দক্ষতা ছাড়া নয় ভবিষ্যৎ, বলছে সামিট

একটি বাংলাদেশ ডেস্ক
  • আপডেট টাইম : রবিবার, ১২ এপ্রিল, ২০২৬
  • ৪৩ বার
দক্ষতা ছাড়া নয় ভবিষ্যৎ, বলছে সামিট

প্রকাশ: ১২ এপ্রিল ২০২৬। একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

বাংলাদেশের তরুণ সমাজের সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জগুলোর একটি হলো কর্মসংস্থান এবং সেই কর্মসংস্থানের জন্য প্রয়োজনীয় দক্ষতা অর্জন। বিশ্ববিদ্যালয়ের সনদ হাতে নিয়েও যখন অনেক তরুণ চাকরির বাজারে কাঙ্ক্ষিত অবস্থান তৈরি করতে পারছে না, তখন দক্ষতা-নির্ভর শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের গুরুত্ব নতুন করে সামনে এসেছে। এই বাস্তবতাকে সামনে রেখে রাজধানীতে অনুষ্ঠিত হলো ‘ইউথ এমপ্লয়াবিলিটি সামিট ২০২৬’, যেখানে দেশের শিক্ষিত তরুণদের দক্ষতাভিত্তিক ভবিষ্যতের পথে এগিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে।

রোববার রাজধানীর ড্যাফোডিল প্লাজার ৭১ মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত এই সম্মেলনের আয়োজন করে গ্লোবাল এন্টারপ্রেনারশিপ নেটওয়ার্ক বাংলাদেশ এবং ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি। ‘দক্ষতাই ভবিষ্যৎ’ প্রতিপাদ্যে আয়োজিত এই সম্মেলনে অংশ নেন দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়, পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট এবং প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানের শত শত শিক্ষার্থী, চাকরিপ্রার্থী এবং তরুণ পেশাজীবী। উপস্থিত ছিলেন শিক্ষাবিদ, নীতিনির্ধারক, করপোরেট প্রতিনিধি এবং আন্তর্জাতিক উন্নয়ন খাতের বিশেষজ্ঞরা।

সম্মেলনের প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ, এমপি। তিনি তার বক্তব্যে বলেন, বাংলাদেশের তরুণদের শুধু ডিগ্রিধারী হলে চলবে না, বরং তাদের বৈশ্বিক প্রতিযোগিতার উপযোগী দক্ষতা অর্জন করতে হবে। তার ভাষায়, “বর্তমান বিশ্বে শুধু সার্টিফিকেট দিয়ে কিছু হয় না, প্রয়োজন বাস্তব কাজের অভিজ্ঞতা, প্রযুক্তিগত দক্ষতা এবং সমস্যা সমাধানের ক্ষমতা।” তিনি আরও বলেন, এই সামিট তরুণদের মধ্যে ‘ডু-আর মেন্টালিটি’ বা কাজ করে শেখার মানসিকতা তৈরি করতে সহায়ক হবে।

সম্মেলনে অংশগ্রহণকারী তরুণদের মধ্যে ছিল এক ধরনের নতুন উদ্দীপনা। তারা শুধু বক্তৃতা শোনার জন্য নয়, বরং নিজেদের দক্ষতা প্রদর্শন এবং নতুন কিছু শেখার উদ্দেশ্যে এই আয়োজনে অংশ নিয়েছে। ইনোভেশন শোকেস অংশে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা তাদের উদ্ভাবনী প্রকল্প প্রদর্শন করে, যা উপস্থিত অতিথিদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। প্রযুক্তিনির্ভর নানা সমাধান, স্বল্প ব্যয়ে উৎপাদন প্রযুক্তি, সফটওয়্যার উদ্ভাবন—সব মিলিয়ে তরুণদের সৃজনশীলতা ও সম্ভাবনার একটি চিত্র ফুটে ওঠে।

এই আয়োজনের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল নীতি-সংলাপ বা পলিসি ডায়ালগ। এতে অংশ নেন অর্থনীতি ও উন্নয়ন খাতের অভিজ্ঞ ব্যক্তিত্ব ড. জিয়াউদ্দিন হায়দার, যিনি বিশ্বব্যাংকের সাবেক কর্মকর্তা এবং নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের সঙ্গে যুক্ত। তিনি তার বক্তব্যে বলেন, বিশ্ব শ্রমবাজার দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে এবং এই পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে না চললে বাংলাদেশের তরুণরা পিছিয়ে পড়বে। তিনি তরুণদের জন্য নতুন ধরনের দক্ষতা অর্জনের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন, যেমন—ডিজিটাল স্কিল, ডাটা অ্যানালিটিক্স, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং উদ্যোক্তা মানসিকতা।

সম্মেলনের সভাপতি হিসেবে বক্তব্য দেন ড. মো. সবুর খান, যিনি ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির ট্রাস্টি বোর্ডের চেয়ারম্যান। তিনি বলেন, “চাকরি খোঁজার মানসিকতা বদলাতে হবে। এখন সময় এসেছে নিজেকে দক্ষ জনসম্পদ হিসেবে গড়ে তোলার, যাতে বৈশ্বিক প্ল্যাটফর্মে নিজের জায়গা তৈরি করা যায়।” তিনি আরও বলেন, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর দায়িত্ব হলো শিক্ষার্থীদের শুধু তাত্ত্বিক জ্ঞান দেওয়া নয়, বরং বাস্তব জীবনের জন্য প্রস্তুত করা।

এই প্রসঙ্গে তিনি শিল্পখাত এবং শিক্ষাখাতের মধ্যে একটি কার্যকর সেতুবন্ধন তৈরির ওপর গুরুত্বারোপ করেন। কারণ, অনেক সময় দেখা যায় শিক্ষার্থীরা যে বিষয়ে পড়াশোনা করছে, চাকরির বাজারে তার চাহিদা ভিন্ন। এই ব্যবধান কমাতে হলে পাঠ্যক্রমকে সময়োপযোগী করতে হবে এবং শিল্পখাতের সঙ্গে সমন্বয় বাড়াতে হবে।

সম্মেলনে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ড্যাফোডিল গ্রুপের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ড. মোহাম্মদ নুরুজ্জামান। তিনি বলেন, বাংলাদেশের তরুণরা অত্যন্ত সম্ভাবনাময়, তবে তাদের সঠিক দিকনির্দেশনা প্রয়োজন। তিনি দক্ষতা উন্নয়নের বিভিন্ন দিক তুলে ধরে বলেন, বর্তমান যুগে প্রযুক্তি-নির্ভর দক্ষতা অর্জন না করলে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়বে।

স্বাগত বক্তব্যে ড. কে. এম. হাসান রিপন বলেন, এই সামিট প্রমাণ করেছে যে দেশের তরুণরা নিজেদের উন্নয়নে আগ্রহী। তিনি বলেন, “তাদের শুধু সঠিক পথ দেখাতে হবে। একবার তারা সুযোগ পেলে তারা শুধু দেশের নয়, বিশ্বের অর্থনীতিতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারবে।”

সম্মেলনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল করপোরেট নেতাদের সঙ্গে তরুণদের সরাসরি মতবিনিময়ের সুযোগ। এতে অংশগ্রহণকারীরা চাকরির বাজার, দক্ষতা উন্নয়ন এবং ক্যারিয়ার পরিকল্পনা সম্পর্কে বাস্তব অভিজ্ঞতা জানতে পারেন। এই অংশটি তরুণদের জন্য বিশেষভাবে উপকারী ছিল, কারণ তারা সরাসরি শিল্পখাতের প্রতিনিধিদের কাছ থেকে পরামর্শ গ্রহণ করতে পেরেছে।

বাংলাদেশে তরুণদের একটি বড় অংশ এখনো বেকার বা আংশিক বেকার। অনেকেই শিক্ষাজীবন শেষ করার পরও চাকরি খুঁজে পেতে হিমশিম খাচ্ছেন। এই পরিস্থিতিতে এমন একটি সম্মেলন শুধু একটি ইভেন্ট নয়, বরং একটি বার্তা—যেখানে বলা হচ্ছে, ভবিষ্যতের জন্য প্রস্তুত হতে হলে দক্ষতার বিকল্প নেই।

সম্মেলনে অংশ নেওয়া এক শিক্ষার্থী বলেন, “আমরা এতদিন শুধু পড়াশোনার ওপর গুরুত্ব দিয়েছি, কিন্তু এখানে এসে বুঝতে পারলাম বাস্তব দক্ষতা কতটা গুরুত্বপূর্ণ।” তার এই উপলব্ধি দেশের হাজারো তরুণের বাস্তব অভিজ্ঞতার প্রতিফলন।

সব মিলিয়ে ‘ইউথ এমপ্লয়াবিলিটি সামিট ২০২৬’ একটি সময়োপযোগী উদ্যোগ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। এটি শুধু তরুণদের সচেতন করেছে তা নয়, বরং নীতিনির্ধারক, শিক্ষাবিদ এবং শিল্পখাতের প্রতিনিধিদের মধ্যে একটি সংলাপের ক্ষেত্র তৈরি করেছে। এই সংলাপ যদি বাস্তব পদক্ষেপে রূপ নেয়, তাহলে দেশের দক্ষতা সংকট মোকাবিলায় এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

শেষ পর্যন্ত বলা যায়, বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে তার তরুণদের ওপর। আর সেই তরুণদের যদি দক্ষ, আত্মবিশ্বাসী এবং বিশ্বমানের কর্মী হিসেবে গড়ে তোলা যায়, তাহলে দেশ শুধু অর্থনৈতিকভাবেই নয়, সামগ্রিকভাবেও এগিয়ে যাবে। এই সম্মেলন সেই যাত্রার একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত