২০২৭ সালের পাঠ্যবইয়ে ইতিহাস ও নতুন বিষয়ে বড় পরিবর্তন

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ২২ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
  • ১০ বার
২০২৭ সালের পাঠ্যবইয়ে ইতিহাস ও নতুন বিষয়ে বড় পরিবর্তন

প্রকাশ: ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

আগামী ২০২৭ শিক্ষাবর্ষে দেশের স্কুলশিক্ষার্থীদের হাতে পৌঁছাতে যাওয়া পাঠ্যবইয়ে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনা হচ্ছে। ইতিহাসের বিভিন্ন অধ্যায়ের পাশাপাশি বাংলা ও তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি (আইসিটি) বিষয়েও নতুন বিষয়বস্তু যুক্ত করার উদ্যোগ নিয়েছে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি)। এর মধ্যে মুক্তিযুদ্ধের বিভিন্ন সেক্টর ও ব্রিগেড ফোর্স, বীরশ্রেষ্ঠদের জীবন, ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বরের ঘটনা এবং ১৯৯০ সালের গণ-অভ্যুত্থানে সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার ভূমিকা নিয়ে নতুন পাঠ অন্তর্ভুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে।

নতুন বইয়ে সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের লেখা ‘স্বাধীনতাযুদ্ধের স্মৃতি’ নিবন্ধও যুক্ত করা হচ্ছে। একই সঙ্গে শিক্ষার্থীদের বর্তমান বিশ্বের সঙ্গে পরিচিত করতে মাধ্যমিক পর্যায়ের আইসিটি বইয়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই এবং আধুনিক প্রযুক্তি নিয়ে বিস্তৃত আলোচনা যুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ফলে আগামী শিক্ষাবর্ষে শিক্ষার্থীদের পাঠ্যসূচিতে ইতিহাস, প্রযুক্তি, সংস্কৃতি, খেলাধুলা ও কারিগরি শিক্ষার বিভিন্ন নতুন মাত্রা যুক্ত হতে যাচ্ছে।

এনসিটিবি সংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, ইতিহাসভিত্তিক পরিবর্তনের ক্ষেত্রে শ্রেণিভেদে বিষয়বস্তুর পরিমাণ ও গভীরতা আলাদা রাখা হচ্ছে। ষষ্ঠ থেকে অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের জন্য বিষয়গুলো তুলনামূলকভাবে সহজ ও সংক্ষিপ্তভাবে উপস্থাপন করা হবে। নবম শ্রেণিতে একই বিষয়গুলো আরও বিস্তারিতভাবে তুলে ধরার পরিকল্পনা রয়েছে। এর উদ্দেশ্য হিসেবে শিক্ষার্থীদের বয়স ও বোঝার সক্ষমতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বিষয়বস্তু সাজানোর কথা বলা হয়েছে।

ষষ্ঠ শ্রেণির ‘বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয়’ বইয়ে বীরশ্রেষ্ঠদের জীবন ও অবদান যুক্ত করা হচ্ছে। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে অষ্টম শ্রেণির বাংলা বইয়ে ব্রিগেড ফোর্স নিয়ে লেখা রাখা হচ্ছে। নবম-দশম শ্রেণির বাংলা বইয়ে জিয়াউর রহমানের লেখা ‘স্বাধীনতাযুদ্ধের স্মৃতি’ নিবন্ধ যুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে ষষ্ঠ থেকে নবম শ্রেণির ‘বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয়’ বইয়ে ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বরের ঘটনা এবং অষ্টম ও নবম শ্রেণির বইয়ে ১৯৯০ সালের গণ-অভ্যুত্থানে খালেদা জিয়ার ভূমিকা নিয়ে বিষয়বস্তু যুক্ত করার কথা জানানো হয়েছে।

ইতিহাসের পাশাপাশি বাংলা বইয়েও নতুন পাঠ যুক্ত হচ্ছে। ষষ্ঠ শ্রেণির বাংলা বইয়ে ‘তৃতীয় ভাষা’ নামে একটি নতুন প্রবন্ধ অন্তর্ভুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। একাধিক ভাষা শেখার প্রয়োজনীয়তা, গুরুত্ব এবং এর মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের জ্ঞান ও যোগাযোগের পরিধি বাড়ানোর বিষয়টি সেখানে তুলে ধরার পরিকল্পনা রয়েছে।

প্রযুক্তির পরিবর্তনের সঙ্গে শিক্ষার্থীদের পরিচিত করাতেও এবার গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। মাধ্যমিক পর্যায়ের আইসিটি বইয়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, আধুনিক প্রযুক্তি ও প্রযুক্তির দ্রুত পরিবর্তন নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা যুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, বর্তমান সময়ে প্রযুক্তি শিক্ষার পরিধি দ্রুত বদলে যাওয়ায় শিক্ষার্থীদের ছোটবেলা থেকেই এআইসহ নতুন প্রযুক্তির ধারণার সঙ্গে পরিচিত করা প্রয়োজন।

২০২৭ শিক্ষাবর্ষে শুধু পুরোনো বইয়ের বিষয়বস্তু পরিবর্তন নয়, চতুর্থ ও ষষ্ঠ শ্রেণিতে চারটি নতুন বইও যুক্ত হচ্ছে। চতুর্থ শ্রেণির জন্য ‘বাংলাদেশের সংস্কৃতি’ ও ‘খেলাধুলা’ এবং ষষ্ঠ শ্রেণির জন্য ‘আমার কারিগরি শিক্ষা’ ও ‘আনন্দময় শিক্ষা’ বই প্রস্তুত করা হচ্ছে। নতুন বইগুলো শিক্ষার্থীদের জন্য বাধ্যতামূলক হলেও এসব বিষয়ে আলাদা বার্ষিক পরীক্ষা থাকবে না। ধারাবাহিক মূল্যায়নের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের অগ্রগতি বিবেচনা করা হবে।

ষষ্ঠ শ্রেণির ‘আমার কারিগরি শিক্ষা’ বইটির মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের কারিগরি ও দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষার প্রতি আগ্রহ তৈরি করার লক্ষ্য রাখা হয়েছে। বইটিতে কারিগরি শিক্ষার পরিচিতি, চারপাশের প্রযুক্তি, সমস্যা ও সমাধান, ছোট উদ্যোগ, ভবিষ্যৎ পেশা, দক্ষতা, সবুজ প্রযুক্তি এবং টেকসই জীবনযাপনসহ বিভিন্ন বিষয় স্থান পাচ্ছে। ছোটবেলা থেকেই কাজের দক্ষতা, প্রযুক্তির ব্যবহার ও ভবিষ্যৎ পেশার ধারণার সঙ্গে শিক্ষার্থীদের পরিচয় করানোই এই বইয়ের অন্যতম উদ্দেশ্য।

অন্যদিকে ‘আনন্দময় শিক্ষা’ বইয়ে শিক্ষার্থীদের দৈনন্দিন জীবন, মূল্যবোধ, স্বাস্থ্য, পরিচ্ছন্নতা, প্রযুক্তির সঙ্গে ইতিবাচক সম্পর্ক এবং সৃজনশীল কর্মকাণ্ডের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। ‘আমি ও আমরা’, পুষ্টি ও স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন, প্রযুক্তির সঙ্গে শেখা, নতুন কিছু করা, পরিচ্ছন্ন থাকা, বিভিন্ন দিবস উদ্‌যাপন এবং আনন্দে থাকা ও অন্যকে আনন্দ দেওয়ার মতো বিষয় এতে রাখা হচ্ছে।

চতুর্থ শ্রেণির ‘বাংলাদেশের সংস্কৃতি’ বইয়ে দেশের সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য ও ঐতিহ্যের সঙ্গে শিক্ষার্থীদের পরিচিত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। জাতীয়, ধর্মীয় ও সামাজিক উৎসব, বিজয় দিবস, একুশে ফেব্রুয়ারি এবং সাংস্কৃতিক চর্চার গুরুত্বের পাশাপাশি বাংলাদেশের লোকজ সংস্কৃতি, পোশাক, কারুশিল্প ও বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর ঐতিহ্য তুলে ধরার বিষয়ও এতে গুরুত্ব পেতে পারে।

‘খেলাধুলা’ বইটিতেও থাকবে বৈচিত্র্য। ফুটবল, ক্রিকেট, ব্যাডমিন্টন, কাবাডি, দাবা, অ্যাথলেটিকস, সাঁতার ও মার্শাল আর্টসহ বিভিন্ন খেলার সঙ্গে শিক্ষার্থীদের পরিচয় করিয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। বইটির মাধ্যমে শিশুদের শারীরিক কর্মকাণ্ডে উৎসাহিত করা এবং খেলাধুলার প্রতি আগ্রহ বাড়ানোর লক্ষ্য রাখা হয়েছে।

নতুন চারটি বইয়ের ক্ষেত্রে ইলাস্ট্রেশন বা চিত্র-অলংকরণের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। চারটি বইয়ে মোট প্রায় ৭১০টি ছবি রাখার পরিকল্পনা রয়েছে। এর মধ্যে ‘খেলাধুলা’ বইয়ে তিন শতাধিক ছবি থাকবে। বিষয়গুলোকে শুধু লিখিত বর্ণনার মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে ছবি ও সহজ উপস্থাপনার মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের কাছে আরও বোধগম্য করে তোলার চেষ্টা করা হচ্ছে।

এদিকে ২০২৭ শিক্ষাবর্ষের জন্য বিপুলসংখ্যক পাঠ্যবই ছাপার কাজও এগিয়ে চলছে। প্রাক্-প্রাথমিক থেকে নবম শ্রেণি পর্যন্ত বিভিন্ন স্তরের শিক্ষার্থী, ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর শিক্ষার্থী এবং দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের জন্য প্রায় ৩১ কোটি বই ছাপানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে প্রাথমিক পর্যায়ে প্রায় ৮ কোটি ২০ লাখ এবং মাধ্যমিক পর্যায়ে ২২ কোটির বেশি বই রয়েছে। বই ছাপাতে সম্ভাব্য ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ১ হাজার ৮৭৯ কোটি টাকা।

প্রাথমিক স্তরের বই চার রঙে ছাপানোর পাশাপাশি কাগজের মান নিয়েও নির্দিষ্ট মানদণ্ড রাখা হয়েছে। বিভিন্ন মুদ্রণপ্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে বই ছাপানো ও সরবরাহের কাজ চলছে। এনসিটিবির লক্ষ্য, নভেম্বরের মধ্যে মূল ছাপার কাজ শেষ করে বই মাঠপর্যায়ে পাঠানো, যাতে নতুন শিক্ষাবর্ষ শুরুর সময় শিক্ষার্থীদের হাতে বই পৌঁছানো যায়।

তবে নতুন চারটি বই একই সময়ের মধ্যে ছাপা শেষ করা নিয়ে কিছুটা সময়ের প্রয়োজন হতে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। এসব বইয়ের বিষয়বস্তু যাচাই ও চূড়ান্ত করার কাজও এগিয়ে চলছে। বিশেষজ্ঞ, শিক্ষক ও সংশ্লিষ্টদের মতামত নিয়ে বইগুলোর কাঠামো ও বিষয়বস্তু পরিমার্জন করা হচ্ছে।

বর্তমানে ২০১২ সালের শিক্ষাক্রমের ভিত্তিতে শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। ২০২৭ সালের বইগুলোতে প্রয়োজনীয় সংশোধন ও পরিমার্জন আনার পাশাপাশি ২০২৮ সাল থেকে শিক্ষাক্রমে আরও বড় ধরনের পরিবর্তনের পরিকল্পনার কথা জানিয়েছে এনসিটিবি। ফলে ২০২৭ সালের পাঠ্যবইকে অনেকটা পরিবর্তনের মধ্যবর্তী ধাপ হিসেবেও দেখা হচ্ছে।

শিক্ষার্থীদের হাতে সময়মতো বই পৌঁছানোর পাশাপাশি বইয়ের তথ্যের যথার্থতা, ভাষার সহজবোধ্যতা, বিষয়বস্তুর ভারসাম্য এবং শিক্ষার্থীদের বয়স উপযোগিতা নিশ্চিত করাই এখন বড় দায়িত্ব। বিশেষ করে ইতিহাসের মতো সংবেদনশীল বিষয় পাঠ্যবইয়ে যুক্ত করার ক্ষেত্রে তথ্যের যথার্থতা ও প্রামাণ্য উপস্থাপন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। নতুন বিষয়গুলো শিক্ষার্থীদের জ্ঞান, দক্ষতা ও চিন্তাশক্তি বিকাশে কতটা কার্যকর হয়, সেটিই শেষ পর্যন্ত এই পরিবর্তনের বাস্তব মূল্যায়নের অন্যতম প্রধান বিষয় হয়ে দাঁড়াবে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত