবোধ এই সচেতনতাকে আধ্যাত্মিক মাত্রা দেয়, যেখানে সিদ্ধান্ত কেবল পার্থিব ফলাফলের জন্য নয়, বরং পরকালের জবাবদিহির বোধ থেকেও নেওয়া হয়।
সবশেষে বলা যায়, জনপ্রতিনিধি নির্বাচন ইসলামের দৃষ্টিতে একটি সামগ্রিক নৈতিক প্রক্রিয়া। এখানে প্রার্থী ও ভোটার উভয়ের ওপর দায়িত্ব বর্তায়। প্রার্থীকে হতে হবে সৎ, দক্ষ ও জনকল্যাণে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ; আর ভোটারকে হতে হবে ন্যায়নিষ্ঠ, বিবেকবান ও আল্লাহভীরু। নেতৃত্বের ভুল নির্বাচন একটি সমাজকে দীর্ঘমেয়াদি সংকটে ফেলতে পারে, আর সঠিক নির্বাচন ন্যায়ভিত্তিক ও কল্যাণমুখী রাষ্ট্র গঠনের পথ সুগম করতে পারে।
নেতৃত্ব তাই কোনো ব্যক্তিগত সম্মান নয়; এটি এক কঠিন পরীক্ষা। ইসলামী শিক্ষা আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়, ক্ষমতা সাময়িক, কিন্তু দায়িত্ব ও জবাবদিহি চিরস্থায়ী। একজন সচেতন নাগরিক যখন ভোটকেন্দ্রে যান, তখন তিনি কেবল একটি প্রতীক চিহ্নে সিল দেন না; তিনি একটি আমানতের সাক্ষ্য দেন, যা একদিন মহান আল্লাহর সামনে মূল্যায়িত হবে।