ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতি দেওয়ার আন্তর্জাতিক উদ্যোগে ইউরোপীয় দেশগুলোর প্রশংসা করলেন এরদোয়ান

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : শুক্রবার, ১ আগস্ট, ২০২৫
  • ৮০ বার

প্রকাশ: ০১ আগস্ট ২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক | একটি বাংলাদেশ অনলাইন

মধ্যপ্রাচ্যের দীর্ঘস্থায়ী সংকট ও গাজায় চলমান মানবিক বিপর্যয়ের প্রেক্ষাপটে ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতি দেওয়ার বিষয়ে ইউরোপীয় দেশগুলোর সাম্প্রতিক উদ্যোগকে “ন্যায়বোধ ও মানবিকতার চেতনার প্রকাশ” হিসেবে অভিহিত করেছেন তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান। আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক মহলে আলোচিত এই বিষয়ে মিডল ইস্ট আই-এ প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে তাঁর এ মন্তব্য, যেখানে তিনি ফ্রান্স ও যুক্তরাজ্যের মতো দেশগুলোর অবস্থানকে বিশেষভাবে গুরুত্ব দিয়েছেন।

এরদোয়ান বলেছেন, “ইউরোপ থেকে, বিশেষ করে ফ্রান্স ও ব্রিটেনের দিক থেকে সাম্প্রতিক মানবিক প্রতিক্রিয়াগুলো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দেওয়ার প্রত্যেকটি পদক্ষেপকে আমরা আন্তরিকভাবে স্বাগত জানাই।” গাজার মানবিক দুর্দশার প্রসঙ্গে তিনি আরও বলেন, “কেউ নিশ্চুপ থাকতে পারে না যখন শিশুরা ক্ষুধায় মারা যাচ্ছে, এবং খাবারের সন্ধানে বের হওয়া নিরস্ত্র বেসামরিক নাগরিকদের সরাসরি গুলি করে হত্যা করা হচ্ছে। এটা সভ্যতার লজ্জা।”

এই প্রেক্ষাপটে ইউরোপের একাধিক দেশের ঘোষিত বা সম্ভাব্য স্বীকৃতির সিদ্ধান্ত আন্তর্জাতিক মহলে ফিলিস্তিন প্রশ্নে নতুন গতিপ্রবাহ তৈরি করছে। সম্প্রতি পর্তুগাল জানিয়েছে, তারা আগামী সেপ্টেম্বরে নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮০তম বার্ষিক অধিবেশনের উচ্চ পর্যায়ের বৈঠকে ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতি দেওয়ার বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে পারে। পর্তুগিজ প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে প্রকাশিত এক বিবৃতিতে জানানো হয়েছে, “ফিলিস্তিনকে রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার বিষয়টি সক্রিয়ভাবে বিবেচনা করা হচ্ছে, এবং এটি একটি গঠনমূলক কূটনৈতিক প্রক্রিয়ার অংশ।”

এদিকে, কানাডাও একই ধরনের পদক্ষেপের ইঙ্গিত দিয়েছে। এক সংবাদ সম্মেলনে কানাডার প্রেসিডেন্ট মার্ক কার্নি বলেন, “গাজায় মানুষের দুর্দশা অসহনীয় হয়ে পড়েছে। আমরা দ্রুত অবনতি লক্ষ্য করছি। এ অবস্থায় জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনের সময় ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতি দেওয়ার বিষয়ে আমাদের পরিকল্পনা রয়েছে।” তবে এই স্বীকৃতি নির্ভর করছে কিছু শর্ত পূরণের ওপর—যেমন ফিলিস্তিন কর্তৃপক্ষের অভ্যন্তরীণ শাসন ব্যবস্থার সংস্কার, সন্ত্রাসী গোষ্ঠী হামাসকে রাজনীতি থেকে বাদ দেওয়া, ২০২৬ সালের মধ্যে সাধারণ নির্বাচন আয়োজনে প্রতিশ্রুতি, এবং ওই ভূখণ্ডকে নিরস্ত্রীকরণের উদ্যোগ।

এর আগে ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ ফিলিস্তিনকে রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার সম্ভাবনার কথা প্রকাশ্যে ঘোষণা করেছিলেন। তিনি বলেন, “এটি সময়ের দাবি, এবং এর মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্যে একটি দীর্ঘস্থায়ী শান্তি প্রক্রিয়ার ভিত্তি তৈরি হতে পারে।” একইভাবে যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার সম্প্রতি জানান, ইসরায়েল যদি নির্দিষ্ট মানবাধিকার শর্তসমূহ না মানে, তবে যুক্তরাজ্যও ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতি দেওয়ার পথে এগোবে।

জাতিসংঘের ১৯৩টি সদস্য রাষ্ট্রের মধ্যে বর্তমানে প্রায় ১৫০টি দেশ ফিলিস্তিনকে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে বেশিরভাগ আফ্রিকান, এশীয় ও লাতিন আমেরিকান দেশ, যারা বহু আগে থেকেই ফিলিস্তিনের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে।

তবে ইউরোপীয় রাষ্ট্রগুলো এতদিন পর্যন্ত এই ইস্যুতে বরাবরই দ্বিধান্বিত অবস্থানে ছিল। ইসরায়েলের সঙ্গে কৌশলগত সম্পর্ক, নিরাপত্তা চুক্তি এবং মার্কিন প্রশাসনের ভূরাজনৈতিক চাপের কারণে তারা সরাসরি স্বীকৃতির পথে হাঁটেনি। কিন্তু গাজায় চলমান সংঘাত, বেসামরিক হতাহতের বিস্তার, জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থার উদ্বেগ—সব মিলিয়ে ইউরোপের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটেও একটি পরিবর্তন সূচিত হচ্ছে।

বিশ্লেষকদের মতে, ইউরোপীয় ইউনিয়নের অভ্যন্তরে ফিলিস্তিন ইস্যুতে নতুন করে নীতিগত বিতর্কের সূচনা হয়েছে। একদিকে রয়েছে ঐতিহাসিক জটিলতা, অন্যদিকে মানবিক ও কূটনৈতিক দায়বদ্ধতা। এই দুইয়ের সমন্বয়ে ইউরোপের বড় বড় রাষ্ট্রগুলো এখন একাধিক পর্যালোচনার মধ্য দিয়ে এগোচ্ছে।

তুরস্কের প্রেসিডেন্ট এরদোয়ান বরাবরই ফিলিস্তিন ইস্যুতে সক্রিয় অবস্থান নিয়ে কথা বলে আসছেন। এবারের প্রতিক্রিয়াও সেই ধারাবাহিকতারই অংশ। তবে ইউরোপীয় রাষ্ট্রগুলো যদি সত্যিই সেপ্টেম্বর মাসে ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতি দেওয়ার সিদ্ধান্ত কার্যকর করে, তাহলে মধ্যপ্রাচ্য এবং আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে তা এক নতুন মেরুকরণের সূচনা করবে বলেই মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

এই মুহূর্তে ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের স্বীকৃতি বিশ্ব রাজনীতির এক কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। এর মাধ্যমে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় শুধু একটি নির্যাতিত জাতির পাশে দাঁড়াচ্ছে না, বরং এটাও প্রমাণ করছে যে, মানবাধিকারের প্রশ্নে আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে নতুন সংবেদনশীলতা তৈরি হয়েছে—যা ভবিষ্যতের জটিল ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত