রাবি শিক্ষার্থীকে মারধর, তদন্তে রেলের চার সদস্যের কমিটি

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ২১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
  • ১৩ বার
রাবি শিক্ষার্থীকে মারধর, তদন্তে রেলের চার সদস্যের কমিটি

প্রকাশ: ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের (রাবি) ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের শিক্ষার্থী আইয়ুবকে রাজশাহী রেলওয়ে স্টেশনে মারধরের অভিযোগ এবং পরবর্তী সময়ে স্টেশনে ভাঙচুর ও রেললাইন অবরোধের ঘটনায় তদন্ত শুরু করেছে বাংলাদেশ রেলওয়ে। ঘটনার প্রকৃত কারণ, সংশ্লিষ্টদের ভূমিকা এবং পরিস্থিতি কীভাবে উত্তপ্ত হলো—এসব বিষয় খতিয়ে দেখতে চার সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। একই ঘটনায় রেলওয়ে নিরাপত্তা বাহিনীর (আরএনবি) চার সদস্যকে সাময়িক বরখাস্তও করা হয়েছে।

রেলওয়ে কর্তৃপক্ষের গঠিত তদন্ত কমিটিতে পাকশী বিভাগীয় বাণিজ্যিক কর্মকর্তা, পাকশী বিভাগীয় চিকিৎসক কর্মকর্তা, পাকশী বিভাগীয় সংকেত ও টেলিযোগাযোগ প্রকৌশলী এবং পাকশী কমান্ড্যান্ট রেলওয়ে নিরাপত্তা বাহিনীর একজন কর্মকর্তা রয়েছেন। কমিটিকে ঘটনার বিভিন্ন দিক পর্যালোচনা করে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে প্রতিবেদন দেওয়ার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে বলে রেলওয়ে সূত্রে জানা গেছে।

রোববার রাতে রাজশাহী রেলওয়ে স্টেশনে রাবির শিক্ষার্থী আইয়ুবকে মারধরের অভিযোগ ওঠার পর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মধ্যে ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। পরে একদল শিক্ষার্থী রাজশাহী রেলওয়ে স্টেশনে গিয়ে বিক্ষোভ করেন। পরিস্থিতি একপর্যায়ে উত্তপ্ত হয়ে ওঠে এবং স্টেশন এলাকায় ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। একই সময়ে রেললাইন অবরোধ করায় রাজশাহী থেকে দেশের অন্যান্য অঞ্চলের সঙ্গে ট্রেন চলাচলও সাময়িকভাবে বাধাগ্রস্ত হয়।

ঘটনার সূত্রপাত হয় রোববার রাতের দিকে। বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আইয়ুব তাঁর চাচাকে নিতে রাজশাহী রেলওয়ে স্টেশনে গিয়েছিলেন। সেখানে কয়েকজন শিক্ষার্থীর সঙ্গে দায়িত্ব পালনরত আনসার সদস্যদের কথাকাটাকাটি হয়। একপর্যায়ে আইয়ুব ওই ঘটনার প্রতিবাদ করলে তাঁকে মারধর করা হয়েছে বলে অভিযোগ ওঠে। পরে তিনি আহত অবস্থায় চিকিৎসার জন্য রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি হন।

শিক্ষার্থীদের অভিযোগ অনুযায়ী, আইয়ুবকে মারধরের ঘটনায় রেলওয়ে নিরাপত্তা বাহিনী ও টিকিট পরীক্ষকদের কয়েকজন সদস্য জড়িত ছিলেন। তবে ঘটনার পুরো বিষয়টি এখন তদন্তাধীন। অভিযোগের সত্যতা, কারা কীভাবে ঘটনায় জড়িত ছিলেন এবং মারধরের পেছনে ঠিক কী পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল—এসব বিষয় তদন্তের মাধ্যমে নির্ধারণ হওয়ার কথা রয়েছে।

আইয়ুবের আহত হওয়ার খবর ছড়িয়ে পড়ার পর রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মধ্যে ক্ষোভ বাড়তে থাকে। শিক্ষার্থীরা রাজশাহী রেলস্টেশনে গিয়ে অবস্থান নেন এবং জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও প্রশাসনের কর্মকর্তারাও ঘটনাস্থলে যান। পরে শিক্ষকরা শিক্ষার্থীদের বুঝিয়ে স্টেশন এলাকা থেকে সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেন।

তবে এর মধ্যে স্টেশন ভবনের বিভিন্ন স্থানে ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে বলে একাধিক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। স্টেশনের কাচ, আসবাব, দরজা-জানালা ও অন্যান্য স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার খবর পাওয়া যায়। এ সময় স্টেশনে থাকা সাধারণ যাত্রীদের মধ্যেও আতঙ্ক তৈরি হয়। রাতের একটি পর্যায়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ায় রেল চলাচলের ওপরও প্রভাব পড়ে।

রেললাইন অবরোধের কারণে রাজশাহী থেকে ঢাকাগামী ধূমকেতু এক্সপ্রেসের যাত্রা বাতিল করা হয়। এতে নির্ধারিত সময়ে ট্রেনে যাত্রার জন্য অপেক্ষা করা যাত্রীদের দুর্ভোগে পড়তে হয়। তবে সোমবার সকাল থেকে রাজশাহী থেকে বিভিন্ন রুটে ট্রেন চলাচল আবার স্বাভাবিক হয়েছে। স্থানীয় রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, সকাল থেকে নির্ধারিত বিভিন্ন ট্রেন রাজশাহী স্টেশন ছেড়ে গেছে এবং রেল যোগাযোগ পুনরায় সচল হয়েছে।

এদিকে শিক্ষার্থীকে মারধরের অভিযোগের পর রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ চারজনকে সাময়িক বরখাস্ত করেছে। বরখাস্ত হওয়া সদস্যরা হলেন আরিফ হোসেন, রোকন উদ্দিন, শফিকুল ইসলাম ও শাহাদত হোসেন। রোববার দিবাগত রাতে বাংলাদেশ রেলওয়ের পশ্চিমাঞ্চলের চিফ কমান্ড্যান্ট মোহা. আশাবুল ইসলাম স্বাক্ষরিত দপ্তরাদেশে তাদের সাময়িক বরখাস্তের কথা জানানো হয়। আদেশে রাজশাহী রেলওয়ে স্টেশনে সংঘটিত অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার সঙ্গে জড়িত থাকার সন্দেহের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

সাময়িক বরখাস্তের পাশাপাশি এবার চার সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। ফলে ঘটনাটি নিয়ে রেলওয়ের অভ্যন্তরীণ তদন্তের আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়াও শুরু হলো। তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে ঘটনার সময়কার পরিস্থিতি, সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ভূমিকা, নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনা এবং পরবর্তী পরিস্থিতি সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য উঠে আসতে পারে।

ঘটনার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, একজন শিক্ষার্থীকে মারধরের অভিযোগের প্রতিবাদ জানাতে গিয়ে রেলস্টেশনের মতো জনসাধারণের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় ভাঙচুর এবং রেললাইন অবরোধের ঘটনা ঘটে। এতে সাধারণ যাত্রীদের স্বাভাবিক যাতায়াত ব্যাহত হয়। একটি ব্যক্তিগত অভিযোগকে কেন্দ্র করে পরিস্থিতি দ্রুত বৃহত্তর উত্তেজনায় রূপ নেওয়ায় আইনশৃঙ্খলা ও জননিরাপত্তার বিষয়টিও সামনে এসেছে।

রেলওয়ে কর্তৃপক্ষের জন্য তদন্তের মাধ্যমে ঘটনার প্রকৃত চিত্র তুলে আনা এখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। একই সঙ্গে শিক্ষার্থীর অভিযোগের ন্যায়সংগত তদন্ত, অভিযুক্তদের ভূমিকা নির্ধারণ এবং স্টেশন ও রেল যোগাযোগের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বিষয়গুলোও গুরুত্ব পাচ্ছে। সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের বক্তব্য ও প্রমাণ পর্যালোচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়া হলে ঘটনার বিষয়ে বিভ্রান্তি কমার সুযোগ থাকবে।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ও রাজশাহী রেলওয়ের মধ্যে শিক্ষার্থী ও যাত্রীদের নিয়মিত যোগাযোগ রয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব রেলস্টেশনও শিক্ষার্থীদের যাতায়াতের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। ফলে রেলওয়ে কর্মকর্তা-কর্মচারী, শিক্ষার্থী ও সাধারণ যাত্রীদের মধ্যে পারস্পরিক আচরণ এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বিষয়টি এ ঘটনার পর নতুন করে আলোচনায় এসেছে।

এদিকে আহত শিক্ষার্থী আইয়ুবের চিকিৎসা অব্যাহত রয়েছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে। তাঁর শারীরিক অবস্থা নিয়ে সহপাঠীদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনও ঘটনাটিকে গুরুত্ব দিয়ে দেখছে এবং চিকিৎসার বিষয়টি পর্যবেক্ষণ করছে বলে জানা গেছে।

রেলওয়ের তদন্ত কমিটি গঠনের ফলে এখন ঘটনার পরবর্তী ধাপ হিসেবে তদন্ত প্রতিবেদন এবং তার ভিত্তিতে প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের দিকে নজর থাকবে। একই সঙ্গে ভাঙচুরের ঘটনায় ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নির্ধারণ এবং সেই ঘটনায় কারা জড়িত ছিলেন, সেটিও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠেছে।

রোববার রাতের উত্তেজনার পর সোমবার সকালে রাজশাহী রেলস্টেশনের পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়েছে। ট্রেন চলাচলও পুনরায় শুরু হয়েছে। তবে শিক্ষার্থীকে মারধরের অভিযোগ এবং তার জেরে সৃষ্ট ভাঙচুরের ঘটনায় যে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে, তার পূর্ণ সমাধান নির্ভর করছে তদন্তের ফল এবং পরবর্তী প্রশাসনিক পদক্ষেপের ওপর। তদন্তের মাধ্যমে অভিযোগের সত্যতা ও সংশ্লিষ্টদের ভূমিকা স্পষ্ট হলে ভবিষ্যতে এ ধরনের পরিস্থিতি এড়াতে রেলওয়ে ও বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে পারবে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত