তেল সংকটে চাপে দেশের একমাত্র শোধনাগার

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : শনিবার, ৪ এপ্রিল, ২০২৬
  • ১২ বার
তেল সংকটে চাপে দেশের একমাত্র শোধনাগার

প্রকাশ: ০৪ এপ্রিল ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

দেশের জ্বালানি নিরাপত্তার অন্যতম ভিত্তি হিসেবে বিবেচিত রাষ্ট্রায়ত্ত তেল শোধনাগার ইস্টার্ন রিফাইনারি পিএলসি (ইআরএল) কাঁচামাল সংকটে পড়েছে। দেড় মাসের বেশি সময় ধরে অপরিশোধিত তেলের নতুন চালান দেশে না আসায় উৎপাদন কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। জ্বালানি সরবরাহে সম্ভাব্য চাপ মোকাবিলায় দ্রুত বিকল্প উৎস খুঁজছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। পরিস্থিতি সামাল দিতে মালয়েশিয়া থেকে ১ লাখ মেট্রিক টন ক্রুড অয়েল আমদানির চেষ্টা করছে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি)।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, চলতি মাসের ১৩ এপ্রিলের মধ্যে মালয়েশিয়া থেকে একটি চালান দেশে পৌঁছাতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে চালানটি এসে পৌঁছালে শোধনাগারটির উৎপাদন বন্ধের ঝুঁকি এড়ানো সম্ভব হতে পারে। বিপিসির চেয়ারম্যান মো. রেজানুর রহমান জানিয়েছেন, ইস্টার্ন রিফাইনারির উৎপাদন সচল রাখতে সব ধরনের চেষ্টা চালানো হচ্ছে। তিনি বলেন, দ্রুত এলসি খোলার মাধ্যমে জাহাজ ভাড়া করা হবে এবং সবকিছু পরিকল্পনা অনুযায়ী এগোলে ১০ থেকে ১৩ এপ্রিলের মধ্যেই চালান দেশে আনা সম্ভব হতে পারে।

বর্তমান পরিস্থিতির পেছনে আন্তর্জাতিক অস্থিরতার প্রভাব রয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন। মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাতের কারণে জ্বালানি পরিবহনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রুট হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হয়েছে। বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ জ্বালানি এই করিডরের মাধ্যমে পরিবহন হয়। বাংলাদেশে আমদানি করা অধিকাংশ অপরিশোধিত তেলও এই পথ দিয়েই আসে। ফলে সরবরাহে বিলম্ব হওয়ায় দেশের একমাত্র শোধনাগারটি কাঁচামালের সংকটে পড়েছে।

সাধারণত সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে ইস্টার্ন রিফাইনারির জন্য অপরিশোধিত তেল আমদানি করা হয়। তবে সাম্প্রতিক সংকটের কারণে ওই অঞ্চল থেকে নির্ধারিত সময় অনুযায়ী চালান আসেনি। ফলে বিকল্প উৎস হিসেবে মালয়েশিয়া থেকে তেল আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি সৌদি আরবে আটকে পড়া ‘নরডিক পোলাক্স’ নামের একটি জাহাজ দেশে আনার চেষ্টা চলছে বলে জানা গেছে। ধারণা করা হচ্ছে, ওই জাহাজটিতে প্রায় ১ লাখ মেট্রিক টন ক্রুড অয়েল রয়েছে।

তথ্য অনুযায়ী, সর্বশেষ গত ১৮ ফেব্রুয়ারি প্রায় ১ লাখ টন অপরিশোধিত তেলের চালান দেশে পৌঁছেছিল। এরপর থেকে নতুন কোনো চালান আসেনি। বিপিসি সাধারণত প্রতি দুই মাসে তিনটি চালান আমদানি করে থাকে। তবে চলমান সংকটের কারণে দুটি চালান বিলম্বিত হওয়ায় কাঁচামালের ঘাটতি দেখা দিয়েছে। শোধনাগার কর্তৃপক্ষ উৎপাদনের হার কিছুটা কমিয়ে বিদ্যমান মজুত দিয়ে যতদিন সম্ভব কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছে।

ইস্টার্ন রিফাইনারির দৈনিক পরিশোধন ক্ষমতা প্রায় ৪ হাজার ১০০ থেকে ৪ হাজার ২০০ মেট্রিক টন। সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, মার্চের শেষ দিকে প্রায় ৩০ হাজার টন ক্রুড অয়েল মজুত ছিল। সেই হিসাব অনুযায়ী ৭ এপ্রিল পর্যন্ত উৎপাদন চালিয়ে নেওয়া সম্ভব ছিল বলে জানা গেছে। তবে মজুত দীর্ঘ সময় ধরে ব্যবহার করার জন্য উৎপাদনের গতি কিছুটা কমানো হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।

চট্টগ্রামের পতেঙ্গায় অবস্থিত ইস্টার্ন রিফাইনারি ১৯৬৮ সালে বাণিজ্যিক উৎপাদন শুরু করে। এটি দেশের একমাত্র তেল শোধনাগার হিসেবে দীর্ঘদিন ধরে জ্বালানি সরবরাহে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। বার্ষিক প্রায় ১৫ লাখ মেট্রিক টন অপরিশোধিত তেল পরিশোধনের সক্ষমতা রয়েছে এই প্রতিষ্ঠানের। ডিজেল, পেট্রোল, কেরোসিন, এলপিজি, ফার্নেস অয়েল, ন্যাপথা এবং বিটুমিনসহ প্রায় ১৩ ধরনের জ্বালানি ও উপজাত পণ্য উৎপাদিত হয় এই শোধনাগারে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ইস্টার্ন রিফাইনারি দেশের মোট জ্বালানি চাহিদার প্রায় ২০ শতাংশ সরবরাহ করে থাকে। দেশে বছরে প্রায় ৬৮ লাখ টন জ্বালানি তেলের চাহিদা রয়েছে। শোধনাগারটি বন্ধ হয়ে গেলে চাহিদা পূরণের জন্য পরিশোধিত তেল আমদানি বাড়াতে হতে পারে, যা ব্যয় বাড়ানোর ঝুঁকি তৈরি করবে। কারণ বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম তুলনামূলক কম হলেও পরিশোধিত জ্বালানির দাম বেশি হয়ে থাকে।

ইস্টার্ন রিফাইনারির মহাব্যবস্থাপক (ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড কন্ট্রোল) মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম জানিয়েছেন, বর্তমানে যে পরিমাণ কাঁচামাল মজুত রয়েছে তা দিয়ে ১০ থেকে ১২ এপ্রিল পর্যন্ত উৎপাদন চালানো সম্ভব হতে পারে। এর মধ্যে মালয়েশিয়া থেকে নতুন চালান এসে পৌঁছালে উৎপাদন বন্ধ করার প্রয়োজন হবে না। তবে চালান আসতে বিলম্ব হলে অল্প সময়ের জন্য প্ল্যান্ট বন্ধ রাখতে হতে পারে বলে তিনি জানান।

তিনি আরও বলেন, রিফাইনারি সাময়িকভাবে বন্ধ হয়ে যাওয়া নতুন কোনো ঘটনা নয়। প্রতিবছর রক্ষণাবেক্ষণ বা ওভারহলিংয়ের জন্য এক থেকে দুই মাস উৎপাদন বন্ধ রাখতে হয়। তাই বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে অতিরিক্ত উদ্বিগ্ন হওয়ার কারণ নেই বলেও উল্লেখ করেন তিনি।

জ্বালানি খাতের বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, বৈশ্বিক রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ব্যবস্থার পরিবর্তনের কারণে জ্বালানি সরবরাহে অনিশ্চয়তা তৈরি হচ্ছে। তাই দীর্ঘমেয়াদে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিকল্প উৎস বৃদ্ধি এবং সংরক্ষণ সক্ষমতা বাড়ানো প্রয়োজন। একই সঙ্গে স্থানীয় পর্যায়ে জ্বালানি অবকাঠামো উন্নয়ন এবং কৌশলগত মজুত বৃদ্ধি করা হলে ভবিষ্যতে এ ধরনের ঝুঁকি কমানো সম্ভব হবে বলে মনে করছেন তারা।

সব মিলিয়ে কাঁচামাল সংকটের কারণে দেশের একমাত্র তেল শোধনাগার বন্ধ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হলেও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ দ্রুত বিকল্প ব্যবস্থা নেওয়ার চেষ্টা করছে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে নতুন চালান এসে পৌঁছালে পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখা সম্ভব হবে বলে আশা করা হচ্ছে। জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে সরকারের বিভিন্ন উদ্যোগ পরিস্থিতি মোকাবিলায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত