প্রকাশ: ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
আন্তর্জাতিক অঙ্গনে মানবাধিকার, নৈতিক বিনিয়োগনীতি ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের দায়বদ্ধতা নিয়ে নতুন করে বিতর্কের জন্ম দিয়েছে যুক্তরাজ্যের প্রাচীন ও প্রভাবশালী উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়-এর একটি আর্থিক সিদ্ধান্ত। সাম্প্রতিক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, বিশ্ববিদ্যালয়টির বিপুল অঙ্কের এনডাউমেন্ট তহবিল থেকে এমন একটি বিনিয়োগ করা হয়েছে, যার সঙ্গে জড়িত রয়েছে বিতর্কিত আন্তর্জাতিক করপোরেশনসমূহ—যাদের বিরুদ্ধে মধ্যপ্রাচ্যে মানবাধিকার লঙ্ঘনে সহায়তার অভিযোগ রয়েছে।
এই তথ্য প্রকাশ করেছে অনুসন্ধানী সংবাদমাধ্যম মিডল ইস্ট আই, যারা যুক্তরাষ্ট্রের সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন-এ জমা দেওয়া আর্থিক নথি বিশ্লেষণ করে বিষয়টি সামনে আনে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রায় ৪২০ কোটি পাউন্ডের এনডাউমেন্ট তহবিল পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান কেমব্রিজ ইউনিভার্সিটি ইনভেস্টমেন্ট ম্যানেজমেন্ট গত বছরের শেষ প্রান্তিকে ১৪ কোটি পাউন্ডেরও বেশি অর্থ বিনিয়োগ করেছে আইশেয়ারস ইএসজি সিলেক্ট স্ক্রিনড এসঅ্যান্ডপি ৫০০ নামের একটি তহবিলে। এই তহবিলের মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়টি পরোক্ষভাবে এমন কিছু বহুজাতিক কোম্পানির শেয়ারধারী হয়ে উঠেছে, যাদের কার্যক্রম নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে দীর্ঘদিন ধরেই বিতর্ক চলছে।
তদন্তে উঠে এসেছে, বিনিয়োগকৃত তহবিলটির অন্তর্ভুক্ত কোম্পানির তালিকায় রয়েছে মার্কিন প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান পালানতির টেকনোলজিস, শিল্পযন্ত্র প্রস্তুতকারী ক্যাটারপিলার এবং বিমান ও প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি নির্মাতা জিই অ্যারোস্পেস। মানবাধিকার সংগঠনগুলোর অভিযোগ অনুযায়ী, এসব প্রতিষ্ঠানের পণ্য বা প্রযুক্তি বিভিন্ন সময়ে গাজা উপত্যকা ও ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে পরিচালিত সামরিক অভিযানে ব্যবহৃত হয়েছে অথবা সংশ্লিষ্ট অবকাঠামোগত কর্মকাণ্ডে সহায়তা করেছে। যদিও সংশ্লিষ্ট কোম্পানিগুলো অতীতে একাধিকবার এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছে অথবা জানিয়েছে যে তারা আন্তর্জাতিক আইন মেনে ব্যবসা পরিচালনা করে।
নথিপত্র অনুযায়ী, কেমব্রিজের বিনিয়োগের একটি অংশের মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়টি পালানতির টেকনোলজিসের প্রায় আট লাখ পাউন্ড সমমূল্যের শেয়ারের মালিক হয়েছে। প্রযুক্তি বিশ্লেষকদের মতে, এই প্রতিষ্ঠানটি প্রতিরক্ষা খাতে উন্নত তথ্য বিশ্লেষণ সফটওয়্যার সরবরাহের জন্য পরিচিত এবং বিভিন্ন দেশের সামরিক সংস্থার সঙ্গে তাদের চুক্তি রয়েছে। সমালোচকদের দাবি, এই ধরনের প্রযুক্তি সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলে নজরদারি ও লক্ষ্য নির্ধারণে ব্যবহৃত হতে পারে, যা মানবাধিকার প্রশ্নকে জটিল করে তোলে। অন্যদিকে কোম্পানির পক্ষ থেকে সবসময় বলা হয়, তাদের প্রযুক্তি মূলত নিরাপত্তা ও সন্ত্রাসবিরোধী কার্যক্রমে ব্যবহারের জন্য তৈরি।
একইভাবে জিই অ্যারোস্পেসের শেয়ার মালিকানার অর্থ হলো বিশ্ববিদ্যালয়টি পরোক্ষভাবে এমন একটি শিল্পখাতের সঙ্গে যুক্ত, যা যুদ্ধবিমান ইঞ্জিন উৎপাদন করে। বিশ্লেষকদের মতে, বিশ্বব্যাপী প্রতিরক্ষা শিল্পে বিনিয়োগ প্রায়ই বিতর্ক সৃষ্টি করে, কারণ এই খাতের পণ্য যুদ্ধক্ষেত্রে ব্যবহৃত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। ক্যাটারপিলারের ক্ষেত্রেও একই ধরনের সমালোচনা রয়েছে; বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠন অতীতে অভিযোগ করেছে যে তাদের নির্মিত ভারী যন্ত্রপাতি সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলে অবকাঠামো ধ্বংসের কাজে ব্যবহৃত হয়েছে। তবে কোম্পানিটি বরাবরই বলেছে, তারা সরাসরি কোনো সামরিক অভিযানে অংশ নেয় না এবং তাদের পণ্য আন্তর্জাতিক বাজারে বৈধ বাণিজ্যিক চুক্তির ভিত্তিতেই বিক্রি করা হয়।
বিনিয়োগের বিষয়টি সামনে আসার সময়কালও আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছে। গত মাসেই বিশ্ববিদ্যালয়ের ২৯ জন জ্যেষ্ঠ শিক্ষক প্রশাসনের বিরুদ্ধে বিনিয়োগসংক্রান্ত তথ্য গোপন রাখার অভিযোগ তোলেন এবং দাবি করেন, সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় “সর্বোচ্চ পর্যায়ের অস্পষ্টতা” বজায় রাখা হয়েছে। তারও আগে ২০২৪ সালে ফিলিস্তিনপন্থী শিক্ষার্থীদের অবস্থান কর্মসূচির পর বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল যে তারা বিনিয়োগ নীতি পুনর্বিবেচনা করবে। সেই পর্যালোচনা কমিটি তখন জানিয়েছিল, অস্ত্র উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানে সরাসরি কোনো বিনিয়োগ নেই। নতুন তথ্য প্রকাশের পর সেই বক্তব্যের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের ঘনিষ্ঠ সূত্রগুলো বলছে, তহবিল ব্যবস্থাপনা পদ্ধতির কারণে বিষয়টি এতটা সরল নয়। তাদের যুক্তি হলো, বিনিয়োগগুলো সরাসরি নির্দিষ্ট কোম্পানিতে করা হয়নি; বরং তৃতীয় পক্ষের তহবিল ব্যবস্থাপকের মাধ্যমে সূচকভিত্তিক তহবিলে বিনিয়োগ করা হয়েছে, যেখানে একাধিক কোম্পানির শেয়ার স্বয়ংক্রিয়ভাবে অন্তর্ভুক্ত থাকে। ফলে কোনো একটি নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানের শেয়ার বাদ দিতে চাইলে পুরো তহবিল কাঠামো পরিবর্তন করতে হয়, যা প্রযুক্তিগতভাবে জটিল এবং আর্থিক ঝুঁকিপূর্ণ।
তবে সমালোচকেরা এই ব্যাখ্যায় সন্তুষ্ট নন। তারা বলছেন, বিশ্বজুড়ে অনেক বড় বিনিয়োগ তহবিল ইতিমধ্যে মানবাধিকার প্রশ্নে বিতর্কিত প্রতিষ্ঠান থেকে নিজেদের বিনিয়োগ প্রত্যাহার করেছে। উদাহরণ হিসেবে প্রায়ই উল্লেখ করা হচ্ছে নরওয়ের সার্বভৌম তহবিল-এর সিদ্ধান্ত, যারা অতীতে মানবাধিকার ইস্যুতে উদ্বেগের কারণে ক্যাটারপিলারের মতো প্রতিষ্ঠানের শেয়ার বিক্রি করে দেয়। সমালোচকদের মতে, এত বড় ও প্রভাবশালী একাডেমিক প্রতিষ্ঠান চাইলে নৈতিক বিনিয়োগ নীতির ক্ষেত্রে আরও দৃঢ় অবস্থান নিতে পারে।
এই বিতর্কের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সামাজিক দায়বদ্ধতা। আধুনিক বিশ্বে উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো শুধু জ্ঞানচর্চার কেন্দ্র নয়, বরং অর্থনৈতিক ও নৈতিক প্রভাবসম্পন্ন শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান হিসেবেও বিবেচিত। তাদের বিনিয়োগ সিদ্ধান্ত কখনো কখনো আন্তর্জাতিক রাজনীতি ও মানবাধিকার আলোচনার অংশ হয়ে ওঠে। বিশেষজ্ঞদের মতে, বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো প্রতিষ্ঠান যদি তাদের তহবিল ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত না করে, তাহলে শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও সাধারণ মানুষের আস্থা ক্ষুণ্ন হতে পারে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা বলছেন, বর্তমান বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে গাজা সংঘাত ঘিরে জনমত অত্যন্ত সংবেদনশীল। ফলে এই ধরনের আর্থিক সংযোগের খবর প্রকাশ পেলে তা দ্রুত আন্তর্জাতিক আলোচনার কেন্দ্রে চলে আসে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ইতিমধ্যে বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে এবং অনেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছে বিস্তারিত ব্যাখ্যা দাবি করছেন। অন্যদিকে কিছু পর্যবেক্ষক মনে করেন, বিনিয়োগের বাস্তবতা ও বৈশ্বিক অর্থনীতির জটিল কাঠামো বিবেচনায় বিষয়টি সরলভাবে বিচার করা কঠিন।
বিশেষজ্ঞদের একাংশের মতে, এ ঘটনা উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের বিনিয়োগ নীতির স্বচ্ছতা নিয়ে বৃহত্তর আলোচনার সুযোগ তৈরি করেছে। তারা বলছেন, ভবিষ্যতে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে হয়তো আরও বিস্তারিতভাবে তাদের বিনিয়োগ পোর্টফোলিও প্রকাশ করতে হবে এবং শিক্ষার্থী ও অংশীজনদের সঙ্গে আলোচনা করে নৈতিক মানদণ্ড নির্ধারণ করতে হবে। অন্যথায় এ ধরনের বিতর্ক বারবার ফিরে আসবে এবং প্রতিষ্ঠানের ভাবমূর্তিতে প্রভাব ফেলবে।
সব মিলিয়ে কেমব্রিজের এই বিনিয়োগ ইস্যু শুধু একটি আর্থিক সিদ্ধান্তের প্রশ্ন নয়; এটি নৈতিকতা, জবাবদিহি ও বৈশ্বিক রাজনীতির জটিল সংযোগের প্রতিফলন। এখন নজর রয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের পরবর্তী পদক্ষেপের দিকে—তারা কি বিনিয়োগ নীতি পুনর্বিবেচনা করবে, নাকি বর্তমান কাঠামোই বহাল রাখবে। যে সিদ্ধান্তই নেওয়া হোক, তা যে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আলোচনার বিষয় হয়ে থাকবে, সে বিষয়ে সংশ্লিষ্ট মহল প্রায় নিশ্চিত।