প্রকাশ: ১১ আগস্ট ২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক।একটি বাংলাদেশ অনলাইন
বরিশালের শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের (শেবাচিম) দীর্ঘদিনের একটি বড় সমস্যার সমাধানের পথে অগ্রসর হয়েছে কর্তৃপক্ষ। চিকিৎসার মান উন্নয়ন ও রোগীদের জন্য উপযুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করতে হাসপাতালের মেডিসিন ওয়ার্ডকে পূর্বের ভবনে ফিরিয়ে আনার সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হয়েছে। একইসঙ্গে অবকাঠামো উন্নয়ন, চিকিৎসা সরঞ্জাম সরবরাহ এবং জনবল নিয়োগসহ নানামুখী পদক্ষেপ হাতে নিয়েছে হাসপাতাল প্রশাসন।
সোমবার (১১ আগস্ট) বিকেলে হাসপাতালের তৃতীয় তলায় মেডিসিন কনফারেন্স রুমে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এ কে এম মশিউল মুনীর এই তথ্য জানান। তিনি বলেন, “আমার মূল কাজ হলো হাসপাতালের সেবার মান বাড়ানো এবং রোগীকে সন্তুষ্ট করা। এই হাসপাতাল আমাদের সবার, তাই একে সচল রাখতে সবার সহযোগিতা দরকার।”
গত কয়েক মাস ধরে মেডিসিন ওয়ার্ডের স্থানান্তর নিয়ে বরিশালজুড়ে আন্দোলন চলছিল। রোগী ও তাদের স্বজনরা অভিযোগ করেন, নতুন ভবনে স্থানান্তরের পর থেকে চিকিৎসা গ্রহণ ও প্রদান উভয় ক্ষেত্রেই ভোগান্তি বেড়েছে। পূর্বের ভবনে প্রশস্ততা ও প্রয়োজনীয় অবকাঠামো থাকলেও নতুন ভবনে ভিড়, বায়ু চলাচলের সমস্যা ও চিকিৎসার অনুপযোগী পরিবেশের কারণে অসন্তুষ্টি তৈরি হয়। এই প্রেক্ষাপটে পরিচালক জানান, দ্রুততম সময়ের মধ্যেই মেডিসিন ওয়ার্ডকে পূর্বের স্থানে ফিরিয়ে আনা হবে, যাতে রোগীরা পর্যাপ্ত জায়গা, সঠিক পরিবেশ এবং উন্নত সেবা পান।
সংবাদ সম্মেলনে তিনি হাসপাতালের বর্তমান অবস্থা ও পরিসংখ্যান তুলে ধরে বলেন, প্রতিদিন গড়ে নতুন করে প্রায় ৭০০ রোগী ভর্তি হন। গত অর্থবছরে অন্তঃবিভাগে সেবা পেয়েছেন ১ লাখ ৯২ হাজার ৯৯৪ জন এবং বহিঃবিভাগে সেবা নিয়েছেন ৬ লাখ ১১ হাজার ৫৮৪ জন। গত এক বছরে হাসপাতালে মোট ৩১ হাজার ৩৯৭টি অপারেশন সম্পন্ন হয়েছে, যা হাসপাতালের সেবার চাপ ও সক্ষমতার প্রমাণ বহন করে।
তবে এ বিশাল সেবার চাহিদা পূরণে বড় চ্যালেঞ্জ হলো জনবল ও অবকাঠামোর সীমাবদ্ধতা। বর্তমানে একেকটি বেডে তিনজন পর্যন্ত রোগীকে সেবা দিতে হয়, যা রোগী ও চিকিৎসক উভয়ের জন্যই অত্যন্ত কষ্টকর। অবকাঠামোগত উন্নয়ন না হওয়ায় টয়লেট ও পরিবেশ নোংরা হয়ে পড়ছে, আর অতিরিক্ত রোগীর চাপ সামলাতে স্বল্প সংখ্যক চিকিৎসক, নার্স ও স্টাফদের হিমশিম খেতে হচ্ছে।
পরিচালক জানান, শিগগিরই সারাদেশে ৩ হাজার চিকিৎসক এবং আগামী মাসে ৩,২০০ নার্স নিয়োগ দেওয়া হবে, যার মধ্যে শেবাচিম হাসপাতাল তুলনামূলকভাবে বেশি জনবল পাবে। এছাড়া হাসপাতালের জন্য একটি এমআরআই মেশিন, ক্যাথ ল্যাব এবং সি-আর্ম মেশিন সরবরাহের প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে।
হাসপাতালের সেবা উন্নয়নে সম্প্রতি গৃহীত পদক্ষেপের মধ্যে রয়েছে—অভিযোগের ভিত্তিতে স্বেচ্ছাসেবী ট্রলি ম্যানদের বহিষ্কার করে সরকারি স্টাফদের দায়িত্ব দেওয়া, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখতে ৮টি অটোমেটিক মেশিন ও ২০টি স্প্রে মেশিন চালু, টয়লেটের দরজা-জানালা মেরামত ও পরিবর্তন, ১০০টি নতুন বেডের ক্রয়াদেশ এবং হাসপাতালের দালাল, বাহিরের ডায়াগনস্টিক সেন্টারের প্রতিনিধি ও হকারদের প্রবেশ কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ।
সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজের উপাধ্যক্ষ ও মেডিসিন বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডা. আনোয়ার হোসেন বাবলু বলেন, “হাসপাতালের সবচেয়ে বেশি রোগী সেবা নেন মেডিসিন বিভাগ থেকে। কিন্তু নতুন ভবনে স্থানান্তরের পর থেকে রোগীরা চরম দুর্ভোগে পড়েছেন। এখন আমরা সেই ওয়ার্ডকে পুরনো স্থানে ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নিয়েছি, যাতে যথাযথ পরিবেশে রোগী সেবা নিশ্চিত করা যায়।”
উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, বরিশালবাসী দীর্ঘদিন ধরে মেডিসিন ওয়ার্ড পুনঃস্থাপনের দাবিতে আন্দোলন করে আসছে। কয়েক মাস ধরে বিভিন্ন মানববন্ধন ও বিক্ষোভ অনুষ্ঠিত হওয়ার পর গত দুই সপ্তাহে দাবিটি আরও তীব্র রূপ নেয়। অবশেষে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ আন্দোলনকারীদের দাবির যৌক্তিকতা মেনে নিয়ে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে।
এখন দেখার বিষয়, এই উদ্যোগগুলো দ্রুত বাস্তবায়িত হয়ে শেবাচিম হাসপাতালের চিকিৎসা সেবার মানকে কতটা উন্নত করতে পারে এবং রোগীদের আস্থা কতটা পুনরুদ্ধার করতে সক্ষম হয়।