প্রকাশ: ০৬ আগস্ট ২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক।একটি বাংলাদেশ অনলাইন
নারীদের জীবনে শরীর ও হরমোনগত পরিবর্তনের ভেতর দিয়ে যেসব গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় অতিক্রম করতে হয়, তার মধ্যে থাইরয়েড এবং মেনোপজ অন্যতম। যদিও এ দুটি বিষয় সম্পূর্ণ ভিন্ন শারীরবৃত্তীয় প্রক্রিয়া, তবু নারীদের দেহে এদের প্রভাব, আন্তঃসম্পর্ক এবং দৈনন্দিন জীবনে পরিবর্তন আনার ক্ষমতা এতটাই গভীর যে, এগুলোর সঠিক সচেতনতা ও চিকিৎসা না থাকলে নারী স্বাস্থ্য মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হতে পারে।
থাইরয়েড হলো গলার সামনে থাকা প্রজাপতির মতো দেখতে একটি অন্তঃক্ষরা গ্রন্থি, যা থাইরক্সিন (T4) ও ট্রাই-আয়োডোথাইরোনিন (T3) নামক হরমোন নিঃসরণ করে। এই হরমোনগুলো শরীরের বিপাকক্রিয়া, তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ, হৃদস্পন্দন, চুল ও ত্বকের স্বাস্থ্য, এমনকি মানসিক অবস্থার উপরও প্রভাব ফেলে। থাইরয়েড হরমোন স্বাভাবিক মাত্রার চেয়ে কম নিঃসরণ হলে সেটিকে বলা হয় হাইপোথাইরয়েডিজম, আর বেশি হলে বলা হয় হাইপারথাইরয়েডিজম।
অন্যদিকে, মেনোপজ হচ্ছে নারীদের প্রজননক্ষমতার এক প্রাকৃতিক অবসান, যখন নিয়মিত মাসিক চক্র স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়ে যায়। এটি সাধারণত ৪৫ থেকে ৫৫ বছর বয়সের মধ্যে ঘটে এবং এ সময় শরীরে ইস্ট্রোজেন ও প্রোজেস্টেরনের মতো হরমোনের মাত্রা ধীরে ধীরে কমে আসে। ফলে নারীদেহে নানা ধরনের শারীরিক ও মানসিক পরিবর্তন দেখা দিতে পারে, যেমন অতিরিক্ত গরম অনুভব, ঘুমে সমস্যা, মনমেজাজের ওঠানামা, হাড়ের ক্ষয়, যৌন আগ্রহে হ্রাস ইত্যাদি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, থাইরয়েড এবং মেনোপজ – এই দুই অবস্থার মধ্যে এক ধরনের জটিল সম্পর্ক রয়েছে। মেনোপজের সময় হরমোনের ওঠানামা অনেক সময় থাইরয়েড হরমোনের ভারসাম্যকেও প্রভাবিত করে। অনেক নারী মেনোপজ চলাকালীন হঠাৎ করে ওজন বৃদ্ধি, অবসাদ, চুল পড়া বা স্মৃতিভ্রংশের মতো লক্ষণ নিয়ে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হন। অথচ এসব লক্ষণ কখনো কখনো থাইরয়েডের সমস্যার সাথেও সম্পর্কিত হতে পারে। বিশেষ করে হাইপোথাইরয়েডিজমের উপসর্গ ও মেনোপজের লক্ষণগুলো প্রায় একরকম, ফলে সঠিকভাবে রোগ নির্ণয় না হলে সমস্যাটি আরও জটিল হয়ে পড়ে।
আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—মেনোপজ পরবর্তী সময়টিতে থাইরয়েড রোগের ঝুঁকি বেড়ে যায়। একাধিক গবেষণায় দেখা গেছে, ৫০ বছরের পর নারীদেহে থাইরয়েড গ্রন্থির কার্যক্ষমতা কমে যাওয়ার প্রবণতা বেশি থাকে। তাই এই বয়সে নারীদের নিয়মিত হরমোন পরীক্ষার মাধ্যমে থাইরয়েডের অবস্থা পর্যবেক্ষণ করাটা অত্যন্ত জরুরি।
তবে আশার কথা হলো, চিকিৎসা বিজ্ঞানের অগ্রগতির ফলে এখন উভয় সমস্যাই নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব। থাইরয়েড হরমোনের ভারসাম্য রক্ষায় ওষুধ, সুষম খাদ্যাভ্যাস ও পর্যাপ্ত বিশ্রাম অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মেনোপজকালীন ও পরবর্তী জীবনযাত্রাকে স্বাভাবিক ও সুস্থ রাখতে স্বাস্থ্যকর জীবনধারা, মানসিক স্থিতি বজায় রাখা এবং প্রয়োজনে হরমোন রিপ্লেসমেন্ট থেরাপি (HRT) নেওয়া যেতে পারে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী।
নারীদের জন্য এই দুটি হরমোনজনিত পর্যায়কে উপেক্ষা করা মানে হচ্ছে স্বাস্থ্য ঝুঁকিকে আমন্ত্রণ জানানো। বিশেষ করে যারা কর্মজীবী, শহরে ব্যস্ত জীবনযাপন করেন বা বার্ধক্যের দিকে অগ্রসর হচ্ছেন—তাদের উচিত নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা, সচেতনতা এবং স্বাস্থ্য বিষয়ে যথাযথ শিক্ষা গ্রহণ করা। কারণ, নারী স্বাস্থ্যের প্রতিটি পর্যায় শুধু ব্যক্তিগত নয়, বরং সামাজিক এবং পারিবারিক সুস্থতার সঙ্গেও ওতপ্রোতভাবে জড়িত।
সামাজিক স্তরেও প্রয়োজন স্বাস্থ্যসংক্রান্ত সচেতনতা ও আলোচনার বিস্তার, যেন নারীরা নির্দ্বিধায় থাইরয়েড ও মেনোপজ সংক্রান্ত সমস্যাগুলো নিয়ে কথা বলতে পারেন, সমাধান খুঁজে পান এবং একটি সুস্থ, সাবলীল জীবন উপভোগ করতে পারেন। থাইরয়েড এবং মেনোপজ—দুই বিপরীতমুখী ধারা হলেও, এদের প্রভাব ও গুরুত্ব অনস্বীকার্য, যা নারীজীবনের একটি বড় বাস্তবতা।










