প্রকাশ: ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ড কাউন্সিলের সাবেক কমান্ডার ও বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী মুক্তিযোদ্ধা দলের কেন্দ্রীয় কমিটির সহসভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা সৈয়দ আবুল মুনছুর আর নেই। সোমবার বেলা ১১টার দিকে চট্টগ্রাম নগরীর একটি বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ৭৮ বছর বয়সে তিনি মারা যান বলে পারিবারিক ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে।
তার মৃত্যুতে সীতাকুণ্ডের মুক্তিযোদ্ধা সংগঠন, রাজনৈতিক অঙ্গন এবং বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক মহলে শোকের আবহ তৈরি হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে মুক্তিযোদ্ধা সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত থাকার পাশাপাশি স্থানীয় বিভিন্ন সামাজিক কর্মকাণ্ডেও তিনি সক্রিয় ছিলেন। জীবনের শেষ সময় পর্যন্ত তিনি নিজ এলাকার মানুষের সঙ্গে নানা সামাজিক ও সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত ছিলেন বলে স্থানীয়দের বক্তব্য।
সৈয়দ আবুল মুনছুর সীতাকুণ্ড পৌরসভার দক্ষিণ মহাদেবপুর এলাকার বাসিন্দা ছিলেন। মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে সম্পৃক্ততার পাশাপাশি স্বাধীনতার পর মুক্তিযোদ্ধাদের সংগঠিত করার কাজেও তিনি ভূমিকা রাখেন। পরবর্তী সময়ে সীতাকুণ্ড উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ড কাউন্সিলের কমান্ডারের দায়িত্ব পালন করেন। বিভিন্ন সময় স্থানীয় উন্নয়ন ও নাগরিক বিষয়ক আলোচনাতেও তাকে সক্রিয়ভাবে অংশ নিতে দেখা গেছে। পুরোনো স্থানীয় সংবাদ প্রতিবেদনেও সীতাকুণ্ড উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ড হিসেবে তার বক্তব্য ও অংশগ্রহণের উল্লেখ পাওয়া যায়।
সোমবার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়ার পর স্বজন, সহযোদ্ধা, রাজনৈতিক সহকর্মী ও শুভাকাঙ্ক্ষীদের মধ্যে শোক নেমে আসে। দীর্ঘদিনের পরিচিতজনদের কাছে তিনি শুধু একজন মুক্তিযোদ্ধা সংগঠক ছিলেন না, স্থানীয় পর্যায়ে বিভিন্ন মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ রাখা একজন সক্রিয় সামাজিক ব্যক্তিত্ব হিসেবেও পরিচিত ছিলেন।
মরহুমের জানাজা মঙ্গলবার বাদ আসর সীতাকুণ্ড সরকারি আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। জানাজা শেষে সীতাকুণ্ড ডিগ্রি কলেজ-সংলগ্ন চৌধুরীপাড়া কবরস্থানে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় তাকে দাফন করার কথা জানানো হয়েছে। রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় দাফনের মধ্য দিয়ে একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে তার প্রতি রাষ্ট্রীয় সম্মান প্রদর্শন করা হবে।
সৈয়দ আবুল মুনছুরের রাজনৈতিক জীবনও সীতাকুণ্ডের স্থানীয় রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিল। তিনি বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী মুক্তিযোদ্ধা দলের কেন্দ্রীয় কমিটির সহসভাপতির দায়িত্বে ছিলেন। এর আগে সীতাকুণ্ড পৌরসভা নির্বাচনে বিএনপির মনোনীত প্রার্থী হিসেবে ধানের শীষ প্রতীকে মেয়র পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন। স্থানীয় নির্বাচনে তার অংশগ্রহণের তথ্যও পুরোনো সংবাদ প্রতিবেদনে পাওয়া যায়।
তবে তার রাজনৈতিক পরিচয়ের পাশাপাশি স্থানীয় পর্যায়ে মুক্তিযোদ্ধা সংগঠনের সঙ্গে দীর্ঘ সম্পৃক্ততাই ছিল তার জনপরিচয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। বিভিন্ন নাগরিক ও সামাজিক বিষয়ে আয়োজিত সভা-সমাবেশে তার উপস্থিতি এবং বক্তব্যের তথ্য স্থানীয় সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। সীতাকুণ্ডের বিভিন্ন উন্নয়ন ও নাগরিক সমস্যা নিয়ে আয়োজিত মতবিনিময় সভাতেও তাকে অংশ নিতে দেখা গেছে।
মুক্তিযোদ্ধা সংগঠনের সঙ্গে দীর্ঘদিন যুক্ত থাকার কারণে সীতাকুণ্ডের স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধা সমাজে তার একটি পরিচিত অবস্থান ছিল। মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি, মুক্তিযোদ্ধাদের সংগঠিত করা এবং তাদের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে কাজ করার অভিজ্ঞতা তার সামাজিক পরিচয়ের সঙ্গে যুক্ত হয়ে ছিল। ফলে তার মৃত্যু স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধা সংগঠনের জন্যও একটি শূন্যতা তৈরি করেছে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
সীতাকুণ্ড উপজেলা প্রশাসন তার মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেছে। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. ফখরুল ইসলাম স্বাক্ষরিত শোকবার্তায় মহান মুক্তিযুদ্ধ এবং পরবর্তী সময়ে মুক্তিযোদ্ধাদের সংগঠিত করার ক্ষেত্রে সৈয়দ আবুল মুনছুরের অবদানের কথা শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করা হয়। একই সঙ্গে তার বিদেহী আত্মার মাগফিরাত কামনা এবং শোকসন্তপ্ত পরিবারের সদস্যদের প্রতি সমবেদনা জানানো হয়েছে।
তার মৃত্যুতে বিএনপির সাবেক যুগ্ম মহাসচিব ও চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা মোহাম্মদ আসলাম চৌধুরী এফসিএও শোক প্রকাশ করেছেন। শোকবার্তায় তিনি মুক্তিযুদ্ধে সৈয়দ আবুল মুনছুরের অংশগ্রহণ এবং দেশ ও জাতির জন্য তার অবদানের কথা স্মরণ করেন। একই সঙ্গে মরহুমের পরিবারের সদস্যদের প্রতি সমবেদনা জানান।
সীতাকুণ্ড উপজেলা বিএনপি, যুবদল, ছাত্রদলসহ স্থানীয় বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের নেতারাও পৃথক শোকবার্তায় তার মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেছেন। তারা মরহুমের আত্মার মাগফিরাত কামনা এবং পরিবারের সদস্যদের প্রতি সমবেদনা জানিয়েছেন।
একজন মানুষের চলে যাওয়া শুধু তার পরিবারের জন্য নয়, তার দীর্ঘ কর্মজীবনের সঙ্গে যুক্ত মানুষদের কাছেও এক ধরনের শূন্যতা তৈরি করে। সৈয়দ আবুল মুনছুরের ক্ষেত্রেও তার পরিবার, সহযোদ্ধা, রাজনৈতিক সহকর্মী এবং সামাজিক অঙ্গনের পরিচিতজনদের মধ্যে সেই শোকের প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে। বিশেষ করে মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রজন্মের অনেকেই তার সঙ্গে দীর্ঘদিনের সম্পর্কের স্মৃতি বহন করছেন।
সীতাকুণ্ডের স্থানীয় সমাজে তার পরিচয়ের আরেকটি দিক ছিল বিভিন্ন জনস্বার্থমূলক বিষয়ে অংশগ্রহণ। এলাকার উন্নয়ন, যোগাযোগব্যবস্থা এবং নাগরিক সুবিধা নিয়ে আয়োজিত বিভিন্ন আলোচনায় তার উপস্থিতির তথ্য রয়েছে। পুরোনো এক মতবিনিময় সভায় ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের উন্নয়ন নিয়েও তিনি স্থানীয়দের সঙ্গে আলোচনায় অংশ নিয়েছিলেন।
মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের জীবন অনেক সময় একটি নির্দিষ্ট সময়ের ইতিহাসের সঙ্গে স্থানীয় সমাজের স্মৃতিকেও ধারণ করে। সৈয়দ আবুল মুনছুরের দীর্ঘ সামাজিক ও সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডও সীতাকুণ্ডের স্থানীয় ইতিহাসের সঙ্গে বিভিন্নভাবে যুক্ত ছিল। তার মৃত্যুর মধ্য দিয়ে সেই প্রজন্মের একজন পরিচিত ব্যক্তিত্বকে হারাল সীতাকুণ্ড।
মঙ্গলবার জানাজা ও রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় দাফনের মধ্য দিয়ে তার শেষ বিদায়ের আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন হওয়ার কথা। স্বজন, সহযোদ্ধা, রাজনৈতিক সহকর্মী ও স্থানীয় বাসিন্দারা এতে অংশ নেবেন বলে জানা গেছে। একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা ও দীর্ঘদিনের সংগঠক হিসেবে সৈয়দ আবুল মুনছুরের জীবন ও কর্ম স্থানীয় মানুষের স্মৃতিতে আরও কিছুদিন আলোচিত থাকবে—এমনটাই মনে করছেন তার পরিচিতজনেরা।