রবিনসন-আর্চারের আগুনে ১১০ রানেই শেষ পাকিস্তান

Reporter Name
  • আপডেট টাইম : শনিবার, ২৯ আগস্ট, ২০২৬
  • ৪৬ বার
রবিনসন-আর্চারের আগুনে ১১০ রানেই শেষ পাকিস্তান

প্রকাশ: ২৯ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

লর্ডসের ঐতিহাসিক মাঠে প্রথম দিনের লড়াইয়ে পাকিস্তানি বোলারদের দাপট দেখা গেলেও দ্বিতীয় দিনে ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ পুরোপুরি নিজেদের হাতে তুলে নিয়েছে ইংল্যান্ড। ওলি রবিনসনের নিখুঁত লাইন-লেন্থ এবং জফরা আর্চারের ভয়ংকর গতির সামনে পাকিস্তানের ব্যাটিং লাইনআপ ধসে পড়ে মাত্র ১১০ রানে। প্রথম ইনিংসে ২৯০ রান করা ইংল্যান্ড ১৮০ রানের বড় লিড নেওয়ার পর দ্বিতীয় ইনিংসেও দিন শেষ করেছে শক্ত অবস্থানে।

দ্বিতীয় দিনের খেলা শেষে ইংল্যান্ডের সংগ্রহ ৩ উইকেটে ৮১ রান। ফলে পাকিস্তানের বিপক্ষে তাদের সামগ্রিক লিড দাঁড়িয়েছে ২৬১ রানে। হাতে এখনো সাত উইকেট থাকায় ম্যাচে স্বাগতিকদের অবস্থান অত্যন্ত শক্তিশালী। লর্ডস টেস্টের নিয়ন্ত্রণ পাকিস্তানের হাত থেকে কীভাবে এত দ্রুত ইংল্যান্ডের দখলে চলে গেল, দ্বিতীয় দিনের ক্রিকেট তারই একটি স্পষ্ট উদাহরণ হয়ে থাকল।

প্রথম দিনের শেষ ভাগে পাকিস্তানের বোলাররা ইংল্যান্ডকে চাপে রেখেছিল। একসময় স্বাগতিকদের স্কোর ছিল ৯ উইকেটে ২৪৮ রান। তখন মনে হচ্ছিল, পাকিস্তান দ্রুত শেষ উইকেট তুলে নিয়ে ইংল্যান্ডকে তুলনামূলক কম রানে আটকে দিতে পারবে। কিন্তু দ্বিতীয় দিনের শুরুতে গাস অ্যাটকিনসন ও জশ টাংয়ের শেষ উইকেট জুটি পাকিস্তানের পরিকল্পনায় বড় ধাক্কা দেয়।

শেষ দিকে অ্যাটকিনসন আক্রমণাত্মক ব্যাটিং করে ৪৫ রান করেন। জশ টাং অপরাজিত থাকেন ৩০ রানে। তাদের গুরুত্বপূর্ণ অবদানে ইংল্যান্ডের প্রথম ইনিংসের সংগ্রহ গিয়ে দাঁড়ায় ২৯০ রানে। পাকিস্তানের জন্য এটি ছিল হতাশার শুরু, কারণ ২৪৮ রানে ৯ উইকেট হারানো প্রতিপক্ষকে দ্রুত গুটিয়ে দেওয়ার সুযোগ তারা পুরোপুরি কাজে লাগাতে পারেনি।

তবে পাকিস্তানের প্রকৃত বিপর্যয় শুরু হয় নিজেদের প্রথম ইনিংসে ব্যাট করতে নেমে। লর্ডসের উইকেটে ইংল্যান্ডের পেসাররা শুরু থেকেই এমন চাপ তৈরি করেন, যার সামনে পাকিস্তানি ব্যাটাররা খুব কম সময়ই স্বস্তিতে থাকতে পেরেছেন। আর্চারের গতি, রবিনসনের নিয়ন্ত্রণ এবং জশ টাংয়ের কার্যকর বোলিং সফরকারীদের ব্যাটিং লাইনআপকে দ্রুত ভেঙে দেয়।

পাকিস্তানের ইনিংসে একমাত্র উল্লেখযোগ্য প্রতিরোধ গড়ে তোলেন তরুণ ওপেনার আজান আওয়াইস। তিনি ধৈর্য ধরে ইংল্যান্ডের বোলারদের মোকাবিলা করে ৪৬ রান করেন। কঠিন পরিস্থিতিতে তার ইনিংস পাকিস্তানের জন্য কিছুটা আশার আলো দেখালেও অন্য প্রান্তে নিয়মিত উইকেট হারানোর কারণে দলটি বড় সংগ্রহের দিকে এগোতে পারেনি।

পাকিস্তানের ব্যাটিংয়ের সবচেয়ে বড় সমস্যা ছিল জুটি গড়তে না পারা। ইংল্যান্ডের পেসাররা একের পর এক ব্যাটারকে ফিরিয়ে দিয়ে কোনো ব্যাটিং জুটি গড়ে ওঠার সুযোগই দেননি। সৌদ শাকিল ১৬ রান করলেও দলের আর কোনো ব্যাটার উল্লেখযোগ্য প্রতিরোধ গড়তে পারেননি। শেষ পর্যন্ত মাত্র ৩৭ দশমিক ২ ওভারে ১১০ রানে গুটিয়ে যায় পাকিস্তান।

এই ধসের প্রধান নায়ক ছিলেন ওলি রবিনসন। তিনি ১৩ ওভারে মাত্র ১১ রান দিয়ে চার উইকেট নেন। তার বোলিংয়ে ছিল অসাধারণ নিয়ন্ত্রণ। একের পর এক বল একই জায়গায় রেখে পাকিস্তানি ব্যাটারদের ওপর চাপ তৈরি করেন তিনি। ছয়টি মেডেনসহ তার এই বোলিং স্পেল লর্ডস টেস্টের দ্বিতীয় দিনের অন্যতম সেরা মুহূর্ত হয়ে থাকে।

রবিনসনকে দারুণভাবে সহযোগিতা করেন জফরা আর্চার। গতির ঝড়ে পাকিস্তানের ব্যাটারদের স্বাভাবিক ছন্দ নষ্ট করে দেন তিনি। আর্চার নেন তিন উইকেট। তার ধারাবাহিক গতিময় বোলিং এবং রবিনসনের নিয়ন্ত্রিত আক্রমণের সমন্বয় পাকিস্তানের জন্য ভয়ংকর হয়ে ওঠে।

জশ টাংও ইংল্যান্ডের বোলিং আক্রমণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। তিনি দুই উইকেট তুলে নিয়ে পাকিস্তানের মিডল অর্ডারের ওপর চাপ বাড়িয়ে দেন। ইংল্যান্ডের চার পেসারের সম্মিলিত আক্রমণের সামনে পাকিস্তানের ব্যাটিং লাইনআপ কার্যত কোনো কার্যকর প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারেনি।

পাকিস্তানের ইনিংস মাত্র ১১০ রানে শেষ হওয়ার পর ইংল্যান্ড প্রথম ইনিংসে ১৮০ রানের বিশাল লিড পায়। তবে দ্বিতীয় ইনিংসে ব্যাট করতে নেমে স্বাগতিকরাও শুরুতে ধাক্কা খায়। পাকিস্তান তখন দ্রুত দুই উইকেট তুলে নিয়ে ম্যাচে ফেরার চেষ্টা করে।

খুররম শাহজাদের দুর্দান্ত শুরুর সামনে ইংল্যান্ডের টপ অর্ডার বিপাকে পড়ে। দ্বিতীয় ইনিংসে মাত্র ১ রান করে আউট হন বেন ডাকেট। এরপর জর্ডান কক্সও দ্রুত সাজঘরে ফিরে যান। মাত্র ১৩ রানের মধ্যেই দুই উইকেট হারিয়ে ইংল্যান্ডের ইনিংস কিছুটা অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ে যায়।

কিন্তু সেই চাপ সামাল দেওয়ার চেষ্টা করেন এমিলিও গে ও ইংল্যান্ড অধিনায়ক জো রুট। দুজন মিলে তৃতীয় উইকেটে ৪৭ রানের গুরুত্বপূর্ণ জুটি গড়েন। পাকিস্তানি বোলাররা আবারও ব্রেকথ্রু পেলেও ইংল্যান্ড নিজেদের সামগ্রিক সুবিধা ধরে রাখতে সক্ষম হয়।

রুট ২৪ রান করে এলবিডব্লিউ হয়ে ফিরে যান। এরপর মাঠে নামেন হ্যারি ব্রুক। দিনের শেষ দিকে আলো কমে আসায় খেলা চালিয়ে যাওয়া সম্ভব হয়নি। খেলা বন্ধ হওয়ার সময় এমিলিও গে ৩০ রানে অপরাজিত ছিলেন এবং হ্যারি ব্রুক অপরাজিত ছিলেন ৭ রানে।

দ্বিতীয় দিনের শেষে ইংল্যান্ডের স্কোর দাঁড়ায় ৩ উইকেটে ৮১ রান। প্রথম ইনিংসের ১৮০ রানের লিডসহ তাদের মোট সুবিধা দাঁড়ায় ২৬১ রানে। ম্যাচের এই অবস্থায় ইংল্যান্ডের সামনে এখন বড় লিড গড়ে পাকিস্তানকে কঠিন লক্ষ্য দেওয়ার সুযোগ রয়েছে।

অন্যদিকে পাকিস্তানের জন্য পরিস্থিতি ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠেছে। প্রথম ইনিংসে মাত্র ১১০ রানে অলআউট হওয়ার পর ম্যাচে টিকে থাকতে তাদের বোলারদের দ্বিতীয় ইনিংসে দ্রুত ইংল্যান্ডের বাকি উইকেটগুলো তুলে নিতে হবে। একই সঙ্গে ব্যাটিং বিভাগকে দ্বিতীয় ইনিংসে সম্পূর্ণ ভিন্ন মানসিকতা নিয়ে মাঠে নামতে হবে।

এই টেস্টে পাকিস্তানের সামনে আরেকটি বড় উদ্বেগ হয়ে উঠেছে ব্যাটিংয়ের ধারাবাহিকতা। প্রথম ইনিংসে একজন ব্যাটার ছাড়া অন্যরা বড় প্রতিরোধ গড়তে না পারায় ইংল্যান্ডের কাজ অনেক সহজ হয়ে গেছে। আধুনিক টেস্ট ক্রিকেটে প্রতিপক্ষের শক্তিশালী পেস আক্রমণের বিপক্ষে দীর্ঘ সময় ব্যাট করা এবং জুটি গড়ে তোলা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। লর্ডসে পাকিস্তান সেই জায়গাতেই সবচেয়ে বেশি ব্যর্থ হয়েছে।

ইংল্যান্ডের জন্য অবশ্য এই ম্যাচ শুধু একটি টেস্ট জয়ের সম্ভাবনা নয়, তাদের পেস বোলিং শক্তিরও বড় পরীক্ষা। রবিনসন ও আর্চারের মতো দুই ভিন্ন ধরনের বোলার একসঙ্গে কার্যকর হলে প্রতিপক্ষের জন্য পরিস্থিতি কতটা কঠিন হয়ে উঠতে পারে, পাকিস্তানের প্রথম ইনিংস তার প্রমাণ দিয়েছে।

আর্চারের গতি এবং রবিনসনের ধারাবাহিকতা ইংল্যান্ডের বোলিং আক্রমণকে আরও ভারসাম্যপূর্ণ করেছে। টাংয়ের উইকেট নেওয়ার ক্ষমতা যোগ হওয়ায় স্বাগতিকদের পেস ইউনিট পাকিস্তানের ব্যাটারদের ওপর সারাদিন চাপ ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছে।

লর্ডসের দ্বিতীয় দিনের শেষে তাই ম্যাচের পাল্লা স্পষ্টভাবেই ইংল্যান্ডের দিকে। প্রথম দিনে পাকিস্তানি বোলারদের নিয়ন্ত্রণে থাকা ম্যাচ দ্বিতীয় দিন শেষে ইংল্যান্ডের শক্ত অবস্থানে এসে দাঁড়িয়েছে। হাতে সাত উইকেট এবং ২৬১ রানের লিড নিয়ে তৃতীয় দিনের শুরু করবে স্বাগতিকরা।

পাকিস্তানের সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো দ্রুত ম্যাচে ফিরে আসা। আর ইংল্যান্ডের লক্ষ্য হবে লিড আরও বড় করে এমন অবস্থান তৈরি করা, যেখানে শেষ ইনিংসে পাকিস্তানের জন্য ম্যাচ বাঁচানো অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়ে। লর্ডসের ঐতিহাসিক মাঠে ম্যাচের পরবর্তী সময় তাই দুই দলের জন্যই গুরুত্বপূর্ণ হলেও নিয়ন্ত্রণ এখন স্পষ্টত ইংল্যান্ডের হাতেই।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত

Theme Dwonload From ThemesBazar.Com