প্রকাশঃ ০২ এপ্রিল ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
স্পেন ও মিসরের মধ্যকার আন্তর্জাতিক প্রীতি ম্যাচকে ঘিরে ঘটে যাওয়া এক অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার জেরে আবারও আলোচনায় উঠে এসেছে ফুটবলে বিদ্বেষ ও বৈষম্যের প্রশ্ন। ম্যাচের ফলাফল নয়, বরং গ্যালারিতে উচ্চারিত মুসলিমবিদ্বেষী স্লোগানই হয়ে ওঠে সবচেয়ে বড় বিতর্ক। আর এই ঘটনার প্রেক্ষিতেই দৃঢ় অবস্থান নিয়েছেন স্পেন জাতীয় দলের তরুণ তারকা লামিনে ইয়ামাল, যিনি ধর্ম নিয়ে কটূক্তিকে সরাসরি অজ্ঞতা ও বর্ণবাদের বহিঃপ্রকাশ হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন।
স্পেনের স্পেন জাতীয় ফুটবল দল এবং মিসর জাতীয় ফুটবল দল-এর মধ্যকার এই ম্যাচটি অনুষ্ঠিত হয় বার্সেলোনার আরসিডিই স্টেডিয়াম-এ। ম্যাচটি গোলশূন্য ড্র হলেও মাঠের বাইরে ঘটে যাওয়া ঘটনাই ছাপিয়ে যায় সবকিছু। খেলার মাঝেই গ্যালারি থেকে একাধিকবার মুসলিমবিরোধী স্লোগান ভেসে আসে, যা শুধু খেলোয়াড়দের নয়, পুরো ফুটবল বিশ্বকেই বিব্রত করে তোলে।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, ম্যাচের প্রথমার্ধেই কিছু সমর্থক এমন স্লোগান দিতে শুরু করেন, যা ধর্মীয় পরিচয়কে বিদ্রূপ করে। পরিস্থিতি দ্রুত উত্তপ্ত হয়ে উঠলে স্টেডিয়াম কর্তৃপক্ষ বড় পর্দায় সতর্কবার্তা প্রচার করে। সেখানে স্পষ্টভাবে বলা হয়, যেকোনো ধরনের বিদ্বেষমূলক আচরণ থেকে বিরত থাকতে হবে। কিন্তু দুঃখজনকভাবে সেই সতর্কতাকে উপেক্ষা করে দ্বিতীয়ার্ধেও একই ধরনের স্লোগান চলতে থাকে।
এই ঘটনার পর ফুটবল অঙ্গনে শুরু হয় তীব্র প্রতিক্রিয়া। স্পেনের ফুটবল কর্তৃপক্ষ বিষয়টিকে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করার কথা জানায়। জাতীয় দলের প্রধান কোচ লুইস দে লা ফুয়েন্তে-ও এ ধরনের আচরণের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেওয়ার ইঙ্গিত দেন। তিনি বলেন, ফুটবল এমন একটি খেলা যা মানুষকে একত্রিত করে, বিভাজন নয়। তাই গ্যালারিতে এমন আচরণ কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।
এই ঘটনার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিজের অবস্থান স্পষ্ট করেন লামিনে ইয়ামাল। তিনি জানান, “আমি একজন মুসলিম। গতকাল স্টেডিয়ামে এমন স্লোগান শোনা গেছে—‘যে লাফাবে না, সে-ই মুসলিম’। এটি হয়তো সরাসরি আমাকে লক্ষ্য করে বলা হয়নি, কিন্তু একজন মুসলিম হিসেবে এটি আমাকে ব্যথিত করেছে।” তার এই বক্তব্য মুহূর্তেই সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে এবং ব্যাপক সমর্থন পায়।
ইয়ামাল তার বক্তব্যে আরও বলেন, ফুটবল কোনোভাবেই বিদ্বেষ ছড়ানোর মাধ্যম হতে পারে না। তিনি মনে করেন, ধর্মকে উপহাসের উপাদান হিসেবে ব্যবহার করা শুধু অশোভনই নয়, বরং এটি মানুষের অজ্ঞতা ও বর্ণবাদী মানসিকতার প্রতিফলন। তার ভাষায়, “ফুটবল আনন্দের খেলা। এখানে কারও ধর্ম, বর্ণ বা পরিচয়কে হেয় করার কোনো জায়গা নেই।”
মাত্র অল্প বয়সেই বিশ্ব ফুটবলে নিজের প্রতিভার স্বাক্ষর রাখা ইয়ামাল এর আগেও মানবিক ও সামাজিক বিষয়ে সচেতন অবস্থান নেওয়ার জন্য প্রশংসিত হয়েছেন। এই ঘটনাতেও তার স্পষ্ট ও দৃঢ় অবস্থান অনেকের কাছে উদাহরণ হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মের মধ্যে তিনি যে বার্তা দিয়েছেন, তা ফুটবলের বাইরেও সমাজে ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
বিশ্বজুড়ে ফুটবলে বর্ণবাদ ও ধর্মীয় বিদ্বেষ নতুন কোনো বিষয় নয়। বিভিন্ন সময়ে ইউরোপের বড় বড় লিগ ও আন্তর্জাতিক ম্যাচে এমন ঘটনা ঘটেছে, যা খেলাটির সৌন্দর্যকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। তবে প্রতিবারই খেলোয়াড়, কোচ এবং ফুটবল সংগঠনগুলো এসব ঘটনার বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে। তবুও সমস্যাটি পুরোপুরি নির্মূল করা সম্ভব হয়নি।
এই প্রেক্ষাপটে ইয়ামালের বক্তব্য নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। তার মতো একজন তরুণ তারকা যখন এমন স্পষ্ট বার্তা দেন, তখন তা শুধু একটি ঘটনার প্রতিক্রিয়া হিসেবে সীমাবদ্ধ থাকে না, বরং এটি বৃহত্তর সামাজিক বার্তায় পরিণত হয়। অনেকেই মনে করছেন, ফুটবলে বিদ্বেষ রোধে খেলোয়াড়দের এমন সক্রিয় ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
ম্যাচ শেষে ইয়ামাল সমর্থকদের প্রতিও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, যারা ইতিবাচকভাবে দলকে সমর্থন দিয়েছেন, তাদের প্রতি তিনি কৃতজ্ঞ। একই সঙ্গে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন, ভবিষ্যতে ফুটবল আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং সম্মানজনক পরিবেশে অনুষ্ঠিত হবে।
এই ঘটনার পর সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের ওপর চাপ বাড়ছে, যাতে ভবিষ্যতে এমন ঘটনা প্রতিরোধে আরও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হয়। স্টেডিয়ামে নিরাপত্তা ও আচরণবিধি বাস্তবায়নে আরও নজরদারি বাড়ানোর দাবি উঠেছে বিভিন্ন মহল থেকে।
সবশেষে বলা যায়, স্পেন-মিসর ম্যাচের এই ঘটনা ফুটবলের একটি অন্ধকার দিককে সামনে নিয়ে এসেছে। তবে একই সঙ্গে লামিনে ইয়ামালের মতো খেলোয়াড়দের সাহসী অবস্থান দেখিয়েছে, কীভাবে ইতিবাচক পরিবর্তনের পথ তৈরি করা যায়। ফুটবল যদি সত্যিই বিশ্বকে একত্রিত করার শক্তি হয়ে উঠতে চায়, তাহলে এমন বিদ্বেষের বিরুদ্ধে সম্মিলিতভাবে দাঁড়ানো ছাড়া বিকল্প নেই।