প্রকাশ: ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (সিকৃবি) উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. আলিমুল ইসলামের পদত্যাগ ও অপসারণের দাবিতে টানা সপ্তম দিনের মতো মানববন্ধন ও অবস্থান কর্মসূচি পালন করেছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, কর্মকর্তা-কর্মচারী ও শিক্ষার্থীদের একটি অংশ। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক ভবনের সামনে আয়োজিত এ কর্মসূচিতে অংশ নিয়ে আন্দোলনকারীরা উপাচার্যের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অনিয়ম, স্বেচ্ছাচারিতা, হয়রানি ও নিয়োগসংক্রান্ত অভিযোগ তুলে তার পদত্যাগ দাবি করেন।
রোববার প্রশাসনিক ভবনের সামনে এ কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হয়। সকাল থেকে শিক্ষক, কর্মকর্তা-কর্মচারী ও শিক্ষার্থীদের একটি অংশ সেখানে অবস্থান নেন। কর্মসূচি ঘিরে ক্যাম্পাসে উপাচার্যের পদত্যাগের দাবিতে চলমান আন্দোলন নতুন করে আলোচনায় আসে। আন্দোলনকারীদের বক্তব্য, বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক কার্যক্রমে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা এবং শিক্ষা ও প্রশাসনিক পরিবেশ স্বাভাবিক রাখতে তারা এ কর্মসূচি চালিয়ে যাচ্ছেন।
আন্দোলনকারীদের অভিযোগ, অধ্যাপক ড. মো. আলিমুল ইসলাম উপাচার্য হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন প্রশাসনিক কার্যক্রম নিয়ে শিক্ষক, কর্মকর্তা-কর্মচারী ও শিক্ষার্থীদের একটি অংশের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে নিয়োগ প্রক্রিয়া, প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সঙ্গে আচরণ এবং বিভিন্ন ফাইল ও দাপ্তরিক কার্যক্রম পরিচালনা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে। এসব অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্তের পাশাপাশি উপাচার্যের অপসারণ দাবি করছেন তারা।
কর্মসূচিতে সভাপতিত্ব করেন অধ্যাপক ড. এমদাদুল হক। জাতীয়তাবাদী কর্মকর্তা পরিষদের সাধারণ সম্পাদক আশরাফুজ্জামান কর্মসূচি সঞ্চালনা করেন। এতে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন পর্যায়ের শিক্ষক, কর্মকর্তা ও শিক্ষার্থীরা বক্তব্য দেন। বক্তাদের মধ্যে ছিলেন অধ্যাপক ছিদ্দিকুল ইসলাম, সাদা দলের সাবেক সাধারণ সম্পাদক মোজাম্মেল হক, সাবেক সভাপতি মাহবুব ইকবাল, আতাউর রহমান ও অধ্যাপক ড. নাজমুল হক।
এ ছাড়া জাতীয়তাবাদী কর্মকর্তা পরিষদের সভাপতি গাজী মোহাম্মদ জহিরুল ইসলাম, মোহাম্মদ নেওয়ামত উল্লাহ, বাছিত উদ্দিন ও আশফাক আহমেদ বক্তব্য দেন। সিকৃবি ছাত্রদলের আহ্বায়ক সানাউল হোসেন সনি, যুগ্ম আহ্বায়ক আনোয়ার হোসেন, আশরাফুল ইসলাম ও গোলাম রাব্বানীও কর্মসূচিতে বক্তব্য রাখেন।
বক্তারা অভিযোগ করেন, উপাচার্য দায়িত্ব নেওয়ার পর শিক্ষক, কর্মকর্তা-কর্মচারী ও শিক্ষার্থীদের একটি অংশ বিভিন্নভাবে হয়রানি ও চাপের মুখে পড়ছেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বিষয়ে তদন্তের উদ্যোগ নেওয়া হলেও সেসব তদন্তের ফল বা কার্যকর ব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে বলেও তারা দাবি করেন। তাদের ভাষ্য, অভিযোগের যথাযথ সমাধান না হওয়ায় আন্দোলন দীর্ঘায়িত হচ্ছে।
আন্দোলনরত শিক্ষকদের আরও অভিযোগ, বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রচলিত আইন ও বিধিবিধান অনুযায়ী প্রশাসনিক কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে না। কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বদলি, বিভিন্ন দাপ্তরিক ফাইল তলব এবং প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের মাধ্যমে চাপ সৃষ্টি করা হচ্ছে বলেও তারা দাবি করেন। তাদের মতে, এ ধরনের পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাভাবিক প্রশাসনিক কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি শিক্ষক, কর্মকর্তা-কর্মচারী ও শিক্ষার্থীদের মধ্যে অস্থিরতা আরও বাড়তে পারে।
এর আগে গত ২০ সেপ্টেম্বরও উপাচার্যের পদত্যাগের দাবিতে প্রশাসন ভবনের বিভিন্ন গেটে তালা দিয়ে বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করেন আন্দোলনকারীদের একটি অংশ। ওই কর্মসূচিতে শিক্ষক, কর্মকর্তা ও ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা অংশ নেন। আন্দোলনকারীরা সে সময়ও নিয়োগসহ বিভিন্ন প্রশাসনিক কার্যক্রমে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ তুলে নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছিলেন। উপাচার্য পদত্যাগ না করলে আন্দোলন আরও কঠোর করার হুঁশিয়ারিও দেওয়া হয়েছিল।
চলমান আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে এর আগে সেপ্টেম্বরের শুরুতে কয়েকজন শিক্ষক ও কর্মকর্তা প্রশাসনিক দায়িত্ব থেকে পদত্যাগ করেন। এরপর উপাচার্যের পদত্যাগের দাবিতে ধারাবাহিকভাবে মানববন্ধন ও অবস্থান কর্মসূচি শুরু হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক কার্যক্রম নিয়ে অভিযোগ ও পাল্টা বক্তব্যের কারণে পরিস্থিতি নিয়ে ক্যাম্পাসে আলোচনা অব্যাহত রয়েছে। তবে আন্দোলনকারীদের উত্থাপিত অভিযোগগুলোর চূড়ান্ত সত্যতা নির্ধারণে নিরপেক্ষ তদন্ত ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
অন্যদিকে উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. আলিমুল ইসলাম আন্দোলনকারীদের উত্থাপিত বিভিন্ন অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তার পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, একটি স্বার্থান্বেষী মহল বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাভাবিক পরিবেশকে অস্থিতিশীল করার উদ্দেশ্যে এসব অভিযোগ তুলছে। নিয়োগসহ প্রশাসনিক কার্যক্রম নিয়ম ও স্বচ্ছতার সঙ্গে সম্পন্ন হয়েছে বলেও তিনি দাবি করেছেন। ফলে আন্দোলনকারীদের অভিযোগ এবং উপাচার্যের বক্তব্যের মধ্যে স্পষ্ট মতপার্থক্য রয়েছে।
সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক ওয়েবসাইটে অধ্যাপক ড. মো. আলিমুল ইসলামকে বর্তমান উপাচার্য হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়টি ২০০৬ সালে প্রতিষ্ঠিত এবং বর্তমানে এর সাতটি অনুষদ ও ৪৭টি বিভাগ রয়েছে। প্রতিষ্ঠার পর থেকে কৃষি শিক্ষা, গবেষণা ও উদ্ভাবনে প্রতিষ্ঠানটির ভূমিকা রয়েছে। ফলে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক স্থিতিশীলতা, একাডেমিক কার্যক্রম ও শিক্ষার পরিবেশ নিয়ে যে কোনো দীর্ঘস্থায়ী বিরোধ শিক্ষক-শিক্ষার্থীসহ পুরো বিশ্ববিদ্যালয় সম্প্রদায়ের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।
এদিকে উপাচার্যের পদত্যাগের দাবিতে আন্দোলন এর আগেও সাময়িকভাবে স্থগিত হয়েছিল। রাষ্ট্রপতি ও বিশ্ববিদ্যালয়ের আচার্যের সিলেট সফর উপলক্ষে সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি সময়ে কয়েক দিনের জন্য কর্মসূচি স্থগিত রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন আন্দোলনকারীরা। পরে আবার কর্মসূচি শুরু হয় এবং ধারাবাহিকভাবে তা অব্যাহত রয়েছে।
সপ্তম দিনের কর্মসূচিতে আন্দোলনকারীরা দ্রুত উপাচার্যের বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগের তদন্ত, প্রশাসনিক কার্যক্রমে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা এবং বিশ্ববিদ্যালয়ে স্বাভাবিক পরিবেশ ফিরিয়ে আনার দাবি পুনর্ব্যক্ত করেছেন। তাদের মূল দাবি, অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষভাবে পর্যালোচনা করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া। একই সঙ্গে তারা বর্তমান উপাচার্যের অপসারণ বা পদত্যাগের দাবিতে আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন।
বিশ্ববিদ্যালয়কে ঘিরে চলমান এ বিরোধের ফলে এখন নজর রয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পরবর্তী পদক্ষেপের দিকে। একদিকে আন্দোলনকারীরা তাদের অভিযোগের বিষয়ে কার্যকর ব্যবস্থা দাবি করছেন, অন্যদিকে উপাচার্য এসব অভিযোগকে ভিত্তিহীন বলে প্রত্যাখ্যান করেছেন। ফলে অভিযোগগুলোর সত্যতা যাচাই, প্রশাসনিক জটিলতার সমাধান এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও প্রশাসনিক পরিবেশ স্বাভাবিক রাখার বিষয়টি সামনে এসেছে। পরিস্থিতির গ্রহণযোগ্য সমাধান হলে দীর্ঘদিনের অস্থিরতা কমার সুযোগ তৈরি হতে পারে বলে সংশ্লিষ্ট মহলে আলোচনা রয়েছে।